টেকসই উন্নয়নের মডেল ‘মৌতলা ইউনিয়ন’

অসীম বরণ চক্রবর্তী, সাতক্ষীরা :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের একটি গ্রামীণ সড়কের নাম পরমানন্দকাটি-পানিয়া সড়ক। সড়কটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের। এ সড়ককে বাঁধ হিসেবে ব্যবহার করে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে অসংখ্য মৎস্য ঘের তৈরি করেছেন ঘের মালিকরা। এর ফলে ঘেরের জমে থাকা পানিতে সারা বছর ক্ষতিগ্রস্ত হতো সড়কটি। তার মধ্যে সড়কের অনেক স্থান ধসে পড়ত। মালিকদের অজ্ঞতা আর উদাসীনতায় অপরিকল্পিত ঘেরের কারণে সড়কের ক্ষতি হলেও তা রক্ষায় দৃশ্যত কোনো উদ্যোগ দেখা যেত না।
‘রাস্তা হবে না ঘেরের বাঁধ’ সেøøাগান নিয়ে সম্প্রতি ওই ইউনিয়নের সব ক’টি সড়ক রক্ষায় উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মৌতলা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি)। এর ফলে ঘের মালিকরা রাস্তাকে ঘেরের বাঁধ পারছে না। উল্টো মালিকদের ঘের ও সড়কের মাঝামাঝি ৩-৪ ফুট চওড়া আউট ড্রেন রাখতে বাধ্য করে ইউনিয়নে সড়ক রক্ষায় এক নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যা টেকসই উন্নয়নের মডেল স্বরূপ। এতে একদিকে যেমন ঘেরের পানিতে রাস্তা নষ্ট হচ্ছে না, তেমনি বর্ষা মৌসুমের পানি নিষ্কাশনও সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতার কবল থেকে রক্ষা পাওয়ায় কৃষি আবাদের আওতায় এসেছে অনেক অনাবাদি জমি।
তবে সাতক্ষীরার ৭৮টি ইউনিয়নের মধ্যে শুধু মৌতলা ইউনিয়নে এ উদ্ভাবনী প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও আউট ড্রেন না করে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের কারণে ঘের অধ্যুষিত এ জেলায় নষ্ট হচ্ছে এলজিইডির হাজার হাজার কোটি টাকার সড়ক। এমতাবস্থায় গ্রামীণ সড়ক রক্ষায় মৌতলা ইউনিয়ন হতে পারে মডেল।
সরেজমিন দেখা গেছে, মৌতলা ইউনিয়নের পরমানন্দকাটি-পানিয়া সড়ক, নরহরকাটি-দুদলী সড়ক, পূর্ব মৌতলার কাটাখালি-চাতরা সড়কসহ ঘের সংলগ্ন সব সড়কের পাশে ৩-৪ ফুট চওড়া করে আউট ড্রেন খনন করা হয়েছে। খনন কাজ চলছে কালিকাপুর-পানিয়া খানপাড়া সড়কেও। এতে সড়কে ঘেরের পানি লাগছে না। ফলে ঘেরের কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। একই সঙ্গে প্রশস্ত আউট ড্রেন খননের ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা থাকবে না, কৃষি চাষাবাদের আওতাও বাড়বে বলে আশা করছে এলাকাবাসী।
মৌতলা ইউনিয়নের পানিয়া গ্রামের সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ঘেরে সারা বছর মৎস্য চাষ করা হয়। আউট ড্রেন না করে ঘের মালিকরা সড়ককেই বাঁধ হিসেবে ব্যবহার করে। ঘেরে প্রতিনিয়ত পানি ওঠানামা করায় সড়কের মাটিতে ধস দেখা দেয়। কিন্তু সড়ক সংলগ্ন ঘেরে আউট ড্রেন থাকলে পানিতে নষ্ট হয় না। একই সঙ্গে ঘের অধ্যুষিত এলাকায় পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না রেখেই ব্যবসায়ীরা বড় বড় বাঁধ দিয়ে ঘের করে। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। অনেক কৃষি জমি আমন মৌসুমে ডুবে থাকে। কিন্তু আউট ড্রেন থাকলে সব সমস্যা দূর হয়ে যায়। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে আউট ড্রেন খনন করা হয়েছে।
কালিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মৌতলা ইউপির চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী বলেন, টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে ও মৌতলার সড়কগুলোর স্থায়িত্ব রক্ষায় ‘রাস্তা হবে না ঘেরের বাঁধ’ সেøাগানকে নামনে রেখে উদ্ভাবনী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ঘের মালিকদের যারা অনুরোধ রাখেনি তাদের ঘেরের পাশে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগেই আউট ড্রেন খনন করা হয়েছে। এতে ইতিমধ্যে এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন হয়েছে। বেড়েছে কৃষি জমিও।
সাতক্ষীরা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৬০ হাজারেরও বেশি ঘের রয়েছে। চিংড়ি চাষের নীতিমালায় সরকারি রাস্তার পাশে আউট ড্রেন নির্মাণ করে নিজের জমিতে বাঁধ দিয়ে ঘের করার কথা বলা রয়েছে। কিন্তু জেলায় এ নীতিমালা মানছে না কেউ। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি কার্পেটিং সড়ক, ইটের সোলিং ও কাঁচা রাস্তা ঘেরের পানির ঢেউয়ে ভাঙছে। রাস্তার ইট খুলে পড়ছে মৎস্য ঘেরে। রাস্তার ধার ভেঙে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য অফিসার শাহিদুল ইসলাম সরদার জানান, প্রত্যেক উপজেলায় ঘেরের লাইসেন্স দেয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্ব একটি কমিটি থাকে। ওই কমিটি লাইসেন্স দেয়ার সময় ঘের মালিকদের বেশ কিছু শর্ত দেয়। তার মধ্যে অন্যতম হলো রাস্তার পাশের ঘেরে আউট ড্রেন কাটতে হবে। পরবর্তীতে ফলোআপ হিসেবে ঘের মালিকদের নোটিশ করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা শোনে না।