জয়ী প্রমীলা ক্রিকেট, মলিন রাজনীতি ও অন্ধ সমাজ

আমাদের ক্রিকেট মানে পুরুষদের ক্রিকেট যখন ব্যর্থ, যখন তারা নবাগত আফগানিস্তানের কাছেও ধরাশায়ী তখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেন প্রমীলা ক্রিকেটারেরা। তারা আমাদের এনে দিয়েছেন অপার ঈদ আনন্দ। ভারতের মতো শক্তিশালী ছয় ছয়বার শিরোপাজয়ী দলকে হারিয়ে এশিয়া কাপ এনে দিয়েছেন তারা। এখন সবাই জানেন কতটা অবহেলিত আর কতটা আন্ডার পেইড ছিলেন এই তারকারা। এটাই আমাদের স্বভাব। যারা আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেন বা যাদের ভেতর অমিত সম্ভাবনা তাদের এমন রাখাটাই রীতি। ভাবছিলাম তাদের নিয়েই লিখব। খেলাটার শেষ তিন ওভার দেখেছি আমি।

সেটাই ছিল উত্তেজনার আসল জায়গা। ঠিক সময় ঠিকমতো খেলতে না পারা পুরুষেরা এখান থেকে পাঠ নেবেন কি না জানি না। তবে নিলে ভালো করবেন। জানিনা এখন থেকে প্রমীলা ক্রিকেট কতটা মনোযোগ পাবে। একটাই অনুরোধ তাদের- প্রলোভন আর জোশের নামে যেন পথভ্রষ্ট করা না হয়। জেতার পর মিডিয়ার যে প্রচার আর উৎসাহ সেটা আমরা জয়ের আগে দেখিনি। না করাটাই ছিল মঙ্গলের। যে কারণে আমাদের মেয়েরা স্বাভাবিক খেলা খেলেই আজ বিজয়িনী। বাংলাদেশের কপালে রাজটীকা পরিয়ে দেয়া নারীশক্তিকে কতভাবেই না অপমান করি আমরা।

না আছে মনোযোগ, না কোনো সম্মান। উল্টো তাদের বেলায় কেবল বাধা আর বাধা। সেই বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে তারা এনে দিয়েছে অপার আনন্দের এক বিজয়। শুধু হৈ চৈ করে এই বিজয়ের ধারা বজায় রাখা যাবে না। যারা এই সম্মানে গর্বিত তাদের মনে রাখতে হবে সামনে আছে কিছু দায় কিছু দায়িত্ব। বাংলাদেশের রাজনীতি নারীনির্ভর হওয়ার পরও আমাদের সমাজে নারীরা কোণঠাসা। একদিকে তাদের জয়ে আনন্দ আরেক দিকে তাদের গৃহবন্দি করে রাখার চক্রান্ত। নানাভাবে অপমানিত মেয়েরা যে আসলে কত বড় শক্তি প্রমীলা ক্রিকেট তার প্রমাণ।

এরপর যদি রাজনীতি ও সমাজের হুঁশ না ফেরে তারচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের কিছু নাই। কি এক অদ্ভুত সমাজ! এতকিছুর পরও সবকিছু ঘিরে আছে দলবাজি আর দলীয় রাজনীতি। আমরা আমাদের মেয়েদের লাল সালাম ও কুর্নিশ জানাই। মনে করিয়ে দেই রাজনীতির বাইরের জগতকে দেখুন। শুনুন তারা কি বলছে। তাদের কথা না শুনলে দেশ সমাজ বাস্তবতা কিছুই বেগ পাবে না। যে কারণে রাজনীতিকেও সাবধান করতে চাই। সরকারি দল গদি ও ভোগের আনন্দে বিভোর। তারা কিছু শুনবে না। আর বিরোধী দল বাস্তবে নাই। যারা থাকার কথা তারা মানুষকে ভুল বুঝে বোমা আগুন আর হতাশায় নিমজ্জিত। তাদের জন্য কিছু কথা।

বারবার আন্দোলনের কথা বললেও বাস্তবে আন্দোলন দূরে থাক, জনমনে কোনো সাড়াই ফেলতে পারছে না তারা। বিএনপি নিজেকে সাইলেন্ট মেজরিটির দল মনে করলেও তাদের কোনো আহ্বানে কাজ হচ্ছে না। আমরা সবাই জানি বেগম জিয়া এদেশের কয়েকদফার প্রধানমন্ত্রী। একজন প্রধানমন্ত্রীর সাজা ও তার হাজতবাস যতটা আবেগের বা কষ্টের হওয়ার কথা ততটা কেন হলো না? আজ মিডিয়ায় দেখলাম তিনি নাকি মনে করতে পারছেন না অনেক কিছু। এমনও দেখলাম মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। যাকে বলা হচ্ছে মাইল্ডস্ট্রোক। খালেদা জিয়া এবং তার দলের রাজনীতি আমাকে কখনো টানেনি। এমনকি আওয়ামী লীগের ওপর নানা কারণে মহাবিরক্তির পরও শুধু মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস আর সাম্প্রদায়িকতার কারণে তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার কোনো কারণ ছিল না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্র্রদায়িকতা এখন তার রূপ পাল্টেছে। আগে যা ছিল প্রকাশ্য ভারতবিরোধিতা এখন তা হয়েছে ভারতপ্রেম। বিএনপি ভাবছে আগের মতো মানুষকে সে পুরনো ট্যাবলেটে কাবু করা যাবে। সেটা যে হবার নয় তা এখন টের পাচ্ছেন তারা। আলোচনায় যাবার আগে বলি, ভারতবিরোধিতা একটুও কমেনি। বরং নানা যৌক্তিক অযৌক্তিক কারণে বেড়েছে। কিন্তু তার ধরন গেছে পাল্টে। এখন বিরোধিতা মানে অন্তরে বা আচরণে তা থাকলেও বাইরে আর কেউ তা প্রকাশ করতে চায় না। এই না চাওয়ার বাস্তব কারণ নানা কারণে ভারতনির্ভরতা। বাজার করতে হলে কলকাতা, অসুখ হলে চেন্নাই বা ব্যাঙ্গালুরু, সিনেমা দরকার হলে মুম্বাই বা বিনোদন দরকার পড়লে গোয়া। এ তো সাধারণ মানুষের বেলায়। রাজনীতি যে ভারত বিষয়ে কতটা আগ্রাসী আর একপেশে তার ধরন বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না।

