ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। যে স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতিকে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বেনিয়া ও পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে। আর স্বাধীনতা অর্জনের মূল চেতনাই ছিল, মানুষের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। মানুষ স্বাধীনভাবে তার মতামত প্রকাশ করতে পারবে। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি চার দশক আগে। স্বপ্ন ছিল, দেশ স্বাধীন হবে, মানুষ কথা বলার সুযোগ পাবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মজবুত হবে, মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত হবে।

মানুষের ভাবের অধিকার বর্তমান সরকারের আমলে নিশ্চিত হলেও শংকা করা হচ্ছে কণ্ঠ রোধ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংসদে পাস করা হয়েছে। এ ধরনের আইন পাসে মানুষের কণ্ঠরোধ হবে, লিখনী শক্তি রহিত হবে মর্মে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে গণমাধ্যমের সাংবাদিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর বৈঠকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, বহুল নিন্দিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা রহিত করা হবে এবং ওই ধারায় মামলা করতে হলে পুলিশ সদর দফতর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল-২০১৮’ পাসের প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেন। বিলটি উপস্থাপনের পর আপত্তি তুলে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফকরুল ইমাম বলেন, বিলে স্টেকহোল্ডারদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। বাকস্বাধীনতার জন্য এটা উদ্বেগজনক। এটি একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিল। গণমাধ্যমের উদ্বেগ ও মতামত উপেক্ষা করায় স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধার সৃষ্টি করবে। দেশে সুশাসনের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, এই বিলের কারণে তা বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

জাতীয় পার্টির আরেক সংসদ সদস্য নুরল ইসলাম বিলটির ওপর কথা বলতে গিয়ে বলেন, বিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিলে গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত হয়নি। এমনকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, আমি স্থায়ী কমিটিতে বলেছিলাম, বিলটি যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তার বক্তব্যকে আমলে নেননি। যদিও শেষ পর্যন্ত কাজী ফিরোজ রশীদ বিলটি পাসের আপত্তি নেই মর্মে বিলটি পাসের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। প্রকৃত অর্থে বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলের ওয়াক আউট করা উচিত ছিল। কিন্তু সে আশা করা যায় কিভাবে? জাতীয় পার্টি তো মহাজোট সরকারের শরিক দল। এরপরও জনস্বার্থ পরিপন্থী কণ্ঠরোধের বিল পাসের আগের মুহূর্তে আপত্তি তোলায় তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

যদিও বিলটি পাসের আগে জনমত যাচাই বাছাই প্রসঙ্গে ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, বিলটি পাসের জন্য নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ রক্ষার জন্য ডিজিটাল আইন আমরা সবার আগে তৈরি করে পাস করছি। পৃথিবীর বহু দেশকে এই আইন অনুসরণ করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি এই আইনকে ঐতিহাসিক আইন বলতেও দ্বিধা করেননি। বাস্তবে পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমনকি সাম্রাজ্যবাদী ও ভোগবাদী কোনো রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করা না হলেও এই প্রথম বাংলাদেশে আইনটি পাস করে মন্ত্রী মহোদয় নিজেকে ধন্য মনে করছেন। বাস্তবেই আইনটি স্বাধীন মত প্রকাশের পথে বড় বাধা হেতু জন্যই এ ধরনের বিল অন্য কোন রাষ্ট্রে পাস হয়নি। সত্য কথা বলার জন্য মন্ত্রী মহোদয় ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য!

এই আইনটির বিপজ্জনক দিক হচ্ছে, পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা বহাল থাকা। হয়তো এক্ষেত্রে শুধু ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালকের অনুমতি নেয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সম্পাদক পরিষদের দাবি ছিল, ৫৭ ধারার প্রয়োগের ক্ষেত্রে উপযুক্ত আদালতের অনুমোদন ছাড়া কাউকে তল্লাশি ও গ্রেফতার করা যাবে না। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের এটাই রীতি। কিন্তু মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত বাধায় সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগকে আমলে নেয়া হয়নি। শুধু মাত্র এই ধারায় সংশোধনী এনে মানহানিকর তথ্য ‘প্রকাশ’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘প্রচার’ শব্দটি।

