ঝড় আর দমকা হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড বইমেলা

বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক প্রাণের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় হানা দিল ঝড় আর দমকা হাওয়া। ফাগুনের প্রথম এ ঝড় আর দমকা হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে মেলাপ্রাঙ্গণ। ভিজে গেছে অধিকাংশ স্টলই। এতে বই ভেজার পাশাপাশি স্টলও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকাশকরা।

ঝড়ো বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বইমেলার শিশু চত্বর। বাংলা একাডেমির ভেতরে বহেরা তলায় লিটল ম্যাগ চত্বরেও বেশকিছু স্টল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকাশকরা এ ক্ষতির জন্য বাংলা একাডেমির অবকাঠামো ব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন। তবে বৃষ্টির পর গতকাল রোববার সারাদিনই ছিল মেঘলা আকাশ সঙ্গে বয়ে চলে বসন্তের হিমেল হাওয়া। কিন্তু প্রকৃতির এই বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে কোনো পাত্তাই দেননি বইপ্রেমীরা। নির্ধারিত সময়ই ছুটে এসেছেন মেলায়। মেলাও শুরু হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে।

সরেজমিন অমর একুশে গ্রন্থমেলা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিকাল ৩টায় মেলার ভেতরে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়া হলেও তখনো বই শুকাতে ও গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা গেছে প্রকাশনাগুলোকে। অন্তত ২৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি প্রকাশনারই এক থেকে দেড় লাখ টাকার বই নষ্ট হয়েছে। কেউ কেউ ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দিয়ে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিকে চিঠিও পাঠিয়েছেন।

বিকাল সাড়ে তিনটার দিকেও বই রোদে শুকাতে দেখা গেছে- অন্য প্রকাশ, বাংলা প্রকাশ, বাংলার প্রকাশ, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, বাবুই প্রকাশনী, গদ্য-পদ্য, নালন্দা, অ্যাডর্ন, নাগরী, জনপ্রিয় প্রকাশনী, নব সাহিত্য প্রকাশনী, শিকড়, জাগৃতি প্রকাশনী, অন্য রকম প্রকাশনী, বলাকা, সাহিত্য বিকাশ, ইউপিএল, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রসহ অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মেলার শিশু চত্বর। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এ চত্বরে শিশুদের কোলাহল ছিল না বললেই চলে। সিসিমপুরের স্টেজে উঠে কোনো শিশুকে খেলতে দেখা যায়নি। চারদিকে ছিল পানি আর কাদা। স্টলগুলোর বিক্রয়কর্মীরা গতকাল বই বিক্রির চেয়ে বই রক্ষায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্টলগুলোর ওপর টিনের ছাউনি থাকলেও কোথাও কোথাও তা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরে গিয়েছে। যার কারণে পাশ থেকে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ওপর থেকে ছাউনি ফাটল ধরে পানি পড়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি ছিল। এ ছাড়া দমকা ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে কোথাও কোথাও স্টলের কাঠামো নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে বাংলা একাডেমি অংশের স্টলগুলোতে ছিল একই চিত্র। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি চত্বরে প্রচুর পরিমাণ পানি জমায় সেচ দিলেও এখনো কাঁদার ভোগান্তি পোহাতে হয় দর্শনার্থীদের। তবে মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমির দাবি এবারের ঝড়-বৃষ্টিতে বইমেলায় ক্ষয়ক্ষতি অন্যবারের তুলনায় কম হয়েছে। গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমির মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে বইমেলা বিষয়ক সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে বাংলা একাডেমির পরিচালক ও গ্রন্থমেলা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, ‘এবার বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই প্রকাশকদের সতর্ক করে দিয়েছে বলে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে।’

জানতে চাইলে অন্য প্রকাশের প্রকাশক সিরাজুল কবির চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের স্টলটি মেলার একদম শেষ প্রান্তে উš§ুক্ত জায়গায়। এজন্য দমকা বাতাসের কারণে বৃষ্টির পানি আমাদের স্টলে বেশি ঢুকেছে, ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে বেশি। আমাদের বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে স্টলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেড় থেকে দুই হাজার বই নষ্ট হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ৭-৮ লাখ টাকার মতো ক্ষতির শিকার হয়েছি। আমরা বাংলা একাডেমিকে বিষয়টি জানিয়েছি।’