কংগ্রেস বা বাম ভারতের কোনো অবশিষ্ট কিছু নাই আজ। গদিতে আছেন বিজেপি নেতা মোদি। মনে যাই থাক ওপরে কিন্তু মোদিই জয় করে নিয়েছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মনোজগত। যখনই দেখি মনে হয় তার ক্যারিশমা আর ভাষণের কাছে পরাজিত হতে পারাটাই আমাদের আনন্দ। কি আশ্চর্য! এ লেখা যখন লিখছি তখন ভারত সফরে আছেন বিএনপির তিন সদস্যের দল। উদ্দেশ্য ভারতকে রাজি করিয়ে সঠিক নির্বাচন ও ফলাফল নিশ্চিত করা। তাহলে বোঝেন চাবিকাঠি কোথায়। আর তাদের নেতা বেগম জিয়া কি না প্রণব বাবুর সঙ্গে দেখা করেননি। এর শাস্তি তো পেতেই হবে না কি? বলছিলাম মানুষের জাগরণ বা উপলব্ধির কথা। আমার সবসময় মনে হয়েছে আসলে দেশ ও ইতিহাসের অভিশাপ বড় নির্মম। সেটা যদি কেউ বুঝতে না পারে তো তাদের কপালে দুর্ভোগ থাকবেই। খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে এটা মানতেই হবে। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশ- এ তিন সত্যের সঙ্গে শয়তানি বা মীরজাফরি করে কিছুদিন হয়তো রাজত্ব করা যায় চিরকাল গদিতে থাকা যায় না। এমনকি নীরব মেজরিটি থাকলেও না।

আন্দোলন না হওয়ার আরো কারণ আছে। মানুষ মাঠে নামবে না। কারো জন্যে না। কারণ মানুষ এখন গ্লোবাল সিটিজেন। তার কাছে খোলা দুনিয়া হাতের মুঠোয়। রাস্তায় নেমে সময় নষ্ট বা জান দেয়ার ইচ্ছে নাই কারো। আর নির্বাচন? গণতন্ত্র? ওগুলো আসলে থিওরি। বাস্তবে গদি যার দেশ তার। যেসব কারণে তারা আজ বিপাকে সেগুলো ঠিক না করলে বা মার্জনা চেয়ে শুদ্ধ রাজনীতিতে না ফিরলে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আওয়ামী লীগের শক্তি এখনো তার তৃণমূল। ইতিহাস ও সুশীল সমাজ। সে জায়গাটা বরাবর এড়িয়ে যাওয়া আর অপমান করা জাতীয়তাবাদী শক্তির ভরসা যেখানে সেখানে সরকার বদল বা আন্দোলনের শক্তি নাই। দেশে একটা শুদ্ধ ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিকল্প শক্তির দরকার। এখন মনে হচ্ছে ছায়া বিএনপি সেটাও নষ্ট করে দিচ্ছে। খালেদা জিয়া মুক্ত হলেও কি পারবেন এ দেশ চালাতে? এ সত্য না বুঝে আবেগ আর আতিশয্যের রাজনীতি তাদের কোথায় নিয়ে যাবে সেটাই দেখার বিষয় বৈকি।

একদিকে সমাজ এগোচ্ছে আরেকদিকে জয়ের হাতছানি। এর ভেতরে দেখছি দুঃসংবাদ। মুক্তমনা শাহজাহান বাচ্চু ভাই নিহত হয়েছেন। যতদূর জানি বেচারা বই নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সরাসরি রাজনীতি করা থেকে বিরত কবিতাপ্রেমী তাকে এভাবে মারার কারণ জানি না। এটা বুঝি এরা আমাদের ছাড়বে না। আর তাই যদি হতে থাকে একদিন ক্রিকেট রাজনীতি সব রসাতলে গিয়ে এই দেশ ও সমাজ হবে অন্ধকারবাসী। তখন এই ডিজিটালে কী হবে আমাদের? কী হবে উন্নয়নে? লেখক : সিডনী প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এএএম