ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে উল্লেখ্যযোগ্য কোনো গতি এখনো আসেনি। কারণ, ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার ৭ মাসেও তার প্রশাসন সাজানোর কাজটি পুরোপুরি সম্পন্ন করতে পারেননি। বিশেষ করে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের নিয়োগ এখনো সম্পন্ন হয়নি। তাছাড়া ট্রাম্পকে নিয়ে সেদেশে অভ্যন্তরীণ যেসব সংকট দেখা দিয়েছিল সেগুলোও এখনো নিরসন হয়নি। ভারতসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদগুলো এখনো খালি রয়েছে। এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধসহ নানা কারণে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো বাংলাদেশের দিকে নজর দিতে পারেনি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড এতদিন পর্যবেক্ষণের পর এখন সম্পর্কোন্নয়নে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ সম্মেলনের সাইডলাইনে ট্রাস্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের চেষ্টা চালানো হবে। এছাড়া আগামী অক্টোবরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পার্টনারশিপ ডায়ালগ এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সিকিউরিটি ডায়ালগ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ইতিমধ্যে ঢাকার পক্ষ থেকে জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই দুটি বৈঠক হলে দু’দেশের মধ্যে আপাতত সম্পর্কোন্নয়নে কিছুটা কাজ হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে এই দুটি বৈঠকের দিনক্ষণ প্রস্তাব করা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে উদ্যোগ নিতে সম্প্রতি একটি জরুরি বৈঠক করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে সমন্বিত উপস্থাপনা করেন মন্ত্রণালয়ের আমেরিকান অনুবিভাগের মহাপরিচালক আবিদা ইসলাম। এছাড়া কানাডা ও ল্যাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাই আগামী অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডা ও ল্যাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সফরের চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বর্তমান সরকারের একটি সখ্য তৈরির সুযোগ থাকলেও সময়োপযোগী না হওয়ায় এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছে না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে, ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাস্পের প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিন্টনের সঙ্গে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের অনৈতিক লেনদেন নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি হাতিয়ার হতে পারত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এদিকে কোনো খেয়াল করারও সুযোগ পাচ্ছে না। কারণ, অভ্যন্তরীণ এবং রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিয়েই ব্যস্ত রয়েছেন ট্রাম্প। ফলে বাংলাদেশের মতো অনুন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে এখনো নজর দিতে পারেনি ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের গত ৭ মাসে ঢাকার সঙ্গে মাত্র একটি বৈঠক হয়েছে, তা হলো টিকফা। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয় এবং আগামীর পথ চলার বিষয়ে দুই দেশের কর্মকর্তারা গতানুগতিক আলোচনা করলেও কার্যকর কোনো ঘোষণা আসেনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিকর কোনো নীতি ট্রাম্প প্রশাসন এখনো নেয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে দেয়া আর্থিক সহায়তার বাজেট কমানো, বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলে প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় না করা, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের বাজেট কাটছাটের প্রস্তাবে উদ্বিগ্ন ঢাকা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, সহায়তা কমানো সংক্রান্ত বাজেট প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে নেমে আসবে। আর এতে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অনুদানেও ভাটা পড়বে। তবে হলি আর্টিজানে নৃশংস জঙ্গি আক্রমণের পর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকারের সক্রিয়তা এবং সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জিরো টলারেন্স নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রশংসা পেয়েছে। ফলে এখানে জঙ্গিবাদ দমনে মার্কিন সহায়তা আরো বাড়ার আভাস মিলেছে। প্রস্তাবিত মার্কিন বাজেটে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রাখতে নতুন করে আরো ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব ও উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা।

মানবকণ্ঠ/এসএস