ডাকসুর পুনঃতফসিলের দাবিতে অনশন চলছে

ডাকসুর পুনঃতফসিলের দাবিতে অনশন চলছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে অনশন অব্যাহত রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষার্থী। নির্বাচনের পুনঃতফসিল, ভোট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তিসহ নানা দাবিতে অনশন চালিয়ে যাচ্ছে তারা। এর মধ্যে রাজু ভাস্কর্যের সামনে অনশন করছেন ৬ শিক্ষার্থী। যাদের একজনকে ইতোমধ্যে শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনের দিন রোকেয়া হলে ঘটা অনিয়মে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার অভিযোগ এনে প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে বুধবার রাত থেকে হলগেটের সামনে অনশন করছেন ওই হলের পাঁচ শিক্ষার্থী। আমরণ অনশনে বসা রোকেয়া হলের পাঁচ ছাত্রীকে মধ্যরাতে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। অনশনরত ছাত্রীদের অভিযোগ, নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানী তাদের হেনস্তা করেন। তবে ছাত্রীদের হেনস্তার বিষয়ে রোকেয়া হলের প্রভোস্টকে কিছু জানানো হয়নি বলে জানান জিনাত হুদা। রোকেয়া হলের অনশনরত ছাত্রীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে ডাকসুর নবর্নির্বাচিত ভিপি নূরুল হক ও ছাত্রদল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে মোটরসাইকেলে করে শতাধিক নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে রোকেয়া হলের সামনে আসেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) গোলাম রাব্বানী। তিনি এসে প্রক্টরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি প্রক্টরকে জানান, হলের কিছু মেয়ে মধ্যরাতে গেট খুলে বাইরে অবস্থান করে অন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছেন। এরা খুব বাড়াবাড়ি করছে স্যার। এদের সবগুলোর ফাইল দেখে চিহ্নিত করে, গার্ডিয়ান ডেকে এনে স্থায়ীভাবে একাডেমিক বহিষ্কার করেন। প্রায় পাঁচ মিনিটের কথোপকথনে কয়েকবার প্রক্টরের কাছে একই দাবি জানান। এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হন হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইশরাত কাশফিয়া ইরা, বর্তমান সভাপতি ও ডাকসুর কমনরুম বিষয়ক সম্পাদক লিপি আক্তার, হল সংসদের সদস্য সুরাইয়া আক্তারসহ ছাত্রলীগের কয়েক নেত্রী।

ডাকসুর জিএস রাব্বানীর কাছে তারা অভিযোগ করেন, অবস্থানকারীদের কারণে হলের শিক্ষার্থীরা ঘুমাতে পারছেন না, পড়তে পারছেন না। এরপর রাব্বানী হলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা অনশনকারীদের কয়েক সমর্থককে দেখিয়ে ছাত্রলীগ নেত্রীদের প্রশ্ন করেন, রাত দুইটার দিকে বোরকা, নেকাব পরা এরা কারা? ছাত্রী সংস্থা? শিবিরের কর্মী? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের অবস্থান নিষিদ্ধ।

এ সময় ঘটনাস্থলে হলের হাউস টিউটরা এসে রাব্বানীকে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। জিএস চলে যেতে উদ্যত হলে তাকে ফিরিয়ে আনেন হল ছাত্রলীগ নেত্রীরা। ফিরে এসে আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করতে হল ছাত্রলীগ নেত্রীদের নির্দেশ দেন রাব্বানী।

এ বিষয়ে রাব্বানীর সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীরা কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, হলের গেট খোলা রেখে ছাত্রীদের অবস্থানের কথা শুনে হলে অবস্থান করা অন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমি ওখানে যাই। গিয়ে দেখি, কয়েকজন মদ-গাঁজা খেয়ে আন্দোলন করছে। এই ১০-১৫ জনের কারণে অন্যদের ক্ষতি হলে সে দায় নেবে কে? এ সময় এক শিক্ষার্থীর ছবি দেখিয়ে রাব্বানী অভিযোগ করেন, এই মেয়ে মদ-গাঁজা খেয়ে ধরা পড়েছিল। সে এখানে আন্দোলন করছে। এরাই ভোটের দিন ব্যালট ছিনতাই করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট দিতে দেয়নি। প্রভোস্ট ম্যামকেও লাঞ্ছিত করেছে। এদের সামনে প্রভোস্ট ম্যাম আসবেন কীভাবে? সবারই আন্দোলন, অনশন করার রাইট আছে। কিন্তু রাত দুটোর দিকে হলের গেট খোলা রেখে অন্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার রাইট কারোর নেই।

তিনি বলেন, বোরকা পরে মুখ ঢাকা মেয়েরা এখানে কেন? এরা শিবিরের ছাত্রী সংস্থার। তার পরেও তারা ক্যাম্পাসে। এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা। রাত সোয়া দুটার দিকে নেতাকর্মীদের নিয়ে হলের সামনে থেকে চলে যান রাব্বানী। কয়েক মিনিট পর মোটরসাইকেল করে এসে স্লোগান দিয়ে শোডাউন দেন ছাত্রলীগের কয়েক কর্মী।

