টার্মিনাল-স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের অপেক্ষা

দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের উৎসব পরিবারের সঙ্গে উদযাপন করতে কয়েক দিন ধরেই সড়ক, রেল ও নদীপথে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। ঈদ যাত্রায় আগের বছরগুলোর চেয়ে দুর্ভোগ এখন পর্যন্ত কিছুটা কম। তবে সবচেয়ে বেশি যাত্রীর চাপ থাকায় পথে পথে মানুষের ভোগান্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস টার্মিনাল, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছানো পর্যন্ত যানজট ভোগাচ্ছে যাত্রীদের। যানজট পেরিয়ে লঞ্চে উঠলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে তাদের। নিয়ম অনুযায়ী যাত্রী পূর্ণ হলেই লঞ্চগুলোর রওনা হওয়ার কথা। কিন্তু সেই নিয়ম কেউ মানছে না। এমন পরিস্থিতিতে পড়ে ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি তীব্র হচ্ছে ঘরমুখো হাজারো মানুষের।

অনেকেই ঈদযাত্রায় বাসকে বেছে নিয়েছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষের শেষ ভরসা লোকাল সার্ভিস। কিন্তু ঈদের আগে লোকাল সার্ভিসের ভাড়া নৈরাজ্য চরমে। গাবতলীতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আদায় করলেও নীরব ভূমিকায় প্রশাসন।

বুধবার থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ ট্রেন সেবা। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভিন্ন রুটে নিয়মিত ট্রেন ছাড়াও ৯ জোড়া বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। আগেভাগে নানা প্রস্তুতি নেয়া, আন্তঃনগর ট্রেনের সাপ্তাহিক বিরতি বাতিলসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পরও ট্রেনের সময়সূচি ভেঙে পড়েছে।

জানা যায়, বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রী তোলার কারণে রাজধানী থেকে ছেড়ে যাওয়া ৬৩টি ট্রেনই ছিল যাত্রীতে ঠাসা। আর যাত্রী তুলতে গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সময় থামতে হওয়ায় ট্রেনগুলোর বেশিরভাগই গন্তব্যে পৌঁছে দেরিতে। ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্তই ২১টি ট্রেন কমলাপুর থেকে ছেড়ে যায়। কমলাপুর থেকে বেশিরভাগ ট্রেনেরই ছেড়ে যেতে দেরি হয়। সেইসঙ্গে বিভিন্ন ট্রেনে পর্যাপ্ত আসন, বগি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় তীব্র গরম ও ভিড়ে যাত্রীদের খুব ভোগান্তি পোহাতে হয়।

বৃহস্পতিবার রাজশাহী, জামালপুর, দেওয়ানগঞ্জ, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, লালমনিরহাট ও খুলনার উদ্দেশে কমলাপুর ছেড়ে যাওয়া ঈদের বিশেষ ট্রেনে ছিল প্রচণ্ড ভিড়। দেওয়ানগঞ্জগামী বিশেষ ট্রেন সকাল পৌনে ৯টায় ছাড়ার কথা ছিল। তা ছেড়ে যায় প্রায় এক ঘণ্টা পর। ছাদের যাত্রীরা তখন রোদ মাথায় নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। জানালায় পা রেখে ট্রেনের ছাদে উঠতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন মামুন মিয়া নামে এক যাত্রী। অন্যরা সহযোগিতা করায় তিনি কোনো রকমে ছাদে ওঠেন, তবে ছাদেও ছিল ভিড়।

খুলনার উদ্দেশে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি কমলাপুর ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল সকাল ৬টা ২০ মিনিট। সেটি ছেড়ে যায় সকাল ৭টা ১৭ মিনিটে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি রংপুরের উদ্দেশে ছাড়ার সময় ছিল সকাল ৯টা। ৩০ মিনিট দেরিতে ছাড়ে ট্রেনটি। কমলাপুর থেকে লালমনিরহাটের উদ্দেশে লালমনি বিশেষ ট্রেনে যুক্ত করা হয়েছে মেরামত করা বগি ও ইঞ্জিন। এটি কমলাপুর ছেড়ে যায় ২ ঘণ্টা দেরিতে। এ ট্রেনে বাড়ি যেতে আগের রাত থেকেই যাত্রীরা কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেল স্টেশনে প্রস্তুতি নিয়ে বসেছিল।