বাবুই প্রকাশনীর প্রকাশক মোর্শেদ আলম হৃদয় বলেন, ‘বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল ১৯-২০ তারিখের দিকে বৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ায় কিছুই গোছাতে পারিনি। প্রায় ৪০ হাজার টাকার বই নষ্ট হয়ে গেছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘স্টলের ওপর টিন এবং ত্রিপাল থাকলেও এগুলোর মধ্যে ফাঁকা ছিল। ফাঁক দিয়ে পানি ঢুকে এত ক্ষতি হয়েছে।’ তিনি তার এ ক্ষতির জন্য বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকেই দায়ী করেছেন।

উৎস প্রকাশনের প্রকাশক মোস্তফা সেলিম জানান, তার প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া স্টল অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো যাচ্ছে না। এর জন্য তিনি বাংলা একাডেমির স্টলের অবকাঠামোকেই দায়ী করেন।

পিয়াল প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের সৈয়দা নাজমুন নাহার বলেন, ‘বইয়ের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্টলের সৌন্দর্য। বৃষ্টির কারণে পাঠকের সমাবেশ কম থাকায় বিক্রিবাট্টাও কম।’

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘ঝড়ো বাতাসে মেলার কয়েকটি স্টলের ছাদ উড়ে গেছে। কোনো কোনোটিতে টিনের ফাঁক গলে পানি পড়ে সয়লাব হয়েছে। ঝড়ো বাতাসে পর্দা উড়ে পানি ঢুকেছে স্টলে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মেলার শিশু চত্বর। বিকাল পর্যন্তও সেখানে পানি জমে আছে।’

নতুন বই: গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ৭১টি। এর মধ্যে গল্প ৭টি, উপন্যাস ৭টি, প্রবন্ধ ৮টি, কবিতা ৩১টি, ছড়া ২টি, শিশুসাহিত্য ১টি, জীবনী ৩টি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ৩টি, ভ্রমণ ২টি, স্বাস্থ্য ১টি, রম্য ১টি, ধর্মীয় ১ট, সায়েন্স ফিকশন ১টি এবং অন্যান্য ৩টি। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে বিজয় প্রকাশ থেকে সালমান হাবীবের কাব্যগ্রন্থ ‘আলোঝরা স্বপ্নের দিন’, নন্দিতা প্রকাশ থেকে মোহাম্মদ সাদের আলীর উপন্যাস ‘জীবনের স্মৃতিময় দিনগুলো’, গ্রাফোসম্যান থেকে নাজমুল হক ইমনের ‘বিশুদ্ধ হাসি’, তৃপ্তি প্রকাশ কুঠি থেকে মো. আবু জাফর লালের ‘প্রাচীর’, পিয়াল প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স থেকে হোসনে আরা’র ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী ওসি বলছি’, ঐতিহ্য থেকে আনোয়রুল হকের গল্পগ্রন্থ ‘ফুলকন্যা’ ও দেওয়াল সালাউদ্দীন বাবু’র স্মৃতিচারণ মূলক গ্রন্থ ‘জেলখানার ভেতর বাহির’, আগামী থেকে আব্দুর রউফ চৌধুরী’র মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ: ১৯৭১’। এ ছাড়া মেলায় মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে ২৮টি বইয়ের।

প্রকাশকদের জন্য সতর্কতা: বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ গতকাল মেলার সব প্রকাশনাকে সতর্ক করেছে এই বলে যে, আগামী ২৩, ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি আবারো রাজধানীতে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য প্রকাশনা কর্তৃপক্ষকে স্ব স্ব স্টলের বইয়ের নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ।

বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, আবহাওয়া অধিদফতরের সঙ্গে তারা এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং সেখান থেকে পাওয়া তথ্য প্রতিদিনই মাইকিং করে প্রকাশকদের জানিয়ে দেয়া হচ্ছে।

১৬ দিনে বাংলা একাডেমির বিক্রি কোটি টাকা: এবারের মেলার প্রথম ১৬ দিনে বাংলা একাডেমির পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র থেকে বিক্রয় হয়েছে ৯৭ লাখ ৭৬ হাজার ১০৮ টাকার। যা গত বছরের প্রথম ১৬ দিনের চেয়ে ৩০ লাখ টাকা বেশি। গতবার সব মিলিয়ে বাংলা একাডেমি দেড় কোটি টাকার বই বিক্রি করলেও এবার তা আড়াই কোটিতে পৌঁছাবে বলে একাডেমি কর্তৃপক্ষের আশা।

শিশু-কিশোর চিত্র প্রদর্শনী: অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রতিবছর শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এ বছর প্রথমবারের মতো ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিগুলো নিয়ে বাংলা একাডেমির ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবনের দ্বিতীয়তলায় একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টায় প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত প্রতিদিন মেলা চলার সময়।

মানবকণ্ঠ/এএম