ট্রাম্প কি পুতিনের সঙ্গে প্রতারণা করছেন?

ট্রাম্প কি পুতিনের সঙ্গে প্রতারণা করছেন?পুরো বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই গেল ২ বছর ভেবেছে যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার মার্কিন প্রতিপক্ষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আঙ্গুলের ডগায় রেখে নাচাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো ট্রাম্পই একমাত্র ব্যক্তি যিনি পুতিনকে চরকির মতো ঘুরিয়েছেন।

পুতিনকে ভালোবাসেন ট্রাম্প কিংবা অন্তত বলার জন্য হলেও বলেন। নানা ভঙ্গিমায় ও উচ্চৈঃস্বরে ট্রাম্প যেমন টিভি শোতে উপস্থাপনা করেছেন, ঠিক একইভাবে পুতিনের নেতৃত্বেরও প্রশংসা করেন। সেই সঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারবেন।

২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগের পরও ডোনাল্ড ট্রাম্প গেল বছরের গ্রীষ্মে হেলসিংকিতে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সাবেক কেজিবি সদস্য পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে মেশার চেষ্টা করেছেন। পুতিনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ট্রাম্পের জন্য নিবেদিত (কিন্তু অবশ্যই তা ট্রাম্পের কাজে হস্তক্ষেপ করে নয়)। কেননা তারা উভয়েই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চান।

বর্তমানে অন্য যে কোনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পুতিনের মার্কিন বন্ধুত্ব বেশি দরকার। যদিও গেল মার্চের নির্বাচনে পুতিন ভ‚মিধস বিজয় অর্জন করেছেন, তারপরও তার জনপ্রিয়তা কমে ৪৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের পূর্বসূরি ওবামা প্রশাসনের আরোপ করা নানা মাত্রিক নিষেধাজ্ঞার ফলে যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তাতে রুশরা বিরক্ত। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করাকে কেন্দ্র করে বারাক ওবামা এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। আর এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে পুতিনের জনপ্রিয়তা একেবারে তলানিতে পৌঁছায়।

রুশদের ক্ষোভের আরো অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পেনশন ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার এবং অবসর গ্রহণের সময় বৃদ্ধি। এই পদক্ষেপ সম্ভবত সাধারণ রুশদের মধ্যে এক ধরনের ক্লান্তিকর বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। তারা ইউক্রেন ও সিরিয়ায় পুতিনের যুদ্ধংদেহী পররাষ্ট্র নীতি আর পশ্চিমা দেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা দেখতে দেখতে একেবারেই ক্লান্ত।

পুতিনের জন্য দুর্ভাগ্য, ক‚টনৈতিক কিছু আলাপ-আলোচনা ও প্রস্তাবের পরও ট্রাম্প দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তেমন একটা জোরদার করতে পারেননি। এসবের মধ্যে পুতিনকে হোয়াইট হাউসে নিমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন তিনি। যদিও মিত্র দেশগুলো থেকে ট্রাম্পের দূরত্ব বজায় রেখে চলার কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোকে দুর্বল করার পুতিনের ইচ্ছা পূরণে কিছুটা সহায়ক হয়েছে। ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়েছে তিনি পুতিনের জন্যই এসব করেছেন। তবে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের করা নতুন অবরোধকে রুশরা নিজেদের জন্য বেশ কড়া পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন।

গেল মার্চ মাসে, যুক্তরাজ্যে সাবেক রুশ গোয়েন্দা আলেক্সান্ডার স্ক্রিপাল ও তার মেয়ের ওপর যে নার্ভ-এজেন্ট হামলা চালানো হয় এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ৬০ জন রুশ ক‚টনীতিককে বহিষ্কার করে ট্রাম্প প্রশাসন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এত বিপুল সংখ্যক ক‚টনীতিক বহিষ্কারের ঘটনা এটাই প্রথম। নির্বাচনে বিপুল বিজয়ে ট্রাম্প উষ্ণ অভিনন্দন জানানোর পরপরই ক‚টনীতিক বহিষ্কারের এমন ঘটনা পুতিনের জন্য বেশ বিব্রতকর।

এর পরের মাসেই, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ২০ জন রুশ ব্যক্তি ও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এদের মধ্যে অন্যতম রুশ তেল ও অ্যালুমিনিয়াম টাইকুন ওলেগ দেরিপাস্কা ও অ্যালেক্সি মিলার। এর ফলে এসব কোম্পানির শেয়ারের ব্যাপক দরপতন ঘটে। এরপর গেল আগস্ট মাসে, সামরিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে রাশিয়ায় গ্যাস টার্বাইন ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি রফতানি করা মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।

এর ওপর আবার অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিল আমদানিতে ট্রাম্পের ট্যারিফ বসানোর পদক্ষেপ মূলত রাশিয়াকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশেষ করে এমন পদক্ষেপের ফলে চলতি বছরের মধ্যে রুশ অর্থনীতিতে ব্যয় বাড়বে কমপক্ষে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। স¤প্রতি শীতল যুদ্ধকালীন দ্বিপাক্ষিক অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণ চুক্তি বা মাঝারি পাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র চুক্তি -আইএনপি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এখানে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। যদিও অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক পদক্ষেপ।

