টিভির মানহীন অনুষ্ঠান ও বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন কড়চা

অনেকেই বলছেন, যে কোনো বিনোদন অনুষ্ঠান নষ্ট করছে মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন। একটি টিভি অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন বিরতি যখন শুরু হয় তখন সেটির শেষ কখন হবে তা কেউ বলতে পারে না। অনেক চ্যানেলে দেখছি তারা বলছে, এক মিনিটের বা দুই মিনিটের বিজ্ঞাপন বিরতি। সে প্রতিশ্রুতিও তারা রক্ষা করতে পারে না। এক মিনিট বা দুই মিনিটের বিজ্ঞাপন বিরতি নিয়ে একটা লেখার কথা মনে হলো। বছর পনেরো আগের কথা ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছিলাম বাসে। ড্রাইভারের পেছনে হাতের বাম দিকের সিটে বসেছি। সামনে বসার কারণে আমাদের বাসের আগে কোন কোন বাস যাচ্ছে তা দেখা যায়। বিশেষ করে সামনের গাড়ির পেছন দিকটা বেশ পরিষ্কারভাবেই দেখা যায়। পেছনের কাচের লেখাগুলো বেশ পরিষ্কারভাবেই দৃশ্যমান। একটার পর একটা বাস যাচ্ছে। কাজ নেই বাসের লেখাগুলো পড়া ছাড়া। কোনোটার পেছনে লেখা বাসের নাম, কোনোটায় রুটের নাম। কোনোটায় ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট। বেশ মজা লাগে। এ রকম অনেক বাস পার হতে হতে একটি বাসের পেছনের কাচে চোখ আটকে গেল-সেখানে দেখি একটি অভিনব লেখা ‘আল্লার কসম গেট লক।’ অবাক হয়েছিলাম হাসিও পেয়েছিল। গেটলকের নামে বাস ব্যবসায় যে নিয়মভঙ্গ এবং বিরক্তিকর বিড়ম্বনা সেটির চূড়ান্ত প্রকাশই ছিল ‘আল্লার কসম গেট লক।’ দু’ একটি চ্যানেল এ রকম বিড়ম্বনা থেকে রেহাই দিতে এক-দুই মিনিটের বিজ্ঞাপন বিরতির কথা দর্শকদের আগাম জানিয়ে দেন। কিন্তু রক্ষা করতে পারেন না।

একটা অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রচারে অবশ্যই ব্যয় আছে, সে ব্যয় মেটাতে বিজ্ঞাপনের বিকল্প নেই সেটা দর্শকরা কিন্তু জানে। তারা জেনেই অনুষ্ঠান দেখার জন্য সেটের সামনে বসে। কিন্তু বিজ্ঞাপন বিরতির মাত্রা এতই বিরক্তিকর যে অনুষ্ঠানটি মূল, না বিজ্ঞাপন মূল সেটিই নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যারা দুই এক মিনিটের বিজ্ঞাপন বিরতির কথা বলেও রক্ষা করে না তখন মনে হয় আগামী অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমরা নারায়ণগঞ্জের সেই গেটলক বাসের মতোই দেখতে পাব ‘আল্লাহর কসম দুই মিনিটের বিজ্ঞাপন বিরতি।’ আসলে বিশ্বাস যখন ভেঙে যায় তখন সেটিকে ধর্মের নামেও প্রবোধ দেয়া যায় না। ধর্মের নামেও মানুষ আস্থায় নিতে চায় না। মানুষ মনে করে এসবই প্রতারণা। এবারের ঈদের অনুষ্ঠানমালায় চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপনের মাত্রা দেখে মনে হয়েছে আসলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নজর দেয়ার আবশ্যকতা আছে। একটি ত্রিশ মিনিটের অনুষ্ঠানে কয় মিনিটের বিজ্ঞাপন থাকবে বা কতটা বিজ্ঞাপন থাকবে তার নীতিমালা হওয়া জরুরি। গত ঈদের অনুষ্ঠানে হানিফ সংকেতের ইত্যাদি এ বিষয়ে একটি ব্যঙ্গত্মক প্রচারণা করেছিল। সে কারণে হানিফ সংকেতকে সাধুবাদ জানাই। শুধু বিনোদন অনুষ্ঠানেই নয়, সংবাদ পরিবেশনকালেও ইদানীং মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন বিরতি দেখা যায়। বিষয়গুলো অবশ্য অবশ্যই দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মহলের রয়েছে।

আমাদের দেশে জুয়ার অভিযোগে যাত্রা উঠে গেছে বহুদিন হলো অথচ যাত্রা ছিল বাঙালির জাগরণের এক মহা অস্ত্র। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, নীল দর্পণ প্রভৃতি যাত্রাপালা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানবিরোধী সংগ্রামে প্রধান অনুঘটকের কাজ করেছিল। একটি নাটক বা যাত্রাপালা মানুষের মাঝে অপশাসনের বিরুদ্ধে সেন্টিমেন্টকে আর্টিকুলেট করতে পারত। সেই যাত্রাকে আমরা অচল করেছি পরিপত্রের অজুহাতে। জুয়া আইনে নিষিদ্ধ, অশ্লীলতাও আইনে নিষিদ্ধ যাত্রা বা নাটক কিন্তু নয়। কিন্তু জুয়া খেলা হয় বা হবে এই অজুহাতে যাত্রা বা নাটক বন্ধ হলেও অনেক উদহারণ আছে যেখানে যাত্রা নেই সেখানে জুয়া আছে। আমাদের কাজের গতি প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে যাত্রাই আজ অপসংস্কৃতি, জুয়া নয়।

যা হোক জনগণ যাত্রা দেখতে না পেলেও প্রযুক্তির সুবাদে প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিভি দেখার সুযোগ পেয়েছে। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চল ও শহরের প্রতি ৪টি দোকানের ৩টিতে টিভি দেখতে পাওয়া যায়। টিভি ছাড়া দোকান কল্পনাই করা যায় না। বিশেষত চায়ের দোকান টিভি ছাড়া কল্পনার অতীত। দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী টিভির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মানুষের বিনোদনের বিকল্প হিসেবেই নয় বরং অনেকেটা মৌলিক চাহিদা রূপে টিভি প্রতিভাত হচ্ছে। মিডিয়া দেশের জনগণের মনোজগতের সাংস্কৃতিক কাঠামোর শক্ত অংশ। আগে বিভিটির বিরুদ্ধে সংবাদ পরিবেশন নিয়ে অভিযোগ থাকলেও নাটক এবং অনুষ্ঠানের মান ছিল সন্তোষজনক। এর উপস্থাপক, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, আনিসুল হক, ফতেহ লোহানী, অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল, অধ্যাপক মোস্তফা মনোয়ার, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, হানিফ সংকেত যারা দেশে আইকন হিসেবে বিবেচিত। আমরা আমাদের শৈশবে অপেক্ষা করতাম এ সপ্তাহের নাটকের জন্য। সপ্তাহের শেষ রোববার বা শেষ বৃহস্পতিবার এ সপ্তাহের নাটক হিসেবে একটি নাটক পরিবেশিত হতো। শঙ্খনীল কারাগার, নন্দিত নরকে, বাবার কলম কোথায়, বাবর আলী প্রভৃতি নাটক যার মধ্যে অন্যতম। এ সপ্তাহের নাটক ছাড়াও প্রতিমাসে এ মাসের নাটক নামেও নাটক পরিবেশিত হতো। যেগুলো আমাদের চাহিদাই শুধু পূরণ করত না বরং ভারতীয় বাংলাভাষীদের কাছেও ব্যাপক সমাদৃত ছিল। এর মান প্রশংসিত ছিল। আজকে অসংখ্য চ্যানেল, অসংখ্য নির্মাতা, অসংখ্য শিল্পী দেখি কিন্তু মন ভরে না। সে সময় আঞ্চলিক ভাষায় নাটক ছিল না তা নয়, তবে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার সীমিত ছিল।

আজকে চ্যানেলগুলোর নাটক বা অনুষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই আঞ্চলিক ভাষায় এতে মূল ভাষা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এই বিষয়টিও বিবেচনার দাবি রাখে। আঞ্চলিক ভাষার বিরুদ্ধে আমি নই। সৈয়দ শামসুল হক আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্য রচনা করে ইতিহাসে অমর হয়েছেন। তার ভাষা প্রয়োগের রীতির কারণে মানুষ রংপুর অঞ্চলের ভাষাকে বুঝতে পারতেন। একটি নাটক দেশের সব অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণ না করলেও নেতিবাচক ছিল না। আজকের অনুষ্ঠানগুলোর উপস্থাপনা বিরক্তির হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

আমরা সবাই ভারতীয় চ্যানেলগুলোর বিরোধিতা করি। সেগুলো বন্ধ করার জন্য সমালোচনাতে একশ্রেণীর মানুষ বেশ সোচ্চার। এটিকে অনেকেই ভারতীয় আগ্রাসন হিসেবেও দেখছি। কিন্তু আমার প্রশ্ন, আমাদের অনুষ্ঠানের মান ও বিষয়বস্তু যদি উন্নত ও জীবন ঘনিষ্ঠ হয় তবে মানুষ আমাদের চ্যানেলগুলোতেই আটকে থাকবে। আমরা কেন পারছি না বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে। উত্তম কুমার সুচিত্রা সেনের কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বাংলা চলচ্চিত্র পরিত্যাগ করেননি। তারা কিন্তু অভিনয় গুণে রাজ্জাক-কবরীকে অনুসরণ করেছেন। তারা রহমান-শবনমে আগ্রহী ছিলেন। আজকে সেসব কেন নেই? আমাদের মানে ও গুণে ফিরতে হবে নতুবা শুধু ভারতকে দোষ দিলেই চলবে না। বিকল্প তৈরি করতে হবে। চ্যানেল থাকলেই হবে না। তার বিষয়বস্তু নিধার্রণও কিন্তু জরুরি। যা গেলাবেন জনগণ তাই গিলবে সেটি বাসি। জনগণকে বোকা বানানো এত সহজ নয়। গত ঈদে যে অনুষ্ঠানমালা হয়েছে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করলে তাই মনে হয়।