রাজধানীর কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেল স্টেশনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ট্রেন ধরার জন্য আসা যাত্রীদের ভিড় ছিল উপচেপড়া। সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে ৪ জুন সকালে আগাম টিকিট পেয়েছিলেন এসব যাত্রী। তাদেরই একজন সজিব ভোর ৬টার আগেই সুন্দরবন ট্রেনে উঠার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন কমলাপুর রেল স্টেশনে। ভিড় ঠেলে উঠেন ঠিকই, কিন্তু ট্রেন ছাড়ে দেরিতে। সকালে আধাঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী তিতাস কমিউটার, জামালপুরের তারাকান্দিগামী অগ্নিবীণা ট্রেনটি। আগাম টিকিট নেয়া যাত্রীর পাশাপাশি টিকিটবিহীন যাত্রীর ভিড়ও ছিল কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেল স্টেশনে।

ট্রেনের সময়সূচি কেন ভেঙে পড়ল, জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৩০টি ট্রেন ছেড়ে গেছে। তার মধ্যে লালমনি এক্সপ্রেসসহ ২টি ট্রেনের একটু দেরি হয়েছে। কমলাপুর স্টেশন ছাড়ার পর বিভিন্ন স্টেশনে যাতে যাত্রাবিরতি বেশি না হয় সেজন্য আমরা তদারকি বাড়িয়েছি। বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রেন যাত্রী নিয়ে আসার পর ট্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে দ্রুত, তার পরই ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন লাইনে ট্রাফিক থাকায় একটু সমস্যা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এ ছাড়া বিলম্বে ছেড়েছে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস, ধূমকেতু এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস, লালমনি ঈদ স্পেশাল। ঈদযাত্রার সার্বিক বিষয় নিয়ে কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, আজ সারাদিনে কমলাপুর থেকে ৬৯টি ট্রেন ছেড়ে যাবে। দু’একটি ট্রেন বিলম্বিত হতে পারে। তিনি বলেন, অগ্রিম টিকিট বিক্রির দিনই আমরা ধারণা করতে পারছিলাম বৃহস্পতিবার উপচেপড়া ভিড় হবে। এর মধ্যেই চেষ্টা করছি সিডিউল ঠিক রাখতে। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে যাওয়া-আসার সময় স্টেশনে উঠা-নামা করতে যেখানে ২ মিনিট অপেক্ষা করার কথা সেখান ৫-১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই কারণে ট্রেন পৌঁছাতেও কিছুটা দেরি হচ্ছে।

অন্যদিকে সদরঘাট টার্মিনালে পৌঁছাতে গুলিস্তান থেকে যানজটে পড়তে হয়েছে ঘরমুখো যাত্রীদের। বিশেষ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের প্রবেশমুখ পর্যন্ত রিকশা, সিএনজিসহ নানা বাহনের জট লেগে আছে। ফুটপাতেও হাঁটার জো নেই। একদিকে যানজট, মানবজট অন্যদিকে ফুটপাতে অবৈধ অস্থায়ী দোকান দুইয়ে মিলে ঘাট পর্যন্ত যাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। টার্মিনালে পৌঁছে যাত্রীরা পড়ে অপেক্ষার পালায়। লঞ্চে উঠে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে যাত্রীভর্তি হলেই লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশনা থাকলেও মানছিল না বেশিরভাগ লঞ্চ। নির্ধারিত সময়ে ছাড়ার দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী তোলার অভিযোগ উঠে তাদের বিরুদ্ধে।

দুপুর ২টায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-বেতুয়া-চরফ্যাশনগামী এমভি ফারুক-৬ দাঁড়ানো। লঞ্চটির ছাদ ও প্রতিটি তলাই যাত্রীতে পরিপূর্ণ। জানা যায়, ৭শ’জনের ধারণ ক্ষমতার এই লঞ্চ বুধবার রাতে এসে ভেড়ে সদরঘাট। রাত থেকেই যাত্রীরা উঠতে থাকে লঞ্চে। রাত পেরিয়ে সকাল হতে না হতেই লঞ্চটি যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু তার পরও এটি ছাড়া হচ্ছিল না। লঞ্চটি না ছাড়ায় দুপুর ২টার দিকে কিছু যাত্রী লঞ্চের ভেতরে ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় নৌপুলিশ এসে লঞ্চটি ছাড়তে বাধ্য করে।