অনশনকারী শ্রবণা শফিক দীপ্তি জানান, চার দাবিতে তারা অনশন করছিলেন। গত বুধবার রাতে গোলাম রাব্বানী তার নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে গিয়ে তাদের এবং সমর্থনকারীদের হেনস্তা করেন। ছবি দেখিয়ে একজনকে চরিত্রহীন প্রমাণের চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, আমরা মদ-গাঁজা খেয়ে আন্দোলন করছি। এ ছাড়া আমাদের চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের জন্য প্রক্টরকে বলেন।’

হেনস্তার বিষয়ে জানতেন না হল প্রভোস্ট : অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ এনে ফের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আমরণ অনশনে বসা রোকেয়া হলের পাঁচ ছাত্রীকে হেনস্তার বিষয়ে জানতেন না হলটির প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদা। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।

ছাত্রীদের হেনস্তার বিষয়ে জানতে চাইলে জিনাত হুদা বলেন, এ ঘটনার বিষয়ে আমি অবগত নই। কোনো হাউস টিউটরও আমাকে অবগত করেননি। তারা হলের গেটের বাইরে গিয়ে অবস্থান করছেন। সেখানে হেনস্তা হওয়ার ঘটনাটি আমাদের কনসার্ন নয়। আমাদের কনসার্ন তাদের গেটের বাইরে থেকে হলের ভেতরে নিয়ে আসা।

শিক্ষার্থীদের এসব দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে সংবাদ সম্মেলনে প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদা বলেন, পুনরায় নির্বাচন দেয়ার এখতিয়ার হল প্রাধ্যক্ষের নেই। এই সিদ্ধান্ত তাই আমি নিতে পারি না। মামলা প্রত্যাহারের দাবির প্রসঙ্গ টেনে প্রাধ্যক্ষ বলেন, তিনি কোনো মামলা করেননি। শাহবাগ থানায় দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহারে কোনো সহযোগিতা করবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রীদের আমার কাছে তো আসতে হবে। অনশনরত ছাত্রীদের সঙ্গে কেন দেখা করেননি জানতে চাইলে প্রাধ্যক্ষ বলেন, আমি ওদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। ওদের কথা বলার জন্য ডেকেছিও। কিন্তু ওরা কথা বলতে আসেনি।

অনশনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য প্রক্টরিয়াল টিম রয়েছে। আমি নিজেও আবাসিক শিক্ষকদের পাঠিয়েছি, যেন ওদের নিরাপত্তায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। আমি নিজেই তো তিন রাত ঘুমাতে পারিনি ছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। তার পদত্যাগের দাবির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে বলেন, তাদের সঙ্গে আমি ফোনে কথা বলেছি। তাদের আমি বলেছি, তোমাদের হয়তো কিছু ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। অনশনকারীদের সঙ্গে নূর ও ছাত্রদলের একাত্মতা প্রকাশ : রোকেয়া হলে চার দফা দাবিতে পাঁচ শিক্ষার্থীর অনশনে একাত্মতা জানিয়েছেন ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নূরুল হক নূর। গতকাল বেলা দেড়টার দিকে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্য নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে ছাত্রীদের অনশনে একাত্মতা জানান। এ সময় নূরুল হক বলেন, এত কারচুপির পর ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েও আমি আমার বোনদের এই চারটি দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আমি আমার এই বোনদের দাবিগুলো বিবেচনা করার দাবি জানাব। অতি দ্রুত তারা আমার এই বোনদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এই দাবি-দাওয়াগুলো মেনে নেবেন। তিনি বলেন, আমরা শুনেছি আমাদের বোনদের নাকি লাঞ্ছিত করা হয়েছে, তাদের নাকি হেনস্তা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অপসংস্কৃতির চর্চা বাস্তবায়ন করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে যেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়।

রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ মিথ্যাচার করছেন অভিযোগ করে নূরুল হক নূর বলেন, আমার সহযোদ্ধা ফারুক হাসান, প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতা লিটন নন্দী, স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খানসহ আমরা সেদিন রোকেয়া হলে গিয়েছিলাম। অভিযোগ ছিল, গোপনে ব্যালটে সিল মারা হচ্ছে। সেটিই দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাদের দেখতে দেননি। বরং তিনি আমাদেরও নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি আমাদের মারার জন্য ছাত্রলীগের লেডিমাস্তান বাহিনীসহ কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারিকে ডেকেছিলেন। আর আমার বোনেরা যখন অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল, তখন তাদেরও দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছিল। এরপরে সেখানে সংহতি জানাতে আসেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের হয়ে ডাকসুর সহসভাপতি প্রার্থী মোস্তাফিজ রহমান। তিনি বলেন, ছাত্রীদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আছে। ছাত্রদল তাদের সঙ্গে থাকবে সব সময়।
তৃতীয় দিনের মতো রাজু ভাস্কর্যে অনশন : অনিয়মের অভিযোগে ডাকসু ও হল সংসদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে রাজু ভাস্কর্যের সামনে ছয় শিক্ষার্থীর অনশন তৃতীয় দিনের মতো অব্যাহত রয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা অনশনে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ এসে যতক্ষণ না তাদের আশ্বস্ত করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তারা।

অনশনে বসা শিক্ষার্থী মাঈন উদ্দিন বলেন, নতুন তফসিল ঘোষণা করার আগেই এবারের ভোট কারচুপিতে যারা জড়িত তাদের পদত্যাগ করতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ এসে আমাদের আশ্বস্ত করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা অনশন চালিয়ে যাব।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.