জিতলেই ফাইনালে বাংলাদেশ

মহিউদ্দিন পলাশ, দুবাই থেকেে :
এশিয়া কাপ ক্রিকেট বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠেছে মরুর বুকে দুর্গম পথ পাড়ি দেয়ার মতো। যে এশিয়া কাপ ক্রিকেট বাংলাদেশের সাফল্যে সোনালি রোদে মোড়ানো, সেই এশিয়া কাপ ক্রিকেট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের জন্য মরুর বুকে চলাচলের মতোই কঠিন। এশিয়া কাপের গত তিন আসরের আয়োজক বাংলাদেশ দু’বার খেলেছে ফাইনালে। আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটের যে জাগরণ তা শুরু হয়েছিল ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপ আয়োজনের মাধ্যমে। এবারো এশিয়া কাপের শিরোপার জোর দাবিদার বাংলদেশ। শুরুটাও করেছিল সেভাবে। শ্রীলঙ্কাকে পাত্তাই দেয়নি ম্যাচ জিততে। নাকাল করে ম্যাচ জিতেছিল ১৩৬ রানের বিশাল ব্যবধানে। কিন্তু সেই ম্যাচেই তামিম ইকবালের ইনজুরি বাংলাদেশের চলার পথকে কঠিন করে তোলে। আনাড়ি উদ্বোধনী জুটি বাংলাদেশ দলের জন্য ভারবাহী হয়ে ওঠে। প্রতি ম্যাচেই ভুগতে হচ্ছে। যে কারণে আফগানিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে জিততেও বাংলাদেশ দলের ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। গ্রুপ পর্বে সেরা একাদশ নিয়ে না নামার ফলে হার নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু সুপার ফোরের ম্যাচটি ছিল ফাইনালে যাওয়ার পথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই ম্যাচ বাংলাদেশ জিতেছে। কিন্তু তার বিনিময়ে মরুর তপ্ত বুকে মাশরাফিদের শরীর থেকে অনেক ঘাম বের করে নিয়েছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ক্রিকেটারদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস শুধুই প্রমাণ করে জয় পেতে খেলোয়াড়রা কি পরিমাণ মুখিয়ে ছিলেন। এই ম্যাচ না জিতলে বাংলাদেশের ছুটি হয়ে যেত এশিয়া কাপ থেকে। আসরে টিকে গিয়ে বাংলাদেশ ফাইনালে যাওয়ার শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। আজ পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই রূপ নিয়েছে অলিখিত সেমিফাইনালে। জিততে হবে। তা হলেই ফাইনালের টিকিট চূড়ান্ত। একই সমীকরণ পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও। দুই দলই ভারতের কাছে হেরেছে, জয় পেয়েছে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। জয়ী দল ২৮ তারিখ ফাইনাল খেলবে ভারতের বিপক্ষে।
যে সমীকরণে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে, তাতে মনে করিয়ে দিচ্ছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সুখ স্মৃতিকে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। দুই দলের পয়েন্টই ছিল সমান ১ পয়েন্ট করে। যে দল জিতবে তারাই যাবে সেমিফাইনালে। নিউজিল্যান্ডের ৮ উইকেটে করা ২৬৮ রানের জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশ ৩৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ধুকছিল। সেখান থেকে মাহমুদউল্লাহ ও সাকিবের জোড়া সেঞ্চুরিতে ম্যাচ জিতেছিল ৫ উইকেটে। এবার এশিয়া কাপের অলিখিত সেমিতে আসার আগে বাংলাদেশ আফগান যোদ্ধাদের হারিয়েছিল শেষ বলে। সেখানেও কাজ করেছিল ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে মাহমুদউল্লাহ ও ইমরুল কায়েসের জোড়া ফিফটি। আফগানদের বিপক্ষে