জামায়াতে মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব খান সাহেবের খানপ্রীতি না দুরভিসন্ধি?

জামায়াতে মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব খান সাহেবের খানপ্রীতি না দুরভিসন্ধি?

জামায়াতে মুক্তিযোদ্ধা আছে। এ তথ্য দিয়েছেন নজরুল ইসলাম খান। খান সাহেব বিএনপি করেন এখন। বাম ঘরানার মানুষ। তার মুখের কথার দাম আছে এমনটা ধরে নিলে আমরা বিশ্বাস করতে পারি তিনি জেনে বুঝেই তা বলেছেন। কিসের ভিত্তিতে তিনি এ কথা বললেন জানা যায়নি। তবে ধারণা করা যায়, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য ছিল। সে উদ্দেশ্য পরিষ্কার না হলেও ধরে নেয়া যায় মহৎ কিছু না। রাজনীতির এই খেলা শেষ হওয়ার মতো বলে মনে হয় না আর। আস্তে আস্তে বাংলাদেশের রাজনীতি তার মৌল বিষয়গুলো নিয়েও মশকরা শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো হালকা বিষয় নয়। এ আমাদের পরম গর্ব আর রক্তমাখা অতীতের ইতিহাস। যে যুদ্ধ না হলে আমরা দেশ, পতাকা, সংগীত কিংবা সম্মান কিছুই পেতাম না। আজ যারা রাজনীতি নিয়ে ব্যবসা করছেন তারা বিষয়গুলো জানলেও তাদের মুখ, মন ও কাজ আজ এমন জটিল যা যাবতীয় সবকিছু ওলটপালট করে দিচ্ছে। এমন কাজ আগেও করেছিল তারা। সে জায়গা থেকে বাংলাদেশকে বহু কষ্টে বের করে এনেছেন শেখ হাসিনা। সে ভূমিকা তারা মানেন না। তাই তাদের এসব পাগলের মতো কথাবার্তা।

আমরা এখনো বেঁচে আছি। আমাদের আগের প্রজন্মের মানুষও আছেন বেঁচে। যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের নিশ্চয়ই জানা আছে- কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছিল। কারা, কোন দলের হয়ে লড়াই করেছিল সে ইতিহাসও আছে লিপিবদ্ধ। তারপরও তারা খামাখা তর্ক বাধিয়ে দিতে ভালোবাসেন। খেয়াল করবেন, একদা স্বাধীনতার ঘোষক নামে খ্যাত জিয়াউর রহমান বিতর্ক এখন অস্তমিত। তাদের সেই সব প্রোপাগান্ডা ধোপে টেকেনি। দেশজুড়ে বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমদসহ চার জাতীয় নেতা আর মুক্তিযোদ্ধাদের বিতর্কিত করার কাহিনীও মানুষ মানেনি বরং আজ এমন এক অবস্থা যেখানে মিডিয়া ও বিশ্বায়নের কল্যাণে জনগণ হারানো অতীত স্পষ্ট দেখতে পায়। খুব বেশি দিনের ঘটনা নয় একাত্তর। এমনো না যে, এর কোনো দলিল-দস্তাবেজ নাই। যে রক্তঝরা সংগ্রাম আর ত্যাগে দেশ মুক্ত হয়েছিল তার প্রধান দুশমন ছিল পাকবাহিনী আর তার দেশীয় দালালরা। এরাই ছিল রাজাকার। রাজাকার একটি বাহিনীর নামমাত্র। দালাল কিছু মানুষের নাম। এদের সংগঠিত করা, এদের ট্রেনিং দেয়া কিংবা নানা অপকর্মে লাগানোর জন্য একটি রাজনৈতিক দল বা শক্তির প্রয়োজন ছিল। কারা সেই শক্তি? কাদের নির্দেশে আমাদের দেশের সূর্যসন্তানদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল? কারা তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে পাকিস্তান বাঁচানোর জন্য দেশদ্রোহিতায় নাম লিখিয়েছিল? সে ইতিহাস সবার জানা।

বিভাজন বা যুগ যুগ ধরে বৈরিতা টিকিয়ে রাখা আমরাও চাই না। কিন্তু কার সঙ্গে আপস বা কাকে মার্জনা? যারা অপরাধ করে বুক ফুলিয়ে দেশপ্রেমিক সাজে তাদের সঙ্গে কীভাবে ঐক্য বা সমঝোতা হতে পারে? আর কেনই বা তাদের নামে ইতিহাসকে কলঙ্কিত করা? জামায়াতের নেতারা কখনো যা বলেননি বা বলার সাহস করেননি একদা বাম এখন বিএনপি নেতা নজরুল খান তাই বললেন। তার এই কথা মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি সরে দাঁড়াননি। যার মানে এটাই তার বিশ্বাস। ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মদানে পাওয়া দেশ নিয়ে এই রসিকতা কি নির্বাচনের ডামাডোলে ঢাকা পড়ে যাবে? তাকে এর একটা ব্যাখ্যা বা প্রমাণ দিতেই হবে। অন্যথায় আমাদের মৌল বিষয়কে বিতর্কিত ও কলঙ্কিত করার কারণে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর বিকল্প দেখি না।