একই সময় ঢাকা-আয়শাবাদগামী এমভি কর্ণফুলী-১২ লঞ্চটিও ৭ নম্বর পন্টুনে দাঁড়িয়ে ছিল। এই লঞ্চটিও যাত্রী বোঝাই হওয়া সত্ত্বেও ছাড়া হচ্ছিল না। যাত্রীরা বার বার বলছিল, ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ উঠে বসে আছে, তাও কেন ছাড়ছে না? ১১ নম্বর পন্টুনে ভোলাগামী গ্লোরী অব শ্রীনগর-৭, ১০ নম্বর পন্টুনে ঢাকা-পাতারহাটগামী এমভি ইয়াদ-৩, ৮ নম্বর পন্টুনে বন্ধন-৫ যাত্রী পরিপূর্ণ করে দাঁড়িয়ে ছিল। যাত্রীরা লঞ্চগুলোকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি মাথায় নিচ্ছিল না। বিষয়টি নিয়ে কথা বললে নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. আলমগীর কবীর বলেন, লঞ্চে যাত্রী হয়ে গেলে ছেড়ে যাওয়ার জন্য মালিকদের বলা আছে। তার পরও না গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এলে ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

এদিকে বৃষ্টির কারণে দেশের মহাসড়কগুলোর কোথাও কোথাও যানবাহন চলাচলে ধীরগতি থাকলেও কোনো যানজট নেই বলে দাবি করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মহাখালী আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের একথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, আমি সকালেও খোঁজ নিয়েছি মহাসড়কে কোনো যানজট নেই। প্রতিবার টাঙ্গাইলে যে সমস্যা হয় এবার সেরকম কোনো সমস্যা নেই। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজট নেই, ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কও ফ্রি। আমি ওইপথে এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাব। এবার যাত্রীরা ভালোভাবে ঘরে ফিরছে। রাস্তার জন্য কোথাও কোনো যানজট নেই। তবে ভারি বর্ষণের কারণে এবং সকালে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপারে একটি গাড়ি বিকল হওয়ায় কোথাও কোথাও গাড়ি ধীরগতিতে চলে কিন্তু যানচলাচল বন্ধ নেই। আশা করছি এবারের ঈদে সবাই হ্যাসেল ফ্রি (ঝামেলা মুক্তভাবে) যাত্রা করতে পারবেন।

তিনি আরো বলেন, আজ (বৃহস্পতিবার) বিকেলে গার্মেন্টস ছুটি হবে, যাত্রীদের অনেক চাপ থাকবে। সড়কে যানবাহন বেশি থাকবে। তবে আমার বিশ্বাস ভারি বর্ষণ না হলে গাড়ি আটকে থাকবে না। ঘরে ফেরা যাত্রীদের জন্য এবার পর্যাপ্ত সংখ্যক গাড়ি রয়েছে। তবে যদি গাড়ি শর্ট হয়, তাহলে বিআরটিসির বাস প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে সহযোগিতা করবে।

রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ঈদ এলে বাস টার্মিনালে অপেক্ষারত নগরবাসীর সংখ্যা ৩-৪ গুণ বেড়ে যায়। গতকাল ওই বাস টার্মিনালে দেখা যায় নগরবাসীদের উপচেপড়া ভিড়। টার্মিনালের আনাচে-কানাচে দাঁড়িয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন হাজার হাজার বাড়িমুখো মানুষ।

যাত্রী বিশ্রামাগারে বসা যাত্রী সজলের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ঈগল পরিবহনে করে ঝালকাঠিতে যাবেন। র্দীঘদিন পর বাড়ি যাচ্ছেন তিনি। বাড়ির যাওয়ার খুশিতে বাসায় আর থাকতে না পেরে একটু আগেই টার্মিনালে চলে এসেছেন। নিলুফা ঢাকাতে বিসিএস কোচিং করেন। জেআর পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। যাবেন মেহেরপুর জেলায়। তিনি বলেন, পড়াশোনার চাপে অনেকদিন বাড়ি যেতে পারিনি। ঈদ করতে যাচ্ছি। এটা ভেবে খুব ভালো লাগছে। বাড়ি যাব পরিবারের সঙ্গে ঈদ করব এর চেয়ে আনন্দ আর কি হতে পারে। বাড়ি যাওয়ার জন্য গাবতলীতে আসা।

এদিকে যাত্রীদের নির্দিষ্ট গাড়িতে পৌঁছে দিতে যেন হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবহন কাউন্টার মাস্টারদের। শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার রাজিব বলেন, বছরের অন্য সময়ে চাপ না থাকলেও ঈদের আগ মুহূর্তে যাত্রীদের চাপ বেড়ে যায়। এখন যাত্রীদের উপস্থিতি বেশি থাকায় তাদের ডাকাডাকিও বেশি করা লাগে। এ সময় আমাদের একটু বেশি সচেতন হতে হয়। না হলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়বে।

মানবকণ্ঠ/বিএ

Leave a Reply

Your email address will not be published.