জয় ছিল কঠিনেরে জয় করার মতো। এই জয়ে অনেকটাই উজ্জীবিত দল। এই উজ্জীবনী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বাংলাদেশ এবার বধ করতে চায় পাকিস্তানকে। পাকিস্তান বলে যেমন আশার প্রদীপ জ্বলে ওঠে। তেমনি আবার শঙ্কাও কাজ করে। শঙ্কার কারণ দলটি আন প্রেডিকটেবল। এশিয়া কাপে এখনো নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি। জয় পেয়েছে আফগানিস্তান ও হংকংয়ের বিপক্ষে। চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে দু’বার খেলে দু’বার নতজানু হয়েছে। অথচ এই পাকিস্তানই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে আবার ভারতকে পাত্তাই দেয়নি। শঙ্কা আরো আছে। এশিয়া কাপে বাংলাদেশকে ভুগাচ্ছে কন্ডিশন। এখানে আবার পাকিস্তান অভ্যস্ত। এটি যে তাদের হোম ভেন্যু। এই দিক দিয়েও পাকিস্তান কিছুটা এগিয়ে থাকবে। পাকিস্তানের বিপক্ষে আশার আলো সর্বশেষ মোকাবিলাতে তাদের বিপক্ষে শুধু জয়ই আসেনি, তিন ম্যাচের একদিনের সিরিজে ধবল ধোলাই করেছিল। এই সুখ স্মৃতি ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের পর পরই। এরপর আর দুই দলের কোনো মোলাকাত হয়নি। এবার একই সমীকরণে দুই দল মুখোমুখি। এবারের এশিয়া কাপে দুই দলই নিজেদের সেরাটা মেলে ধরতে পারেনি। তবে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক ভালো খেলেছে। শ্রীলঙ্কাকে বড় ব্যবধানে হারানোর পর আফগানিস্তানকে সুপার ফোরের আগের ম্যাচে টানটান উত্তেজনার পর বাংলাদেশ হারিয়েছে শেষ বলে।
পরপর দুই ম্যাচে হারের পর বাংলাদেশের মনোবল যে তলানিতে নেমে গিয়েছিল তা তারা ফিরে পেয়েছে আফগানিস্তানকে শেষ বলের নাটকীয়তায় হারিয়ে। মাশরাফি এই জয়কে দেখছেন অনেক বড় হিসেবে। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ নিজেদের রণ পরিকল্পনা সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলেছিল। যে কারণে দেশ থেকে উড়িয়ে আনা ওপেনার ইমরুলকে খেলানো হয়েছিল ছয়ে। সঙ্গে ছিল আরো বেশ কয়েকটি পরিবর্তন। আজকের ম্যাচে আবার সে রকম পরিকল্পনা থাকবে না। আফগানদের বিপক্ষে আতঙ্ক ছিল রশিদ খান, সঙ্গে অফ স্পিনার মুজিব। পাকিস্তানের বিপক্ষে ভয় তাদের পেস ব্যাটারি। যদিও শক্তিশালী পেস আক্রমণ ভারতের বিপক্ষে দুই বারের মোকাবিলাতেই ভোতা ছিল। এমনকি আফগানিস্তানও তাদের বিপক্ষে আড়াইশর ওপরে রান করেছিল। হাসান আলী, ওসমান খান মোহাম্মদ নাওয়াজরা ভালো করতে পারছেন না। তাই এটাকে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না বাংলাদেশের কোচ স্টিভ রোডস। কারণ আবুধাবির সেøা উইকেট। রোডস বলেন, ‘উইকেটের কারণে পাকিস্তানের পেসারদের বল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে সহজে আসবে।’ পাকিস্তানের লেগ স্পিনার শাদাব খানকে অবশ্য আফগানিস্তানের রশিদ খানের মতো হুমকি মনে করছেন না কোচ। সে তুলনায় বাবার আজম, শোয়েব মালিক, ইমাম-উল হক অনেক ভালো করছেন। বাংলাদেশের বোলারদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারেন।
আজকের ম্যাচের রণ পরিকল্পনা নিয়ে কোচ কিছুই বলতে রাজি হননি। অভিষেকের পর টানা তিন ম্যাচেই ব্যর্থ ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্ত মাশরাফির কথায় হয়তো আরেকটি লাইফ লাইন পেতে যাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে ইমরুলকে ছয়েই থাকতে হতে পারে।