ডাকসু নির্বাচন ‌‘অশোভন’ রাজনীতি

বাংলাদেশে কিছুদিন আগে সফর করে গেলেন বুকারজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায়। গণতন্ত্র নিয়ে তার একটি কথা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল, তিনি বলেছেন, এই উপমহাদেশে গণতন্ত্র শুধু ভোটাভুটিতেই সীমিত। সেটা জাল কিংবা সুষ্ঠু ভোট হোক না কেন। ভোট এল, রাজনীতিবিদেরা দুয়ারে এসে উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে ভোট চাওয়া শুরু করেন। কথাটা আসলেই সত্যি। আমরা গণতন্ত্র বলতে বুঝি শুধু একদিনের ভোট দেয়ার অধিকার।

সদ্য সমাপ্ত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ খলিলুর রহমান। খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হলেও সেটি ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা। সংবাদের ভাষ্য অনুযায়ী কিছুদিন আগেও তিনি সবার কাছে ছিলেন অবহেলার প্রাত্র। উপজেলা নির্বাচনে এলাকায় একমাত্র হাসির পাত্র ছিলেন তিনি। নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার সময় অনেকেই তাকে টমেটো আলু দিয়ে ঢিল ছুড়ে মারত। শুধু ঢিল নয় অনেক স্থানে তাকে ধাওয়া করা হয়েছে। তার প্রার্থী হওয়াকে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীরা তেমন গুরুত্ব দিতেন না।

সৈয়দ খলিলুর রহমান নিজেকে একজন মানবাধিকারকর্মী বলে সব জায়গায় পরিচয় দেন। নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই তার। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-১ (বাহুবল-নবীগঞ্জ) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। এর আগে তিনি ইউপি নির্বাচন করে পরাজিত হন। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনেও অংশ নেন তিনি। সব নির্বাচনেই বিপুল ভোটে পরাজিত হওয়ার পর এবারের উপজেলা নির্বাচনে তিনি অভিনব প্রচারণা শুরু করেন। ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে গিয়ে খলিলুর নির্বাচনী ইশতেহারে বলেন, আমাকে নির্বাচিত করে বাহুবলের জনগণের জুতার ধুলা-বালি পরিষ্কারের সুযোগ দিন। পাশাপাশি কাফনের সাদা কাপড় ও ফাঁসির রশি হাতে নিয়ে সবার কাছে ভোট প্রার্থনা করে খলিলুর বলতেন, ‘যদি আমি এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারি, তাহলে আমি গলায় রশি দিয়ে ফাঁস দেব। নির্বাচনের পরের দিন ১১ মার্চ সকালে সবাই আমার জানাজা পড়বেন।’ তার এই প্রচারণা শুনে অনেকে তাকে ধাওয়া করতেন এবং অনেক স্থানে ঢিল ছুড়ে মারতেন। সেই হাসির পাত্র সৈয়দ খলিলুর রহমানের কাছেই পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী নেতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত। বিশ্ব মানদণ্ডে হিসাবের খাতায় না থাকলেও বাংলাদেশের সবে ধন নীলমনি এই বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে পড়তে না পারা, ব্যক্তিগত ভাবে আমার অপ্রাপ্তির তালিকায় রেখেছিলাম। যদিও ভর্তি পরীক্ষাই দেয়া হয়ে উঠেনি। বাংলাদেশের রাজনীতির চারণ ভূমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের রাজনীতির যতো উজ্জ্বল মুখ, যতো কিংবদন্তি তার ৯০ ভাগ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। শুধু মাত্র রাজনীতি নয়, প্রশাসন থেকে শুরু করে সব জায়গায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জয়জয়কার।

বাংলাদেশের প্রতিটা অর্জনে, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে, স্বাধীনতা সংগ্রামসহ ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সব জায়গায় নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলন সংগ্রামের আতুর ঘর এই প্রতিষ্ঠান। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে বারবার আপন বিক্রমে গর্জে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমি এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদের ব্যক্তিগত ভাবে আলাদা মূল্যায়ন করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কখনো লিখেনি কোনদিন। আমার মনে হয়েছে আমি সেই যোগ্যতা রাখিনা। এখানে যারা পড়েন বা পড়ান তারা আমার চেয়ে যোগ্যতম মানুষ। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের ডাকসু নির্বাচন সেই ধারণা বদলে দিয়েছে অনেকটাই। মনে হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু যোগ্যদেরই জায়গা নয়। এখানে অযোগ্যরা বিচরণ করে। এবং তাদের সংখ্যাই বেশী। যেহেতু সর্বাধিকগণের মতামতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

