জামায়াতে অন্তর্দ্বন্দ্ব চরমে

জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে অন্ধকারে। দলটির মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার কারণে ক্ষমা চাওয়া ও দলের সংস্কারকে কেন্দ্র করে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগ ও গত শুক্রবার দল থেকে শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু বহিষ্কার হওয়ার ঘটনায় নেতাকর্মীর মধ্যে বেশ উদ্বেগ দেখা গেছে।

মঞ্জুর বহিষ্কার ও রাজ্জাকের পদত্যাগের পর গুঞ্জন উঠছে যে, বয়সের কারণে আমীর পদ থেকে অব্যাহতি নিতে পারেন মকবুল। দলটির নেতারা বলেন, এটি একটি কারণ হতে পারে। অপর কারণটি হচ্ছে দুই নেতার সংস্কার বিষয়ের পর কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন মকবুল। আজ বা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে মকবুল পদত্যাগ করতে পারেন। এদিকে দলটিতে কী ঘটতে যাচ্ছে, বা নেতাদের মধ্যে কী হচ্ছে, দলের ভবিষ্যৎ কোন দিকে ধাবিত হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চলছে নানা নাটকীয়তা।

আর জামায়াতের এসব নাটকীয়তা নিয়ে গণমাধ্যম সরব হলেও দলটির শীর্ষ নেতাদের কোনো ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু কথা বলছেন পদত্যাগকারী ও বহিষ্কার হওয়া ব্যক্তি। রাজ্জাক ও মঞ্জুর সংস্কারের কথা বলার পর তৃণমূলে জামায়াত নেতাদের ওপরও বেশ প্রভাব পড়ছে। তার ধারাবাহিকতায় গত শনিবার সিরাজগঞ্জের জামায়াতের স্থানীয় এক ইউনিয়ন নেতাও পদত্যাগ করছেন। অবশ্যই জামায়াত নেতাদের এসব বক্তব্যকে সরকার পর্যবেক্ষণে রাখলেও গুরুত্ব দিচ্ছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলছেন জামায়াতকে সরকার পর্যবেক্ষণে রাখবে। এ মুহূর্তে গুরুতর মন্তব্য করা যাবে না। তিনি এর আগে বলেছেন জামায়াত ক্ষমা চাইলে রাজনীতি করার অধিকার দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পর দিন ওবায়দুল কাদের বলছেন জামায়াত ক্ষমা চাইলেও যুদ্ধাপরাধীর বিচার চালিয়ে যাবে। অপরদিকে জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গত শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থাকতে পারে। সেই কারণে নিজেকে সেফ করতে রাজ্জাক এ কৌশল নিতে পারেন।’ মাহবুবে আলম বলেন, ‘জামায়াত নেতারা যতই কৌশল করুক না কেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলবে।’

অন্যদিকে জামায়াতের রাজনীতি আগ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও এখন জগাখিচুড়িতে রূপান্তর হচ্ছে এমনটি মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। দলটির কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা ও নির্বাহী পরিষদের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে শূরা সদস্যদের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন নামে সংগঠন করার বিষয়ে অনেকটা এগিয়ে গেলেও তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে দলের অভ্যন্তরে। এ বিষয়টিকেই কেন্দ্র করেই লন্ডন থেকে চিঠি পাঠিয়ে দল থেকে সরে গেছেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক। বহিষ্কার হয়েছেন শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু।

জামায়াতের নতুন উদ্যোগের প্রত্যাশায় থাকা নেতারা বলছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে ক্ষমা চাওয়া একটি বিবেচ্য বিষয়। ক্ষমা চাওয়ার সঙ্গে দলের সিনিয়র নেতাদের মান ও মর্যাদা যুক্ত। ক্ষমা চাইলে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের প্রত্যাশা ছিল, জামায়াতের হাইকমান্ড নতুন সংগঠনের যাত্রা শুরু করবেন। কিন্তু গত জানুয়ারিতে মজলিসে শূরার সদস্যরা নতুন নামে সংগঠন করার বিষয়ে মতামত দিলেও তা প্রকাশ পায় এ মাসে। এখানেই দলের পরিবর্তনপ্রত্যাশীদের প্রশ্ন। ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক জানুয়ারিতেও এ মত দিয়েছেন। তার মত ছিল, ক্ষমা না চাইলেও অন্তত দল বিলুপ্ত করে দেয়া হোক। যদিও জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির অর্ধেক সময় পর্যন্ত জামায়াতের হাইকমান্ড দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। গত শুক্রবার দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন শিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের মজলিসে শূরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক আগে থেকেই উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছি। অনেক ওয়ার্ক করা হয়েছে, তৃণমূল থেকে মতামত নেয়া হয়েছে। আমাদের জানানো হয়েছে, যে আমরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি। তবে এখন এসে বলা হচ্ছে, আমরা ৫ সদস্যের কমিটি করেছি। আমার কাছে বিষয়টি মনে হয়েছে, বর্তমানে পরিবর্তনের যে দাবি উঠেছে, তা জাস্ট ফেস করার একটি চেষ্টা।’

