জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাবে নাভিশ্বাস

গত বছর হাওরাঞ্চলের ফসলহানি, বন্যা ও উদ্ভূত রোহিঙ্গা সমস্যার কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় এক মানবিক সংকটকাল অতিবাহিত করছে। ইতোমধ্যে যার প্রভাব পড়ছে আমাদের দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা-এই পাঁচটিকে গোটা বিশ্বে মানুষের অত্যাবশ্যকীয় মৌলিক চাহিদা হিসেবে গণ্য করা হয়। কোনো মানুষের জীবনে যদি এগুলোর একটি উপাদানের ঘাটতি থাকে তাহলেই তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কিন্তু শুধু নিত্যপণ্যই নয়, মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রতিটা স্তরের সেবাই আজ উচ্চমূল্যের দূষণে দূষিত। এদেশের গরিব মানুষগুলোর তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে উঠছে নাভিশ্বাস আর মধ্যবিত্ত খাচ্ছে হিমশিম! এখন প্রশ্ন হচ্ছে-এ সমস্যা কি সমাধানযোগ্য নয়? হ্যাঁ, অবশ্যই এ সমস্যা সমাধানযোগ্য। বলা হয়ে থাকে, সমস্যা যখন সৃষ্টি হয়, তখন তার সমাধানের পথও থাকে। তাকে শুধু খুঁজে বের করে নিতে হয়। মানুষের প্রধান পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে যেটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় তা হচ্ছে-খাদ্য। তাই সর্বাগ্রে এই খাদ্য সংকট ও খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ অতীব জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারকে সবচেয়ে বেশি আন্তরিক হতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেহেতু আমাদের উৎপাদনযোগ্য ভূমি বৃদ্ধি পাচ্ছে না বরং হ্রাস পাচ্ছে। সেহেতু সরকারকে অবশ্যই উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এ জন্য কৃষি বিভাগকে আরো উন্নত ও শক্তিশালী করতে হবে। কৃষকদের হাতে উচ্চফলনশীল জাতের খরা-বন্যা-অতিবৃষ্টি সহনশীল বীজ, সার ও কীটনাশক তুলে দিতে হবে এবং কৃষিক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এক কথায়, কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বিপ্লব ঘটাতে হবে।

বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক বলে মনে করা হলেও সম্প্রতি চালসহ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সম্প্রতি একাধিক জরিপে উঠে এসেছে। বিশেষত শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় না বাড়লেও নানাভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শহুরে দারিদ্র্য বেড়েছে বলে পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চালসহ নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষকে তাদের আয়ের বেশিরভাগ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। এর ফলে সুষমখাদ্য তথা পুষ্টির চাহিদা পূরণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বাসস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ বা সংস্থান করতে পারছে না সাধারণ মানুষ। দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চলছে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা, অস্বাভাবিকহারে ও অযৌক্তিক প্রক্রিয়ায় পণ্যমূল্য বৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রাকে দূর্বিষহ করে তুলেছে।

সরকার একদিকে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল ও দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মূল্য বাড়িয়ে নিজেই পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে। চলতি অর্থবছরে ৭ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করছে সরকার। যদিও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যেই দেশে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য দুটিই বাড়াচ্ছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। চলতি অর্থবছরে জীবনযাত্রার ব্যয় সাড়ে ৮ শতাংশ বা তারও বেশি বেড়েছে। ভোক্তা অধিকারসংক্রান্ত সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের বার্ষিক প্রতিবিদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

গত বছর দেশে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির হার আগের বছরের মূল্যস্ফীতির হারের শতকরা ৩২ ভাগ বেশি বলে জানা গেছে। এমন অস্বাভাবিক হারে মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল একচেটিয়াভাবেই বিত্তবানদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এই বৃত্তের বাইরে থাকা নিম্ন আয়ের ১২ কোটি মানুষ মাথাপিছু আয়বৃদ্ধির সুফল পাচ্ছে না। পণ্যমূল্যের স্ফীতি দেশে অন্তত ২ কোটি নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে বলে ক্যাবের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। নিত্যপণ্যের নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকারের চরম ব্যর্থতার পরিচয় সুস্পষ্ট। কোনো গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব সরকারের শাসনে নিত্যপণ্যের মূল্যে এমন নিয়ন্ত্রণহীন উল্লম্ফন চলতে পারে না।

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে কোটি কোটি মানুষকে অর্থনৈতিক চাপে ফেলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়া অথবা দারিদ্র্য নিরসন করা সম্ভব নয়। বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের মূল্য অব্যাহত হারে কমেছে বাংলাদেশে তখন জ্বালানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির মূল্য বাড়ানোর আগে গণশুনানির নিয়ম রয়েছে, প্রতিটি গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য না বাড়িয়ে মূল্য কমিয়ে এনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানালেও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন মূল্য সমন্বয়ের কথা বলে প্রতিবারই মূল্য বাড়িয়েছে। জ্বালানি ও গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে পণ্যমূল্য বেড়ে থাকে। সরকার যখন গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে নানাবিধ পরিকল্পনার কথা বলছে, উদ্যোগ নিচ্ছে তখন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয়বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের কারসাজি ও মুনাফাবাজির কারণে শহুরে নিম্ন ও মধ্যআয়ের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে।