ডাকসু নির্বাচন আগামীর নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া। যারা বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচিত হয়ে মূল ধারার রাজনীতিতে আগামীতে দেশকে নেতৃত্ব দিবেন। ধরলাম ছাত্রলীগের প্রতি বীতশ্রদ্ধ সাধারণ ছাত্ররা চায়নি ছাত্রলীগ নেতৃত্বে আসুক। বিকল্প হিসাবে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সংগঠন যেসব ছিল ছাত্র ইউনিয়ন, সংহতি মৈত্রীসহ নানা বিধ সংগ সেখান থেকে কাউকে নির্বাচিত করতে পারত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যদি বেশীর ভাগ ডানপন্থী বা ধর্মীয় রাজনীতি প্রিয় হয়ে যান তবে ছাত্রদলের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে পারতেন। কারণ ছাত্রশিবির বা অন্য কোন ধর্মীয় রাজনৈতিক দল যেহেতু প্রার্থী দেয়নি। অথবা যদি সুবিদাবাদী বা সুযোগ সন্ধানী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশী হয় তাহলে জাতীয় পার্টির সংগঠন ছাত্রসমাজ থেকে তাদের নেতা নির্বাচন করতে পারত। এর কোনটাই না করে, কোটা সংস্কার বিরোধী আন্দোলনের নেতা নুরুকে বিজয়ী করলেন তারা!

নুরুল হক নুরু, ভিপি নির্বাচিত হতেই পারেন। এতে সমস্যার কিছু নেই। বরং নুরু যে পরিবার থেকে উঠে এসেছেন সেটা গৌরবের। একেবারে প্রান্তিক অবস্থা থেকে উঠে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি নির্বাচিত হওয়া খুব সহজ কিছু নয়। আমি জানিনা সেটা নুরুর নেতৃত্বের কারণে, নাকী শিক্ষার্থীদের সহানুভূতির কারণে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। যেভাবেই হয়ে থাকুক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে নুরুল হক নুরু ডাকসুর ভিপি। ব্যক্তি নূরুকে আমার অভিনন্দন। ভিপি নুরুকে আমার অভিনন্দন। আগামীর বাংলাদেশের নেতাদের নেতা নুরুকে আমার অভিনন্দন। কথাটা ঠিক কার মনে নেই, যদি ভুল না করি, ‘কোন দেশের শাসক দেখলেই বুঝা যায়, সেই দেশের জনগণ কেমন’। ডাকসু নির্বাচন ও সেই ধারণা দেয় আমাদের।

ফলাফল ঘোষণার পর দেখলাম বিজয়ী এবং পরাজিত দুই পক্ষই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করেছেন। যদিও পরবর্তীতে ছাত্রলীগ ফলাফল মেনে নিয়েছে। এখন অপেক্ষার পালা, বিজয়ী অন্যান্য পক্ষ শপথ গ্রহণ করেন কী না। কারণ নির্বাচন বর্জন করলে নৈতিক ভাবে আর বিজয়ী পদ গ্রহণ করার কথা না।

লাশ ছাড়া রক্ত ছাড়া, ২৮ বছরের বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচনের ধারায় ফিরেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমার ধারণা এর ধারাবাহিকতা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ও চলমান থাকবে। পর্যায়ক্রমে দেশের কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদ চালু হবে। ডাকসু নির্বাচনে বিতর্ক যতোই থাকুক অপ্রাপ্তি যতোই থাকুক, নির্বাচন শুরু হওয়াটা সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই সফলতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সরকার দুই পক্ষেরই প্রাপ্য। তার চেয়েও আমার কাছে বড় প্রাপ্তি মনে হয়েছে ছাত্রলীগের পরাজিত ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক শোভন। অশোভন রাজনীতির ভীড়ে শোভনের শোভন ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে।