আপনি আওয়ামী লীগ করেন, না বিএনপি করেন, না বাম দল করেন সেটা এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়। এখানে জাতির ইতিহাস আর সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় জড়িত। তার কথা সত্য মানলে এদেশের অনেক কিছুই বদলে দিতে হবে। বদলে যাবে তরুণ প্রজন্মের মনোভাব। এমনিতেই বিভ্রান্তির শেষ নেই। কু-তর্ক আর ঝগড়ায় দুর্বল আমাদের চেতনা। তার ওপর এই খাঁড়ার ঘায়ের আসল রহস্য কী? এটা কি নতুন কোনো চাল? এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। এরা মাঝে মধ্যে এমন সব বিষয় মাঠে নিয়ে আসেন যা দশকের পর দশক ধরে মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখে। যখন দেশ ও জাতি মাথা তুলে দাঁড়াতে চায় বা পারে তখন এরা এসব কু-তর্কে আবার তাদের অনেক বছর পিছিয়ে দেয়। একি তেমন কোনো দুরভিসন্ধি? আগেই বলেছি বিএনপির আগের তর্কগুলো মৃত। সেগুলো প্রত্যাখ্যাত বলেই কি এমন নয়া বিষয়ের অবতারণা?

খোদ জামায়াত যা বলে না তা আগ বাড়িয়ে বলার পেছনে কী রহস্য সে জট খোলা জরুরি। আগেই বলেছি রাজনৈতিক দল এখানে মুখ্য না। বড় বিষয় দুরভিসন্ধি। কেন এমন একটা বিষয় সামনে আনা হলো? এর মানে কি এই, জামায়াত বিষয়ে তারুণ্যকে বিভ্রান্ত করা? না ভোটের সময় তাদের প্রার্থিতা বৈধ করা? তাদের পথ খোলার ভেতর দিয়ে বিএনপির সেই পুরনো মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ভুল রাজনীতি চালু করার এই অপপ্রয়াস মুক্তিযোদ্ধাদেরই রুখতে হবে। তাদের হয়তো এখনো বিষয়টা তেমন স্পর্শ করেনি। তারা এদেশের সোনার সন্তান। তাদের মান-অপমানের সঙ্গে জাতির মান-অপমান দেশের ভালো-মন্দ জড়িত। যারা নানা অজুহাতে তাদের বিতর্কিত করে তাদের সঙ্গে দালালদের এক করে আমরা তাদের চক্রান্ত সফল হতে দিতে পারি না। ভয়াবহতা সেখানেই। তার কথার তিল পরিমাণ সত্য হলেও দেশের ইতিহাস বদলে যাবে। একাত্তরের নয় মাস ভারত-সোভিয়েত দেশের ভেতরে-বাইরে যেসব মুক্তিযোদ্ধা লড়েছিলেন সবাই পড়বে তর্কের মুখে। সোজা কথা, তাহলে কার সঙ্গে কার লড়াই হয়েছিল? কারা জয় লাভ করেছিল কাদের বিরুদ্ধে? এহেন আত্মপ্রতারণা আর ইতিহাস বিকৃতির প্রলাপের কি শাস্তি নাই? আশ্চর্য লাগে ব্যক্তিগত লাভালাভ আর ব্যক্তি আক্রমণে অনেকে সাজা খেটে জেলে যায় কিন্তু দেশ ও মাটির শিকড় ধরে টানাটানি ইতিহাসকে যারা অপমান করে তারা ঠিক বেঁচে যায়। এটাও রাজনীতির নোংরা আর কালো দিক। আওয়ামী লীগ এখন ভোট নিয়ে ব্যস্ত। তাদের কাজ জিতে আসা। তাই তারা এখনই হয়তো এ বিষয়ে কথা বলবে না। মুখ খুলবে না। যখন তা করবে তখন অনেক বিষয়ের মতো দেরি হয়ে যাবে। যে জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে আবার এক দশক লাগবে আমাদের।

খান সাহেব পাকিখানদের মতো আমাদের সেই গহ্বরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। রাজনীতি না চাইলে আমাদেরই তার জবাব দিতে হবে। কারণ এদেশের জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি তারাই বেশি লোকসান করাতে পেরেছে যারা না ছিল রাজাকার না জামায়াত। এদের মিত্র হওয়ার খায়েশ আর এদের কাঁধে বন্দুক রেখে দেশবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কথা ও কাজের কাজিরাই আমাদের ডোবাতে চেয়েছে বারবার। যে কাজে এখন কাদের সিদ্দিকীর মতো একদা বীরও জড়িত। নতুনভাবে নাম লিখিয়েছেন ড. কামাল হোসেন বা আসম আবদুর রব। তাই খান সাহেবের এই খানপ্রীতি আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে খেলাধুলা বন্ধ করাতে হবে। মাটি ও মানুষ এখনো বেঁচে আছে। দেশ এখন নতুন প্রেরণায় উদ্ভাসিত। তার এমন নোংরা কথার রাজনীতির প্রয়োজন নাই। সেটা জানান দিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নাই। আফসোস, দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী কিংবা সচেতন মানুষদেরও তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলাম না। নজরুল ইসলাম খানের এই এসিড টেস্ট সফল হলে দুর্ভোগের অন্ত থাকবে না।
– লেখক: সিডনী প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.