টনক তুমি নড়বে কবে?

টনক তুমি নড়বে কবে?

শিরোনামটি নেয়া হয়েছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান আন্দোলনের একটি স্লোগান থেকে। মঙ্গলবার রাজধানীর প্রগতি সরণির জেব্রা ক্রসিংয়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী বাসচাপায় মারা যাওয়ার পর আন্দোলনে নামেন অন্য শিক্ষার্থীরা। সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন তারা। এতে বিইউপি ছাড়াও নর্থসাউথ, ইনডিপেনডেন্ট, ইস্ট ওয়েস্ট ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। এ সময় তারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে চালকের ফাঁসিসহ ৮ দফা দাবি জানান। স্লোগান দেন ‘টনক তুমি নড়বে কবে’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘অ্যাকশন অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ইত্যাদি স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা প্রগতি সরণি এলাকা। বুধবারও আন্দোলন চলছে। একাত্মতা প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে গেল বছর আন্দোলন করেছিল কিশোর শিক্ষার্থীরা। সেসময় তারা দেশের ট্রাফিক পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেও বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে— চাইলেই রাস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। শৃঙ্খলা ধরে রাখা সম্ভব কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। কারোই টনক নড়েনি। সেই আন্দোলনেরই এক সক্রিয় শিক্ষার্থীকে জীবন দিতে হলো সেই সড়কেই। নিরাপদ জেব্রাক্রসিং দিয়ে পার হওয়ার সময়ই পিষে দিল বেপরোয়া এক গাড়ি। মুহূর্তেই নিথর হয়ে গেল চঞ্চল মেধাবী তরুণটি। থেমে গেল একটি স্বপ্নযাত্রা। প্রতিটি সন্তান নিয়েই বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে সীমাহীন। সন্তানের মৃত্যুও ক্ষতি পোষানো যায় না কোনোভাবেই। আদালতের নির্ধারণ করে দেয়া টাকার অংক তো নয়ই। কিন্তু কিছু ক্ষতির প্রভাব পড়ে গোটা জাতির ওপর। যা কোনোভাবেই পূরণীয় নয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেছিলেন, ‘যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণীজনের জন্ম হয় না।’ বর্তমান প্রেক্ষিতে এই মহাবাক্যের সঙ্গে একটু যুক্ত করে বলতে হয়— ‘ভুল করে গুণীজন জন্মালেও তাকে মেরে ফেলা হয়।’ আমাদের দেশে মৃত্যুর অনেক পথ খোলা। কারখানার আগুন, হাসপাতালের ভুল চিকিত্সা, কর্মের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানোর সময় ট্রলারডুবি, ভবন ধস, নৌকাডুবি, জাহাজডুবি, দুর্বৃত্তের হামলার সঙ্গে নিত্যদিনের সড়ক দুর্ঘটনা তো আছেই। গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রতিদিন অসংখ্য মৃত্যুর সংবাদ আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়। অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু যখন চোখের সামনে একটি সম্ভাবনার মৃত্যু দেখতে হয়; সেটা কীভাবে মেনে নেয়া সম্ভব।