নীতিকথার কিংবা বইয়ের ভাষার বাইরে গেলে, তথাকথিত ছাত্র সংগঠন গুলোর নেতাদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে কমবেশী। সেই জায়গায় যদি সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতা যিনি, তাদের হম্বিতম্বি বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি। আর এটাই বাস্তবতা। নির্বাচনে পরাজয়ের বেদনা যিনি নির্বাচনে হারেন তিনি খুব ভাল জানেন। প্রেসক্লাব নির্বাচনে পরাজিত হয়ে সেই বেদনা কিছুটা আমার ধারণা আছে। কিন্তু শোভন সেই পরাজয়কে যে ভাবে হাসিমুখে বরণ করে নিয়ে নুরুকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন সেটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। কিন্তু অরণি নামের পরাজিত এক প্রার্থী যেভাবে শোভনকে মন্তব্য করেছেন আমি সন্ত্রাসীর সাথে ছবি তুলিনা। আমি জানিনা শোভনের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে প্রতক্রিয়া কি হতো! কিন্তু শোভন ছেলেটি হাসিমুখে হাত নেড়ে চলে আসলো। আমি আবারো মুগ্ধ হলাম! কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য হলো শোভনরা হারিয়ে যায়। অথবা এদের দূরে ঠেলে দেয়া হয়। মানুষ ভালোবাসে বাঘকে কিন্তু পোষার সনয় ঘরে কুকুর পোষে। আমাদের রাজনীতি ও ঠিক তেমনি। শোভনের বক্তব্য আমি বার কয়েক মন দিয়ে শুনলাম, মনে হয়েছে অমিত সম্ভাবনাময় এক নেতা সে। অশোভন সময়ে, আরো বেশী শোভনরা রাজনীতিতে আসুক। তবেই অতীত ঐতিহ্যের ধারায় ফিরবে ছাত্র রাজনীতি।

সব শেষে সিলেটের ছক্কা ছয়ফুরের কাহিনী পাঠকদের আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই,। তার দলের নাম ছিল ইসলামি সমাজতান্ত্রিক দল। সেই দলে কোনো সদস্য নেয়া হতো না। এমনকি উনার স্ত্রীকেও সদস্য করেননি। তিনি বলতেন, একের বেশি লোক হলেই দল দুইভাগ হয়ে যাবে। ছক্কা ছয়ফুর বেশ কয়েকবার নির্বাচন করেছেন। কখনোই তাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি; সবাই মজার ক্যান্ডিডেট হিসেবেই নিয়েছিল। কিন্তু তিনি ১৯৯০ সালের উপজেলা নির্বাচনে সিলেট সদর উপজেলায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার প্রতীক ছিল ডাব। তিনি একটা হ্যান্ডমাইক বগলে নিয়ে একা একা প্রচার চালাতেন। পোস্টার লিফলেট কিছুই নেই। কিন্তু বক্তৃতা তীর্যক। বাকি প্রার্থীদেরকে তুলাধুনা করে ফেলছেন। এরকম এক সন্ধ্যায় সিলেটের টিলাগড়ে তার উপর অন্য এক প্রার্থীর কয়েকজন পান্ডা হামলা করে বসল। পরের দিন সেই খবর গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। সাধারণ মানুষ বিরক্ত হলো। আহা! একেবারেই সাধারণ একটা মানুষ, তার সঙ্গে গুন্ডামি করার কী দরকার ছিল? মুহূর্তেই যেন সারা শহরে খবর হয়ে গেল। সন্ধ্যার মধ্যেই পাড়া-মহল্লা থেকে মিছিল শুরু হলো ছয়ফুরের ডাব মার্কার সমর্থনে। একেবারেই সাধারণ নির্দলীয় মানুষের মিছিল। পাড়া মহল্লার দোকানগুলোর সামনে আস্ত আস্ত ডাব ঝুলতে থাকল। রিক্সাওয়ালারা ট্রাফিক জ্যামে আটকেই জোরে জোরে ডাব, ডাব বলে চিৎকার শুরু করে!

তিনি এমন প্রার্থী ছিলেন, যাকে তারই নির্বাচনী জনসভায় নিয়ে আসার জন্য উল্টো টাকা দিতে হতো। নির্বাচনের দিন জনগণ এক মহ-বিস্ময় প্রত্যক্ষ করল। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইফতেখার হোসেন শামীমের মতো জাদরেল নেতা তার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। বাকি সব প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। কখনো কখনো সৈয়দ খলিলুর রহমান কিংবা ছক্কা ছয়ফুররা ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ডাকসুও এমন ইতিহাসেরই জন্ম নিলো। দুঃখ হলো সাধারণ জনগণ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফারাক বুঝতে না পারা।

লেখকঃ ব্রিটেন প্রবাসী সাংবাদিক, কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.