জেনারেল বাজওয়ার জয়োল্লাস নেই

এম আবদুল হাফিজ :
পাকিস্তানে জেনারেল পারভেজ মুশারফের ভাগ্য বিড়ম্বনার জের ধরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সামরিক দৃশ্যপটে সেখানকার সেনাপ্রধানদের আগমন অন্তর্ধান অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে। জেনারেল আশফাক কাইয়ানি পর্যন্ত তারা আলোচনায় থাকলেও এখন জেনারেলরা পাকিস্তানের কালেভদ্রে আলোচনার বিষয়বস্তু। অবশ্য ইতোমধ্যেই জেনারেলরা যেমন সংযত হয়েছেন, তেমনি রাজনীতির কুশীলবরা হয়েছেন আগের চাইতে সেয়ানা। তারা অকারণে জেনারেলদের ঘাঁটাতে চায় না। Live and Let Live-এর এই আবহে জেনারেল রাহিল শরিফের মতো ডেকোরেটেড জেনারেল মেয়াদ শেষ করে অবসরেও চলে গেছেন, মঞ্চে এসেছেন জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া যিনি গত বছরের ২৯ নভেম্বরে সেনাপ্রধান হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আগের মতো সেনাপ্রধান নিয়ে হৈ-হুল্লোড় না থাকলেও পাকিস্তানের মতো দেশের শীর্ষ জেনারেলদের নিয়ে কৌতূহল নিঃশেষ হয়নি তা তিনি বৈধ না অবৈধ যেভাবেই তার পদে আসেন না কেন।
পাকিস্তানের জেনারেলরা বরাবরই জাঁকজমক প্রিয়, জয়োল্লাসবাদী এবং স্বপদে তার ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন যার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি আইয়ুব খাঁ থেকে জিয়াউল হক পর্যন্ত। এমনকি জেনারেল রাহিল শরিফ বেসামরিক কর্তৃত্ব মেনে চললেও ইনস্টিউশন রূপে মিলিট্রির শ্রেষ্ঠত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের ধারণায় জেনারেল বাজওয়াকেও তার পূর্বসূরির প্রদর্শিত পথেই চলতে হবে। অন্তত পাকিস্তান আর্মির জুনিয়র ও মধ্যম লেভেলের সৈনিক ও কর্মকর্তারা সেটাই চান।
পাকিস্তান আর্মি বিশ্বের শীর্ষ সেনা সংগঠনগুলোর অন্যতম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আর্মিতে দেশটির ভূমিকা এবং স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে পাকিস্তানের পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর সঙ্গে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দহরম মহরম পাকিস্তান মিলিট্রিকে ঈর্ষণীয় আন্তর্জাতিকতা দিয়েছে। তাছাড়াও পাকিস্তান তো একটি পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত দেশ। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতির অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের শিকার-বিশেষ করে কাশ্মীর নিয়ে চির বৈরী ভারতের সঙ্গে দ্বন্দ্ব পাকিস্তানিদের মধ্যে তাদের আর্মি সম্বন্ধে অনেক প্রত্যাশার জন্ম দেয় এবং যে কোনো ক্রান্তিকালে পাকিস্তানিরা আর্মিকেই এত রূপে দেখে।
সে কারণেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আর্মিকে পাকিস্তানে অনেক কিছুই করতে হয় যা তা তার দায়িত্বের আওতায় আসে না। সেজন্য দেশটিতে জেনারেলদের একাধিক শর্ত পূরণ করতে হয় যা পাকিস্তানের মতো জাতিগোষ্ঠীগতভাবে বিভক্ত দেশে সহজসাধ্য নয়। তবে সেনাপ্রধান মনোনয়নে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের জন্য সবচাইতে জটিল বিবেচ্য বিষয় দেশটির বৈদেশিক নীতি। বিষয়টি সম্প্রতি জটিলতর হয়েছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান দূরত্বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেইজিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতায়। যদিও ওয়াশিংটন এখন ভারতীয় মার্কেটে প্রলুব্ধ এবং ভারতের অস্ত্রের জোগানদাতাও রাশিয়াই রয়ে গিয়েছে।
বর্তমান পাক সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া এক সময়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বলে পরিচিত ছিলেন, যে সম্প্রদায়কে ১৯৭৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার অমুসলিম ঘোষণা করেছে। তা সত্ত্বেও নওয়াজ শরিফ যার পরিবার কট্টর ইসলামিস্টদের অন্যতম-জেনারেল বাজওয়াকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেছেন। পাকিস্তানের ইসলামিক রিপাবলিকে সেনাপ্রধান হিসেবে আর্মির আনুগত্য পেতে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে জেনারেল বাজওয়াকে।
নতুন সেনাপ্রধানের জন্য এই মুহূর্তের সমস্যা কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণ রেখার সংরক্ষণ। CPECতেও ভারতের চাপ ক্রমশই বাড়ছে, যার সুরক্ষাও জেনারেল বাজওয়ার ওপরেই বর্তেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজওয়ার গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মহাপরিচালকও বাজওয়ার মতো এক সংখ্যা লঘিষ্ঠ Sect-এর সদস্য। বিপুলভাবে সুন্নি অধ্যুষিত পাকিস্তানে যেখানে উগ্রবাদী চরমপন্থি জিহাদিরা ইতোমধ্যেই তাদের জিহাদী কার্যক্রমে লিপ্ত। সুতরাং জেনারেল বাজওয়াকে অত্যন্ত কৌশলী হতে হবে। স্মর্তব্য যে, তার পূর্বসূরিরা বাজওয়ার চাইতেও অধিক ডেকোরেটেড হওয়া সত্ত্বেও হার মেনেছেন। উল্লেখ্য যে, জেনারেল রাহিল শরিফ সর্বোচ্চ বীরত্বের খেতাব নিশানে হায়দার দু’ দুবার পেয়েও ম্রিয়মাণ ছিলেন।
বরাবরের মতো পাকিস্তানের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত। এখানে জেনারেল বাজওয়া সম্ভবত নওয়াজ শরিফের সঠিক মনোনয়ন। কিন্তু পাকিস্তানের স্পর্শকাতর ভূরাজনীতি নতুন সেনাপ্রধানের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের অনুকূলে নয়। তাই তাকেও হয়তো তার পূর্বসূরিদের মতো তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অসমাপ্ত রেখেই বিদায় নিতে হবে।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এসএস