টিকে থাকার যুদ্ধই নারীর আত্মরক্ষা

নারী হয়ে জন্ম, অপরাধ কি এটাই? তাহলে কেন দরকার আত্মরক্ষা কৌশল? কারণ দিনে দিনে বাড়ছে নারীর বিচিত্র রকম হেনস্তার ঘটনা। সঙ্গে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। আইন থাকলে আইনের ফাঁক থাকে আর আইনের এই ফাঁক দিয়ে অপরাধী পার পেয়ে যায়। তাই তো জানা দরকার নারীর আত্মরক্ষা কৌশল। এটা কি তাহলে মার্শাল আর্ট? না। মার্শাল আর্ট না শিখেও নারী নিজেকে নিরাপদে রাখতে পারে-

আত্মরক্ষার জন্য ব্রুস লি হওয়ার দরকার নেই। কমনসেন্স আর গাট ফিলিং অনেকটাই সাহায্য করবে অনেকাংশে। সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে নারীদের। দেখা যায়, মেয়েরা লজ্জায়, ভয়ে কুঁকড়ে থাকে বলেই এর সুযোগ নিচ্ছে যৌন সন্ত্রাসীরা। তাই প্রতিরোধের ব্যাপারে মেয়েদের আরো কঠিন হতে হবে। এছাড়া সমাজে এ ধরনের অপরাধীদের দাগি অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে, এলাকায় এলাকায় কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে। কয়েকজন বখাটে ও তাদের সহযোগীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে তা ফলাও করে প্রচার করা, বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে সোচ্চার হয়ে যৌন হয়রানিকারীদের নানাভাবে লজ্জা দিতে হবে। সমাজে মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে মানুষের প্রতি, মেয়েদের প্রতি, মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যৌন হয়রানি নির্মূলে ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুশাসন মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। পরিবার থেকেই সন্তানদের নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দিতে হবে।

নারীর আত্মরক্ষা নিয়ে কথা বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. নেহাল করিম। তিনি বলেন, ‘প্রথম কথা হলো নারীদের সাহসী হতে হবে। কোন পরিস্থিতি ইতিবাচকভাবে ঘায়েল করতে হবে। আর যেটা আমাদের সমাজের বড় প্রয়োজন তাহলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সচেতনতা বৃদ্ধি। এখানে রাজনৈতিক প্রভাবও জড়িয়ে যায় কোনো কোনো সময়। রাজনৈতিক কুপ্রভাব কমাতে হবে। যারা এসব কুকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। মূল্যবোধ বাড়লে মানুষ মানবিকভাবে জাগ্রত হবে। তাছাড়া নারীর আত্মনির্ভরশীলতাও আত্মরক্ষার বড় কবচ। বাইরের জগৎ সম্পর্কে তারা আগেই অভ্যস্ত থাকে তাই কোনো ধরনের বড় বিপদের আগে তারা আঁচ করতে পারে। তাই নারীদের স্বাবলম্বী হওয়াটা খুব জরুরি।’

প্রতিষেধক না করে প্রতিরোধ তৈরি করা আরো উত্তম। বখাটেদের প্রমাণ সাপেক্ষে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সমাজে তাদের একঘরে করে রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটা কুইক ডায়াল নম্বরও অনেক কাজে দেবে। রাজনৈতিক দল বিবেচনায় আসামিদের ছাড় দেয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। যৌন শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ মাথায় রাখবেন এই যৌন সন্ত্রাস সংঘটিত হতে কোনো অস্ত্র লাগে না। মাথায় যদি যৌন সন্ত্রাস কাজ করে তাহলে আইন করে তাকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?

আশপাশের পরিবেশ ও লোকজনের ব্যাপারে সব সময় সজাগ ও পূর্ণ মনোযোগী থাকতে হবে। বাসার সামনের গলিতে যে নতুন মুচিটা এসেছে সে আপনার নজর এড়িয়ে গেছে অথবা বাসার সামনের চায়ের দোকানে নতুন একজন লোককে সবসময় বসে থাকতে বা আড্ডা দিতে দেখা যায়, তাকে আপনি খেয়াল করেননি। টিশার্ট আর সানগ্লাস পরা সাধারণ চেহারার যুবক আপনার পেছনে হেঁটে আসছে, আপনাকে অতিক্রম করে আপনার গন্তব্যের দিকেই যাচ্ছে আর আপনি খেয়াল করেননি। এ রকম যেন কখনো কোনোভাবে না হয়। আত্মরক্ষার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সবসময় সচেতন ও সতর্ক থাকা। ব্যস্ত সড়কের এমন অংশ দিয়ে পার হন যেদিকে লোকজন খুব একটা পার হয় না। খেয়াল করুন কেউ পেছনে আসছে কিনা। গণপরিবহনে উঠে আবার নেমে পড়–ন। এ রকম কয়েকবার করুন। আপনার অনুসরণকারীকেও আপনার মতো আচরণ করতে হবে। অনুসরণকারীর শুধু কাপড় নয়, মুখ ও জুতা মনে রাখার চেষ্টা করুন। কাপড় সহজেই বদলে ফেলা যায়, কিন্তু অনুসরণ করার সময় জুতা বদলানো কঠিন।

খুব বেশি উত্তেজিত না হয়ে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। অনুসরণকারীরা আপনার আচরণের প্যাটার্ন বোঝার চেষ্টা করে। তাদের কোনোকিছুতে নিশ্চিত হতে দেবেন না। অনুসরণ করা হচ্ছে বুঝতে পারলে পান-বিড়ির দোকান বা মোবাইল রিচার্জের দোকান এ ধরনের জায়গায় থামুন। সোজা অনুসরণকারীর চোখের দিকে তাকান। এতে সে ধরা পড়ার শঙ্কায় চোখ সরিয়ে নেবে। যদি বুঝতে পারেন যে অনুসরণ করা হচ্ছে তবে প্রথমে অনেক লোক আছে এমন কোনো জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করুন। কোন রেস্টুরেন্টে গিয়ে চা দিতে বলুন। ওই অবস্থায় বাসা থেকে দূরে থাকলে সরাসরি বাসায় যাবেন না। ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধুকে ফোন করুন। অনুসরণকারী ছোটানোর জন্য স্বাভাবিকভাবে হেঁটে আসুন, তারপর দৌড়ে মোড় পার করে দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। এ সময় মোবাইলে কথা বলার ভান করে কোনো বিল্ডিং বা ব্যক্তিগত জায়গায় সাময়িকভাবে অবস্থান করতে পারেন। কখনোই অফিস বা বাইরের অন্য কোনো জায়গা থেকে সরাসরি বাসায় যাবেন না। আপনাকে যদি টার্গেট করা হয় তবে এর মধ্যেই তারা আপনার আচরণের প্যাটার্ন জানে। আপনার কোনো কাছের বন্ধুকে অনুসরণকারীদের ওপর নজর রাখতে বলতে পারেন, কিন্তু খুব সতর্কতার সঙ্গে আর পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে। কৌশলগুলোকে চাপ হিসেবে না নিয়ে চ্যালেঞ্জ ভাবতে হবে। কারণ টিকে থাকার যুদ্ধই এখানে প্রধান।