ক্রেমলিন এখনো বিশ্বাস করে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেসে বিরোধীদের ভ‚মিকার কারণেই। এখানে ডেমোক্র্যাট বা মিডিয়ার ভ‚মিকা নেই বলে বিশ্বাস তাদের। এখানে যুক্তি বলে যে, সন্দেহজনক যে কোনো পদক্ষেপ থেকে থাকলে তা পুতিনকেই বেশি লাভবান করবে। ডেমোক্র্যাটরা কিছু করলে এমন কিছু করবে যেন ট্রাম্প কৌশলগত দিক দিয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়তে না পারে।

কিন্তু সত্যি ঘটনা হলো, ট্রাম্পের লাগাম টেনে ধরার ব্যাপারে ডেমোক্র্যাট বা মিডিয়া কোনো পক্ষেরই আসলে তেমন কোনো ভ‚মিকা ছিল না। কেননা রিপাবলিকানরা মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই প্রভাবশালী। এমনকি সিনেটর লিনডসে গ্রাহাম ও টেড ক্রুজ এর মতো প্রভাবশালী নেতাও এখানে ট্রাম্পের পক্ষেই কথা বলছেন। এসব কার্যক্রমের ব্যাপারে নিজের দলের প্রতি ট্রাম্পের আঙ্গুল তোলার ঘটনা দেখে মনে হয় পুতিনের প্রতি তার বিশেষ অনুজ্ঞা প্রকাশের ব্যর্থতা অন্যের কাঁধেই বর্তায়।

পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের এই বিদ্রোহকে আরো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, ট্রাম্পের মিষ্টি মিষ্টি কথা বলার কারণ ছিল নিজেকে আলোচনায় রাখা, ক্রেমলিনকে সহায়তা করার জন্য নয়। অন্যান্য শক্ত প্রতিপক্ষ বিশেষ করে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কে আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্পের নানা প্রস্তাব বা ঘোষণার দিকে খেয়াল করলে দেখবেন যে, এখন সে দেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আর ট্রাম্প এখন চীনকে ভাবছে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু।

এটা ঠিক যে, পুরো বিশ্বই এখন ট্রাম্পকে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা আর তার খামখেয়ালীপূর্ণ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করছে। অবাক করা বিষয় হলো, পুতিন এসব কার্যক্রম ও পরিস্থিতিকে কতটা ভুল বুঝলেন। সাবেক গোয়েন্দা হিসেবে পুতিনের কাজই ছিল মানুষের আচার-আচরণ ও কথা-বার্তা শুনে প্রকৃত অবস্থা ও উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করা। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন একনিষ্ঠ পর্যবেক্ষক হওয়ার পরও তিনি ট্রাম্পের এসব মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ধরতেই পারলেন না!

যদি একজন ব্যক্তিও জানে যে, কথার চেয়ে কাজের আওয়াজ অনেক বড়, তবে সেই ব্যক্তি হবেন পুতিন। পুতিন অনেক সময় এমনভাবে কথা বলেন যা অনেক সময় সুনির্দিষ্ট অন্যায়েরও সুস্পষ্ট প্রত্যাখ্যান হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের মতো কাজ যা উভয় দেশের মধ্যকার চুক্তিবিরোধী। যদিও এখনো ট্রাম্পের আরোপ করা অবরোধ ও আরো বৈঠকের আহ্বান পুতিন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গেল নভেম্বরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শতবর্ষ উপলক্ষে প্যারিসে আয়োজিত অনুষ্ঠান কিংবা আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত জি-টোয়েন্টি সম্মেলনে যোগ না দেয়ার মতো ঘটনা।

দৃশ্যত মনে হচ্ছে, কৌশলগতভাবে অসম প্রতিদ্ব›দ্বী ট্রাম্পকে তার শেষ সীমা পর্যন্ত যেতে দিতে চান পুতিন। বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প প্রত্যেককেই তার টিভি-রিয়েলিটি শোতে এনে উপস্থিত করেছেন। যেখানে সেনসেশন আছে, বাড়াবাড়ি আছে আর আছে নানা মিথ্যার সমাহার। তবে এসবই তার একটি মাত্র লক্ষ্য পূরণের জন্য ‘দ্বীপের সবশেষ টিকে থাকা মানুষ’ হয়ে ওঠা। সময়ের ব্যবধানে পুতিন শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছেন যে, তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন, কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ বিধ্বংসী তৎপরতা ঠেকাতে সম্ভবত এ বিশ্বকে অনেক মূল্য দিতে হবে এবং একই সঙ্গে পুতিনকেও হয়তো সমান মূল্যই পরিশোধ করতে হবে। – লেখক : প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে লিখছেন ১৯৯৭ সাল থেকে। ‘দ্য নিউ স্কুল’ এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক। ওয়ার্ল্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক। প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর করেছেন সাজিদ রাজু

মানবকণ্ঠ/এএম