দুই বাসের প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারানো আবরার কখনো কোনো কিছুতেই দ্বিতীয় হননি। এমনই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিক। প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়েছে, ‘ছাত্র হিসেবে আবরার আহমেদ চৌধুরী যেমন মেধাবী ছিলেন, ব্যক্তি জীবনে ছিলেন চঞ্চলও। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এ পড়তেন তিনি। ক্যাম্পাসে বিতর্ক প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে খেলাধুলা— দ্বিতীয় হতেন না কোনো কিছুতেই। সামাজিক নানা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন, ছিলেন নিরাপদ সড়কের আন্দোলনেও।’ একবার ভাবুন তো! এমন একটি মেধাবী, চঞ্চল ছেলেকে হারানো শোক কি শুধু আবরারের মা-বাবার? নাকি পুরো জাতির? আবরারের এ মৃত্যু কি শুধুই অনাকাঙ্ক্ষিত? নাকি একটি গোষ্ঠীর জন্য কাঙ্ক্ষিত? গত আন্দোলনের পর নানা সময়ে দেখেছি, শিক্ষার্থীদের কেমন শত্রুপক্ষ হিসেবে ধরে নেয় মোটর শ্রমিকরা। সরকার নির্ধারিত শিক্ষার্থীদের থেকে হাফ ভাড়া নেয়া থেকে শুরু করে বাসে তোলা, সিটে বসা নিয়ে বাস শ্রমিকদের খারাপ আচরণের শেষ নেই। এই আন্দোলনে আরো একটি ট্রল প্ল্যাকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওতে লেখা, ‘ওস্তাদ জোরে চালান, সামনে শিক্ষার্থী।’ অর্থাৎ শিক্ষার্থী দেখলে একটু বেশিই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বাসচালকরা। হয়তো এরই ফলে আবরারকে জীবন দিতে হলো। নতুবা নিরাপদ জেব্রাক্রসিংয়ে থাকা সত্ত্বেও কেন বাস বেপরোয়া হয়ে উঠবে? জাতি এ ক্ষতি কী দিয়ে পোষাবে? আসলে জাতি বুঝতেই পারবে না কখনো। বুঝলে তো আর হারাত না। জাতি বুঝুক আর না বুঝুক। আবরার ঠিকই বুঝেছিলেন, এই সড়ক তার জন্য নিরাপদ নয়। বুঝেছিলেন বলেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। সুর মিলিয়ে ছিলেন সাংবাদিক নির্মল সেনের সঙ্গে। চার দশক আগে নির্মল সেন দাবি জানিয়েছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’ নির্মল সেনের মৃত্যু হয়েছে ফুসফুসজনিত সমস্যায় চিকিত্সাধীন অবস্থায়। জানি না এটাকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে কিনা! কিন্তু অস্বাভাবিক মৃত্যু যে আমাদের পিছু ছাড়েনি; এটা স্পষ্টতই বলা যায়। প্রতিদিনই তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন বাসচালকরা। প্রতিবছরই অসংখ্য আবরারকে হারিয়েই চলেছি আমরা। একটি পরিসংখ্যানের সূত্র ধরে একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা সংবাদ প্রকাশ করেছে। ওতে দেখা যায়, গত বছর সারাদেশে সাড়ে সাত হাজার নিহত ও প্রায় ১৬ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালক বা মালিকের উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এছাড়া নতুন আইনে সরাসরি কঠোর শাস্তির বিধান না থাকায় ড্রাইভারসহ সংশ্লিষ্টরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। তারা মনে করেন, অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলে বেপরোয়া গাড়ি চালানো অনেকাংশে বন্ধ হবে। আর সবাই সচেতন হলে আশিভাগ দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসানের বরাত দিয়ে সংবাদটিতে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় অভিযুক্তদের শাস্তির নজির নেই। অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হলে বেপরোয়া গাড়ি চালানো অনেকাংশে বন্ধ হবে। এতে সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে। এ ছাড়া হাঁটাচলার সুবিধা না দিলে সড়ক দুর্ঘটনার কোনো সমাধান হবে না। মানুষ হাঁটতে চায়, কিন্তু হাঁটতে পারছে না। ফুটপাত যদি হাঁটার জন্য ফ্রি করা না যায়, তাহলে বাধ্য হয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। আর তখন নিরাপত্তার প্রশ্নই অবান্তর। সড়ক পরিবহন আইনে সাজার বিধান নিয়ে অস্পষ্টতার কথাও সংবাদটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনের ১০৫ ধারায় বলা আছে, এই আইনে যা-ই থাকুক না কেন, মোটরযান চালাতে গিয়ে কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে এ-সংক্রান্ত অপরাধ দণ্ডবিধির-১৮৬০-এর বিধান অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে দণ্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারাতে যা-ই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলা করে মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে ওই চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে ১১৪ ধারায় বলা আছে, এই আইনের অধীনে অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদি ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হত্যার উদ্দেশ্যে প্রমাণিত হলে তা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ধারার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ অস্বচ্ছতার মধ্যেও আমরা স্বপ্ন দেখি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার। একদিন হয়তো টনক নড়বে কর্তাব্যক্তিদের। টনক নড়বে রাষ্ট্রযন্ত্রের। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নিশ্চিত হবে। কিন্তু আবরারকে ফিরে পাব না। আবরারের মেধাবী আত্মা আর আসবে না।
লেখক: কথাশিল্পী ও সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এসএস