ডিএসসিসিতে ওরা কারা!

ডিএসসিসিতে ওরা কারা!

কাজ না করেই তুলছেন বেতন। চাকরি না পেয়েও কেউবা করছেন বদলি চাকরি আবার মূল কর্মচারী করছেন অন্য একটি প্রাইভেট চাকরি। প্রায়ই মিলছে এমন অভিযোগ। অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) এক শ্রেণির কর্মচারী এভাবে অনিয়ম করছেন দিনের পর দিন। কিন্তু কিছুতেই যেন এদের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। আর তাই সমাজ সচেতন মহলের জিজ্ঞাসা ডিএসসিসিতে ওরা কারা!

কাজ না করেই ডিএসসিসির এক শ্রেণির কর্মচারী বেতন নিচ্ছেন মর্মে ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘কাজ না করেই বেতন!’ শিরোনামে দৈনিক মানবকণ্ঠে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সংবাদে ডিএসসিসি ৩৪নং ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতা কর্মী একজন আজমত আলীর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা পাওয়ার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছিল। একই অনিয়ম না হলেও এবার ডিএসসিসিতে প্রকাশ পেল বদলি চাকরির ঘটনা। আর মামার বদলি চাকরি করতে এসে এবার ফেঁসে গেলেন খোদ ভাগিনা।

জানা গেছে, ডিএসসিসির আবর্জনাবাহী গাড়ি ৮ মে ইত্তেফাক-ইনকিলাব ভবনের সামনের রাস্তা দিয়ে উল্টো পথে রামকৃষ্ণ মিশনের দিকে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনা ঘটায়। দুর্ঘটনার পরই গাড়িটির চালক পারভেজ আশ্রয় নেন পার্শ্ববর্তী ডিউটিরত মতিঝিল থানা পুলিশের কাছে। যেহেতু দুর্ঘটনাটি ওয়ারী থানা এলাকায় তাই মতিঝিল থানা পুলিশ পরে তাকে হস্তান্তর করে ওয়ারী থানা পুলিশে কাছে। দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ওয়ারী থানার৬ এসআই সুশান্ত বিশ্বাস এবং এএসআই জ্যোতিষের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম। তারা সিটি কর্পোরেশনের পিকআপের চালকের কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চান। তিনি নিজের নাম পারভেজ এবং তার কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই বলে জানান। তাহলে সরকারি গাড়ি কীভাবে চালাচ্ছেন জানতে চাইলে পারভেজ জানান, সিটি কর্পোরেশনের গাড়িচালক তার মামা কবির হোসেন। তবে মামার ডিউটিই তিনি করছেন। দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে মামা কবির হোসেনের নামে বরাদ্দ গাড়ির ডিউটি করছেন তিনি (পারভেজ)। পারভেজের মাধ্যমে খবর পেয়ে মানিকনগরের বাসা থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ডিএসসিসির কর্মচারী চালক কবির হোসেন। তিনি ভাগ্নের কথার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে এখন আপস করিয়ে দেন। তখন পুলিশের ভাষ্য, প্রাইভেটকার মালিক আপসে রাজি হলে পুলিশের পক্ষ থেকে আপত্তি নেই। শুরু হয় ক্ষতিগ্রস্ত প্রাইভেটকারের মালিকের সঙ্গে দেন-দরবার। আর এ নিয়ে দেন-দরবার চলে রাত ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত। এ সময় প্রাইভেটকার মেরামতের জন্য ৪৫ হাজার টাকা দাবি করা হলেও শেষ পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকায় মীমাংসা করা হয়।

বদলি চাকরি করা বা দেয়া চাকরির বিধি অনুযায়ী কতটা আইনসিদ্ধ জানতে চাইলে ডিএসসিসির গাড়িচালক কবির হোসেন বলেন, হয়তোবা এটা ঠিক না কিন্তু অনেক সময় নিজের বিশেষ প্রয়োজনে তার ঊর্ধ্বতনদের ম্যানেজ করে অনেকেই এটা করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর সিটি কর্পোরেশনের অনেকেই এটা করেন। তবে যিনি বদলি চাকরি করছেন এবং যিনি দিচ্ছেন উভয়েই এতে উপকৃত হচ্ছেন।

ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন বিভাগ) নিতাই চন্দ্র সেন এ ব্যাপারে বলেন, চালক কবির হোসেনের চেহারাটা মনে পড়ছে না। তবে আপনার মাধ্যমে দুর্ঘটনা এবং চালকের অনুপস্থিতির কথা জানতে পারলাম। ঊর্ধ্বতনদের ম্যানেজ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে তিনি এ ব্যাপারে কথা বলবেন না বলে জানান।