সার্বিকভাবে সরকারি উদ্যোগের ব্যর্থতার বিষয়টিই এতে স্পষ্ট। এ প্রবণতার একটি ইতিবাচক প্রতিকার অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পণ্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে অতি প্রয়োজনীয় ১২ থেকে ১৫টি পণ্য চিহ্নিত করে তার সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক সেল বা স্বতন্ত্র একটি মন্ত্রণালয়ও গঠন করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার দায়িত্বে তার কার্যালয়ে একটি পৃথক শাখা প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। আমরা প্রত্যাশা করব, ক্যাব বিশেষজ্ঞদের সুপারিশগুলো সরকার বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। রাষ্ট্রের বৃহত্তর একটি শ্রেণি পণ্যমূল্য বাড়ার অভিঘাতের শিকার হবে তা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। এর জন্য বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে, পাশাপাশি অতি মুনাফা এবং চাঁদাবাজি রোধে নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ। ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় দেশে বেশ কিছু আইন হয়েছে। এসব আইনের বিধিমালা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলে তা নিশ্চিত করা গেলে দেশের সবশ্রেণির মানুষ মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবিধা পাবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকার তথা সংশ্লিষ্টরা মানুষের ব্যয় কমাতে আরো তৎপর হোক-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে বিশ্বের অন্যতম অনিরাপদ ও বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান পেয়েও জীবনযাত্রার জন্য বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহর ঢাকা। কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিরসনে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেও পণ্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার কারণে প্রতি বছর নতুন করে দরিদ্র মানুষের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে লাখ লাখ পরিবার।

দীর্ঘদিন ধরেই অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় ও স্থিতিশীল রাখার পরামর্শ দিয়ে আসছেন সবাই। সাধারণ মানুষ যাতে উন্নয়নের সুফল বঞ্চিত না হয়, সে জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বারবার। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, স্বাস্থ্য খাতের সেবা সম্প্রসারণ হলেও মান আগের মতোই প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যয়বহুল। গণপরিবহনে নৈরাজ্য থামেনি। রাজনৈতিক সুবিধাভোগী শ্রেণির কারণে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে চলেছে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ আশানুরূপ হয়নি। ২০১৭ সালে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল চালসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি। এ সময় মাথাপিছু আয় বাড়লেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির শিকার হতে হয়েছে দেশের ১২ কোটি মানুষকে। যারা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের। সম্প্রতি কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ২০১৭ সালের পণ্য ও সেবামূল্য বিশ্লেষণ করে জীবনযাত্রার ব্যয় ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে প্রতিবেদন-২০১৭ প্রকাশকালে এসব তথ্য দিয়েছে। বলাই বাহুল্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাঁধে। পণ্যের চড়া মূল্যের কারণে সাধারণ স্বল্প আয়ের মানুষের সঞ্চয় কমে যায় এবং এরা উন্নয়নের সুফল বঞ্চিত হয়ে প্রান্তিক শ্রেণিতে পৌঁছে যায়, বিশ্লেষকদের এমন ভাবনাও অমূলক নয়। ক্যাবের সর্বশেষ রিপোর্টে গত বছর ঢাকার শহরে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির হার ছিল গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হাত ধরে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির জন্য মূলত সরকারের সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতার দায় সবচেয়ে বেশি।

উল্লেখ্য, দেশে বোরো ও আমন ধানের বাম্পার ফলন ও লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করার পরও কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি খাদ্যশস্য ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়া, আপদকালীন ও জরুরি খাদ্য মজুদ অক্ষুণ্ন রাখতে ব্যর্থতা এবং হাওরে ফসলহানির পর সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতি পূরণে চাল আমদানিশুল্ক শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসার পরও খুচরা বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারার ব্যর্থতা সরকার এড়াতে পারবে না। অন্যদিকে বাম্পার ফলন দিয়ে খাদ্য চাহিদা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ধান ও আলুচাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে মূলধন হারিয়েছে। সফল কৃষকরা এখন কৃষিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ একটি অশনি সংকেত। নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা ও কৃষকের স্বার্থরক্ষার বদলে আমদানিকারক ও মুনাফাবাজ সিন্ডিকেটকে লাভবান করার মাধ্যমে দেশকে সামাজিক অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়েছে। বল্গাহীন মুনাফাবাজি ও লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বৃদ্ধি ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট