জয়ের ধারায় থাকতে চায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি চায় পুনরুদ্ধার

বাগেরহাট জেলার উত্তরের জনপদ ফকিরহাট-মোল্লাহাট-চিতলমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-১ সংসদীয় আসন। স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে অধিকাংশ জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনেই এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। আসনটি পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিতে। বিগত সময়ে মুসলিম লীগ, জাতীয় পার্টি বা বিএনপি এই এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে বার বার।

স্থানীয়রা বলছেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আসনটি বিরোধীদের জন্য দুর্ভেদ্য হয়ে থাকবে। সপ্তম থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত টানা চারটি মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাত ভাই শেখ হেলাল উদ্দিন এই আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি নির্বাচিত হন। এলাকার সাধারণ মানুষ এই আসনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদেরই দেখতে চান সব সময়, এমনটা মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। তবে জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিএনপি এই আসনটি আওয়ামী লীগের দখলমুক্ত করতে মরিয়া। স্থানীয় বিএনপি নেতারা মনে করেন, আগামী নির্বাচনের ভালো পরিবেশ থাকলে আসনটি তাদের দখলে আসবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যায় স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাট-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এমএ খায়ের নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এসএম লায়েকুজ্জামান বিএনপির সৈয়দ মোজাহিদুর রহমানের কাছে পরাজিত হন। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের এমএ খায়ের দ্বিতীয় বার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. মোজাম্মেল হোসেন এই আসনে থেকে এমপি নির্বাচিত হন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিনা ভোটে বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান কয়েক মাসের জন্য এমপি নির্বাচিত হন। পরে একই বছরের ১২ জুন সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। পরেব শেখ হাসিনা আসনটি ছেড়ে দিলে তার চাচাত ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন উপনির্বাচনে এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে বাগেরহাটের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হেলাল উদ্দীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।

বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোটে মূল বিভাজন এনে দেয় চিতলমারী উপজেলার সংখ্যালঘু ভোট। তাই স্থানীয়রা চিতলমারী উপজেলাকে বলে থাকেন ‘আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক।’ এই আসনের বিগত সংসদ নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফকিরহাট ও মোল্লাহাট উপজেলায় এই দুই দলের ভোটের ব্যবধান তেমন বেশি থাকে না। ফলে বরাবরই জয়ের নিয়ামক হয়ে ওঠেন চিতলমারীর ভোটাররা। আর এখানকার সিংহভাগ ভোটই যায় আওয়ামী লীগের বাক্সে। তাই বিরোধীদের এবারের বিশেষ মনোযোগ যে চিতলমারী উপজেলার ভোটারদের দিকেই থাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

২০০৬ সালে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারণে সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রলম্বিত হয়। অবশেষে ওই সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাগেরহাট-১ আসন থেকে ইতিপূর্বে দুই বার নির্বাচিত এমপি শেখ হেলাল উদ্দীন মামলাসহ নানা জটিলতায় দেশের বাইরে থাকায় তিনি এই নির্বাচনে অংশ নেননি। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা আবারো এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। পরে শেখ হাসিনা আসনটি ছেড়ে দিলে শেখ হেলাল উদ্দিন দেশে ফিরে উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আলোচিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হেলাল উদ্দীন এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
বাগেরহাট-১ আসনে এমপি হিসেবে শেখ হেলাল উদ্দিন দলে ও দলের বাইরে এখন এক প্রকার অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার মেয়াদকালে এলাকার অভূতপূর্ব অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে ভোটারদের এই আস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে সাধারণ মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

এলাকার সার্বিক উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে শুধু বাগেরহাট-১ আসনই না, বাগেরহাট জেলা জুড়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে শেখ হেলাল উদ্দিন এখন ক্ষমতার কেন্দ্রে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ এখনো এই আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি। তবে আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রকৃতি ও বিরোধী পক্ষের শক্তি সামর্থ্য বিচারে আওয়ামী লীগ কৌশলগত কারণে এই আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তাই আগামী নির্বাচনে শেখ হেলাল উদ্দিন দলের নির্দেশে পার্শ্ববর্তী বাগেরহাট-২ (সদর-কচুয়া) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ২০০১ এর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি বাগেরহাট-১ এবং বাগেরহাট-২ আসন থেকে সরাসরি আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

এদিকে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকখ্যাত বাগেরহাট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন তা নিয়ে ভোটারদের মাঝে কৌতূহল রয়েছে। বিগত দিনে বিএনপির প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান একাধিকবার এই আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন। একপর্যায়ে ২০০৮ সালে বিএনপি তাদের প্রার্থী পরিবর্তন করে জেলা বিএনপির অন্যতম সহ-সভাপতি অ্যাড. শেখ ওয়াহিদুজ্জামান দিপুকে প্রার্থী করলে তিনিও পরাজিত হন। তবে তিনি এবারো এই আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রচেষ্টা শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। এরই অংশ হিসেবে এলাকায় যোগাযোগ বাড়িয়েছেন এই বিএনপি নেতা।
জেলা বিএনপির সহসভাপতি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রানা, কেন্দ্রীয় জাসাস নেতা মঞ্জুর মোর্শেদ স্বপন এবং মোল্লাহাটের সন্তান, রাজধানীর ধানমণ্ডি থানা বিএনপির সভাপতি শেখ রবিউল ইসলামের নাম শোনা যাচ্ছে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে। এমনকি একাধিকবার পরাজিত জেলা বিএনপির উপদেষ্টা শেখ মুজিবুর রহমানের নামও শোনা যাচ্ছে প্রত্যাশী তালিকায়। বড় দুই দলের বাইরে জাতীয় পার্টি অথবা ইসলামি আন্দোলনের কোনো প্রার্থীর নাম তেমন শোনা না গেলেও গণফোরামের অ্যাডভোকেট এস এম এ সবুরের নামও শোনা যাচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