ঢাকাতেই অগোছালো আওয়ামী লীগ

নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশব্যাপী সংগঠনকে নির্বাচনমুখী করতে উদ্যোগ নিলেও, প্রদীপের নিচে অন্ধকার। ঢাকা মহানগর দুই অংশের থানা ও ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারছেন না সংগঠনের নেতারা। ঢাকা উত্তর কমিটি ঘোষণার উদ্যোগ নিলেও অভিযোগ এসেছে অনুপ্রবেশ, স্বজনপ্রিয়তা আর বাণিজ্যের। আর দক্ষিণ এখনো কমিটি গঠন করতে পারেনি। আরো মাসখানেক লাগবে বলে হাইকমান্ডকে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে। ছাত্রলীগের কমিটি মোটামুটি আপডেটেড। বাকি সহযোগী সংগঠনগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ: ঢাকা মহানগর উত্তর এবং দক্ষিণ আওয়ামী লীগের থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। এরপর পূর্ণাঙ্গ কমিটি পায় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। সে সময় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা হলেও নগরের থানা, ওয়ার্ড এবং ইউনিয়নগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি আজও। এর মধ্যে উত্তরের কমিটি করে জমা দিলেও অনেকের আপত্তির কারণে তা ঘোষণা না করে সমন্বয়ের জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা ওই কমিটি যথাসময়ে না দিতে পারায় দলীয় পদ প্রত্যার্শী নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। তারা কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকদের দাবি, ওই কমিটি গঠন নিয়ে বেশ গতির সঙ্গে কাজ চলছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী (নওফেল) মানবকণ্ঠকে বলেন, কমিটি গঠনের কাজ চলছে। ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটি করা হয়েছিল। তা নিয়ে কিছু আপত্তি এসেছে। এটা নিরসনের জন্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খানকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব দিয়েছেন। আমাকে বলেছেন উত্তরের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বসতে। তবে ঢাকা মহানগরের বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বেশিরভাগ জায়গায় কমিটি হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।

যুবলীগ: কাউন্সিলের এক বছর পর ২০১৩ সালের মে মাসের শেষের দিকে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। দক্ষিণে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে সভাপতি ও ওয়াহিদুল আলম আরিফকে সাধারণ সম্পাদক এবং উত্তরে মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে সভাপতি ও মো. ইসমাইল হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়। সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ছাত্রলীগ ও যুবলীগকেই সবচেয়ে বেশি সরব থাকতে দেখা যায়। ঢাকা মহানগরও এর ব্যতিক্রম নয়। দিবসভিত্তিক কর্মসূচি ছাড়াও রাজপথে সরব থাকে সংগঠনটি। কিন্তু ঢাকা মহানগরে তাদেরও তিন বছর মেয়াদের এই কমিটি পার করেছে ৪ বছরের অধিক সময়। সম্মেলনের মাধ্যমে কবে নতুন নেতৃত্ব আসবে যুবলীগের কোনো নেতাই এখনো তা বলতে পারছেন না।

স্বেচ্ছাসেবক লীগ: ১১ বছর আগে সর্বশেষ ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের। সেই সম্মেলনে উত্তরের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মোবাশ্বের চৌধুরী। আর ফরিদুর রহমান খান ইরান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তারা দু’জনই এখন আবার সিটি কর্পোরেশন উত্তরের কাউন্সিলর। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাচনে ৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে মোবাশ্বের আর ২৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ইরান নির্বাচিত হন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখন তারা নিজ এলাকা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। স্বেচ্ছাসেবক লীগ দক্ষিণের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন দেবাশিষ বিশ্বাস। আর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন আরিফুর রহমান টিটু। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের বেশ কিছু থানা চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে। আবার অনেক থানার কমিটির মেয়াদ ১০ বছরের বেশি। এমনকি মহানগরের দুই শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান নেতৃত্ব। এ ছাড়া বর্তমান কমিটির তেমন কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই।

এদিকে দীর্ঘ দিন পরে সম্মেলন হলেও এখনো অগোছাল আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন- মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ এবং তাঁতী লীগ। একই অবস্থা তাদের নগর কমিটির ক্ষেত্রেও।

মহিলা লীগ: প্রায় ১৪ বছর পর নতুন নেতৃত্ব পেয়েছে এই সংগঠনটি। সম্মেলেন পরে ঢাকা মহানগর উত্তরে শাহিদা তারেখ (দিপ্তি) সভাপতি এবং শবনম শিলা সাধারণ সম্পাদক এবং দক্ষিণে সাবেরা বেগম সভাপতি এবং নার্গিস রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই দিন সম্মেলেনের দ্বিতীয় অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শীর্ষ নেতাদের ১০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। কিন্তু এখনো কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি সংগঠনটি। ফলে নগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাড়াই চলছে মহিলা আওয়ামী লীগও।

যুব মহিলা লীগ: প্রায় ১৩ বছর পরে ১১ মার্চ দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনটির। এতে সভাপতি পদে নাজমা আক্তার এবং সাধারণ সম্পাদক পদে অপু উকিল পুনর্নির্বাচিত হন। সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পরিবর্তন না আসলেও ঢাকা মহানগর কমিটির শীর্ষ পদে পরিবর্তন আসে। সাবিনা আক্তার তুহিনকে ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও তাহেরা খাতুন লুৎফাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণের সভাপতি হন ফরিদা ইয়াসমিন ঝুমা এবং সাধারণ সম্পাদকের পদ দেয়া হয় নীলুফা রহমানকে। তবে পরিবর্তন আসলেও নতুন নেতৃত্ব এখনো ঢাকায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি।

এ বিষয়ে যুব মহিলা লীগ সাধারণ অধ্যাপিকা অপু উকিল বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা মেনে আমরা তালিকা জমা দিয়েছি। আশা করছি- এ সপ্তাহের মধ্যেই যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের কমিটি ঘোষণা করা হবে।

তাঁতী লীগ: আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সাংগঠনিকভাবে সব চেয়ে দুর্বল তাঁতী লীগ। ছোট পরিসরে দিবসভিত্তিক দু’একটি কর্মসূচি পালন করলেও মাঠের রাজনীতি দেখা মেলেনি সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। ১৯ মার্চ জাতীয় সম্মেলনের পর ১৩ জুন ঢাকা মহানগর উত্তর দক্ষিণের কমিটি ঘোষণা করা হয়। দক্ষিণে আবু সুফিয়ান সভাপতি ও মোজাহারুল ইসলাম সোহেল সাধারণ সম্পাদক এবং উত্তরে হামিদ আহমেদ সভাপতি ও মোশারফ হোসেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্মেলনের পর ঢাকা মহানগরে এই তিন সংগঠনের মধ্যে একমাত্র তাঁতী লীগ দক্ষিণ পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে।

ঢাকা মহানগরের সহযোগী সংগঠনের কমিটির বিষয়ে মহিবুল হাসান চৌধুরী (নওফেল) বলেন, সহযোগী সংগঠনের কমিটির বিষয়ে আসলে আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। স্ব-স্ব সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক যারা আছেন তারাই আসলে কমিটি দেবেন। আমরা সমন্বয় করব। যদি একমত হতে না পারে তখন বসে একমত হওয়ার চেষ্টা আমরা করি।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.