এদিকে দুর্ঘটনাস্থলে থাকা ওয়ারী থানা পুলিশের এসআই সুশান্ত বিশ্বাস বলেন, গাড়িচালক ও প্রাইভেটকার মালিক উভয়ে আপসে সম্মতি হলে পুলিশের কী করার আছে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া এমনকি উল্টোপথে গাড়ি চালানোর অভিযোগে পুলিশের গাড়িতে বসিয়ে রাখা পারভেজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেত কিনা জানতে চাইলে সুশান্ত বিশ্বাস বলেন, ভাই আমার প্রচণ্ড জ্বর, ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।

জানা গেছে, কর্মস্থলে না থেকেও ডিএসসিসির এক শ্রেণির কর্মকর্তার বদৌলতে নিয়মিত পেয়ে গেছেন বেতন-ভাতা। আর সংস্থাটিতে ঘটছে চাকরিতে প্রক্সি দেয়ার মতো ঘটনাও। কর্মীদের এসব ফাঁকিবাজি রোধে এরই মধ্যে গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় ডিএসসিসিতে চালু করা হয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম।

সূত্র মতে, ডিএসসিসির ৩০ শতাংশ কর্মীই দায়িত্বে অবহেলা করেন। মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য। তবে কাজ না করেই এই কর্মীরা সংশ্লিষ্ট এক শ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন বলে অভিযোগে প্রকাশ। কিন্তু ফাঁকিবাজ কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগে জানা যায়।

এক অভিযোগে জানা যায়, সংস্থাটির কর্মীদের অনেকেই কাজে না এসে অন্যকে বদলি হিসেবে পাঠিয়ে কাজ করাচ্ছেন। মাস শেষে নিজের বেতন থেকে বদলি কর্মীকে নাম মাত্র টাকা দিচ্ছেন তারা। কাজ না করা এসব কর্মীদের অনেকেই বেশ প্রভাবশালী বলে জানা গেছে। তাদের দাপটে তটস্থ থাকতে হচ্ছে নিয়মিত কাজ করছেন এমন কর্মীদের। দাপুটে এসব কর্মীদের অনেকেই আবার বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা প্রভাব খাটিয়ে সিটি কর্পোরেশন থেকে এসব চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

তবে নিজের পরিবর্তে অন্যকে দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে হয় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড পরিদর্শককে। বেতন ভেদে এ ঘুষের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। অন্যথায় বেতন আটকে দেন সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক। কারণ তখন হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত দেখানো হয় কর্মীকে। এ কারণে তারা এই লেনদেন মেনেও নেন বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, প্রায় প্রতি মাসেই কর্মীদের প্রায় ৩০ শতাংশ কাজে অনুপস্থিত থাকেন। কিন্তু অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। কারণ এদের রয়েছে এক বিশাল সিন্ডিকেট। যার ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছেন না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটির রয়েছে পর্যাপ্ত পরিদর্শক। এসব কর্মীর প্রত্যেককেই দেয়া হয়েছে গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় একটি করে সিমকার্ড। কারণ মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমের মধ্যে হাজিরা নিশ্চিত হলেই কেবল তাদের বেতন দেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসবের কিছুই হচ্ছে না। সবটুকুই যেন কথার কথা।

এদিকে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে হাজিরা নির্ধারণে নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন করছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অথচ মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমের জন্য প্রতি মাসে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় তিন লাখ টাকা। মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন এমন নির্দেশনা বারবার দিলেও অনুপস্থিত কর্মীদের হাজিরা গণনা না করেই কর্মীদের বেতন দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, শিগগিরই মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের হাজিরা নির্ধারণ হবে। বিভিন্ন সমস্যা ও কারিগরি ত্রুটির কারণে এতদিন তা কার্যকর করা যায়নি।

কাজে অনুপস্থিতি থেকেও বেতন নেয়া প্রসঙ্গ তুলে ধরলে ডিএসসিসির এই কর্মকর্তা বলেন, এ অভিযোগ পুরোপুরি ঠিক নয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই বললেই চলে। তারা পড়াশোনা জানেন না। মোবাইল ফোনও ব্যবহার করেন না। আবার ফোন ব্যবহারে অনেকে অজ্ঞ। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে গ্রামীণফোনের মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম সফটওয়্যারে ত্রুটি ধরা পড়েছে। তারাও বিষয়টি সমাধানে সহযোগিতা করছেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.