ডিজিটাল আইন সংসদে পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পুরোপুরি রহিত হয়েছে। ফলে ক্ষমতাসীনদের ভাষ্যের বাইরে অন্যকিছু আর প্রকাশ করা যাবে না। মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার প্রভাব শুধু গণমাধ্যমের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা শিক্ষক, পেশাজীবী, লেখক থেকে শুরু করে রাজনীতিকদেরও স্বার্থ পুরোপুরি ক্ষুণ্ন করবে। ডিজিটাল আইনে ৫৭ ধারার অপব্যবহার কিভাবে ঘটে, যা সাম্প্রতিক সময়ে কোটা সংস্কার এবং সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে হওয়া দু’টি ছাত্র-যুব আন্দোলনের সময় দেখা গেছে, ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে সরকারবিরোধী মত প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। এখন পর্যন্ত খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের জামিন পর্যন্ত হয়নি।

আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে ডিভিশন দিলেও সরকার পক্ষের কৌঁসুলিরা ডিভিশন বাতিল চেয়ে আপিল পর্যন্ত করেছেন। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, সরকার চায় তড়িঘড়ি করে বিচার কার্য শেষ করে কিভাবে ওঁনাকে কারাদণ্ড দেয়া যায়! এই হচ্ছে আমাদের গণতন্ত্রের চেহারা। অথচ সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে কোমলমতি ছাত্র/ছাত্রীদের ক’দিনের টানা আন্দোলনের শৃঙ্খলা দেখে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে মন্ত্রী-নেতা, নেত্রী প্রশংসা করেছেন, এমনকি অনুসরণেরও পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কিছুদিন ধরে ৩২ ধারাকে ঘিরে পক্ষে বিপক্ষে নানাজন নানাভাবে মত প্রকাশ করেছেন। ৩২ ধারায় যে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সরকার শব্দটির রূপান্তর করে ঘুরে ফিরে ইংরেজি শব্দ ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাকট’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদ্দেশ্য যে মহৎ নয়, তা স্পষ্ট। অর্থাৎ গুপ্তচরবৃত্তির বদলে ‘সিক্রেটস’ বা গোপনীয় কিছু প্রকাশ করলেই ৩২ ও ৫৭ ধারার প্রয়োগ হবে। যে ধারায় ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের’ আওতাভুক্ত অপরাধ-কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা প্রমাণিত হলে অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বহুল আলোচিত ওই ধারার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোরসহ স্টেকহোল্ডাররা। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা সম্পর্কে তাদের আপত্তি রয়েছে। বিলের এই ৬টি ধারা বিদ্যমান থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ হেতু তা নিয়ে সংসদীয় কমিটির সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত তা আমলে নেয়া হয়নি। এসব ঔপনিবেশিক আইন। সে সময় এসব আইন করে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকে হরণ করা হয়েছিল। এখন অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ঔপনিবেশিক আইন চালু নেই।

সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার তথ্যসংবলিত সরকারি নথির কপি রাখার দায়ে দেশটির আদালত বয়টার্সের দুজন সাংবাদিককে সাত বছর করে জেল দিয়েছে। মিয়ানমার যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের আইনের প্রয়োজন কোথায়? তাহলে কি গণতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়তেই থাকবে?

বিদেশে অর্থপাচার, ফার্মাস ব্যাংকের অর্থ লোপাটের তথ্য, ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই নকল, ভুয়া সনদে মুক্তিযোদ্ধা সেজে সরকারি আমলা কেলেঙ্কারির মতো খবরগুলো ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের’ আওতায় পড়লে এসব অপরাধের খবর দেশবাসী কোনোদিনও জানতে পারতেন না। তাহলে ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি, আমলাদের ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের ঘটনা গোপন রাখতেই কি ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের’ প্রয়োজন? এসব বিষয় তো এখন দেশে হরহামেশাই ঘটছে, যা সাংবাদিকরা জনগণের কাছে তুলে ধরেন। কিন্তু এই আইন পাস করে সাংবাদিকদের কি কোণঠাসা করে রাখা হবে? এসব বিষয় নিয়ে সম্পাদক পরিষদ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরাও চাই, সরকার ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাকট’ আইনের সংশোধনী এনে পুনরায় সংসদে সংশোধিত বিল আকারে পাস করিয়ে গণবিরোধী কালো আইনের কবল থেকে জাতিকে শংকা মুক্ত করুক।
– লেখক : কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এফএইচ