গত ৪ সেপ্টেম্বর এটিএনের মালিক ডক্টর মাহফুজুর রহমানের একক সংগীতানুষ্ঠান দেখে তার নেতিবাচক দিক নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড়। অনুষ্ঠানটি আমি প্রথমে দেখি নাই পরে সমালোচনার ঝড় দেখে এবং আমার একদা রাজনৈতিক সহকর্মী রাকসুর সাবেক ‘প্রমোদ সম্পাদক’ শিশুসাহিত্যিক দীপু মাহমুদের সমালোচনা শুনে গান শোনার আগ্রহ হয়। গানগুলো শুনে মনে হয়েছে এই অনুষ্ঠানটির মান নিয়ে যদি মাহফুজুর রহমানের কোনো বন্ধু তাকে একটু বুঝিয়ে দিতেন তাহলে আমি নিশ্চিত তিনি এ অনুষ্ঠানটি প্রচার করতেন না। নিশ্চয়ই তিনি কমনসেন্সের বাইরে নন। মানহীন অনুষ্ঠান, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও দেশের মর্যাদাকে নষ্ট করে। যে অনুষ্ঠান মর্যাদাকে নষ্ট করে তা করার দরকার কী? শুধু তেলবাজির কারণে এগুলো হয়। যারা ভুল বুঝিয়ে এগুলো প্রচার করেছেন তারাও কম দায়ী নন।

একটি অনুষ্ঠান মানহীন হলেও দর্শককে সময় নষ্ট করে দেখতে হয়। এতে বিনোদন না হলেও বিরক্তি সৃজন হয়। সময় নষ্ট হয় অথচ সময় মূল্যবান। এ প্রসঙ্গে প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকের দৃষ্টিভঙ্গিকে উদ্ধৃত করছি। এক পহেলা বৈশাখে তাকে বলেছিলাম, একজন বরেণ্য লেখকের গল্প নাটকের ভক্ত ছিলাম এখন কেন জানি তার লেখায় আগের মতো কাহিনী ফুটে ওঠে না। তিনি বললেন, আমরা লেখকরাও জনগণের মূল্যবান সময় চুরি করছি। তিনি উদাহরণ হিসেবে বললেন, ধরো আমি সৈয়দ হক এই মুহূর্তে আমার অনেক পাঠক। পাঠকরা আমার আগের নাটক, গল্প, কবিতা দেখে এখন যদি একরাতে কাটপিস করা একটি গল্প পড়ে তাতে সেই পাঠক অবশ্যই কিছুই পাবে না, হতাশ হবে। আমি কিন্তু প্রকাশকদের চাহিদা পূরণ করতে একরাতে উপন্যাস লিখছি তা প্রচুর বাজারও হয়তো পাচ্ছে। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। না সেখানে আছে বিনোদন না আছে শিক্ষণীয় কিছু। এই যে সময় গেল পাঠকের, পাঠক এ কারণে একজন লেখকের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের দাবি করতে পারেন। মানুষের জীবনে সময় কম। সেই কম সময় যখন চুরি হয়ে যায় বা কেউ কেউ নষ্ট করে তখন তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন হওয়া উচিত। সেদিন মনে হয়েছিল তিনি হয়তো জিলাসি করছেন। কিন্তু আজকে আমার সে ভুলের অবসান হয়েছে। সেদিন বুঝিনি এখন এই অনুষ্ঠানগুলোর মান দেখে বুঝেছি আসলেই আমাদের সময় চুরি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠিতরা আমাদের যা ইচ্ছে তাই ভাবছেন। তারা মনে করছে আমরা মানসিকভাবেও দরিদ্র তাই তারা যা খাওয়াবেন আমরা তাই খাব। আসলে এই মনোপলি ভাঙতে হবে। এ মনোপলি ভাঙতে না পারলে আমাদের সংস্কৃতিকে মাকাল ফলে রূপান্তর করা হবে। দেখতে সুন্দর ভেতরে পচা। এর বদল দরকার। সংস্কৃতির বিপণন নয়, সংস্কৃতি হোক আমাদের জীবন ধারণের সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।
লেখক: আইনজীবী, সাবেক রাকসু নেতা ও সিনেটর রিভারাইন পিপল বাংলাদেশ

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.