মঞ্জুর পর্যবেক্ষণ, নতুন উদ্যোগের বিষয়ে জানুয়ারিতে সিদ্ধান্ত হলো। ৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। জানানো হলো অধস্তনদের, প্রেসকে জানানো হয়নি। কারণ কী, মানে হচ্ছে অধস্তনদের শান্ত রাখতে চাচ্ছে। তথ্যের লুকোচুরি করা হয়েছে। রাজ্জাক সাহেব ভদ্রলোক মানুষ, নিয়মতান্ত্রিকভাবে তিনি সবকিছু করে এসেছেন।

এ বিষয়ে নির্বাহী পরিষদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আমাদের মধ্যে সবকিছু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে মৌলিক কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনি।’

নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্যের বরাত দিয়ে ছাত্রশিবিরের এক সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, নতুন নামে সংগঠনপ্রক্রিয়া প্রায় শেষদিকে। সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি এ নিয়ে কাজ করছে। এ কমিটির প্রতিবেদনের পরই আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেবে জামায়াত।

এদিকে নতুন নামে প্রস্তাব ও জামায়াতকে মূল সংগঠন হিসেবে ঠিক রেখে নতুন সংগঠন গড়ে তোলার বিষয়ে মজলিসে শূরার একাধিক সদস্য মানবকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। কোনো কোনো নেতার ভাষ্য ছিল, চলতি বছরেই নতুন সংগঠনের দেখা মিলতে পারে। জামায়াতের রাজনীতির পর্যবেক্ষক, সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান অবশ্য ৫ সদস্যের কমিটি গঠনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘শফিকুর রহমান সাহেবের নেতৃত্বে কমিটি হয়েছে। এখন যারা কথা বলছে, তারা ইসলামের নৈতিকতায় বিশ্বাস করে না। এটা তো সবার জানার কথা নয়, এটি দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘ক্ষমা না চাওয়া কিংবা নতুন সংগঠনের বিষয়ে এটা হতে পারে, যে একটা কাজ যখন আপনি প্রথমেই না করেছেন, সেটা পরবর্তী সময়ে দলের পরের নেতারা ভাবছেন, আগে যারা ছিলেন তারা তো করেননি, সেক্ষেত্রে কেন করব। এই যে ধারাবাহিক সমস্যা। ড্রাফট করেছিল, কী ভাষায় ক্ষমা চাইবেন। সেখান থেকেও নেতারা সরে এসেছেন।’

শিবিরের সাবেক এই সভাপতি ব্যাখ্যা করেন, পার্টির মধ্যে এখন বিরাট প্রশ্ন, আমরা যদি ক্ষমা চাই তাহলে আমাদের নেতারা যারা শহীদ হয়েছেন, যারা নিহত হয়েছেন, তাদের ব্লেইম করা হয়। কথাটা কিন্তু যুক্তিপূর্ণ, আবেগ জড়িত। আমি এটাই বলেছি যে, পার্টিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগে যে, আগে ভুল করেছে নাকি সঠিক করেছে। যদি সঠিক হয়, তাহলে ক্ষমা চাইবেন কি না। যদি ভুল করে তাহলে প্রশ্ন হবে, আদর্শিক সংগঠন হিসেবে সেই ভুল নিয়ে আপনি চলবেন কি না। হ্যাঁ ভুল করেছেন, জাস্টিফাই করেননি। জাস্টিফাই করা হলে ফলাফল ভয়ঙ্কর হবে, তাহলে পার্টি বিলুপ্ত করে দিন। রাজ্জাক সাহেব তো এ কথাই বলেছেন।

এদিকে জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগ, মঞ্জুর বহিষ্কারের পেছনে ভিন্ন কোনো কারণ আছে কি না, এ নিয়ে জামায়াত ও শিবিরের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয়।

জামায়াতের ঢাকা মহানগরের এক নেতা মনে করেন, বহিষ্কারের সংখ্যা বাড়তে পারে। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় একনেতার সন্দেহ, তাদের পদত্যাগ ও বহিষ্কারের পেছনে নতুন উদ্যোগ যুক্ত কি না, এমন ধারণা আমাদের কারো-কারো আছে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ প্রসঙ্গে জামায়াতের আন্দোলন ও রাজনীতির নিবিড় পর্যবেক্ষক সাবেক সচিব শাহ আব্দুল হান্নান বলেছেন, জামায়াতের মধ্যে কোনো সংস্কার হয়নি বলে উল্লিখিত বক্তব্য সঠিক নয়। এর মধ্যে জামায়াতের কার্যক্রমে অনেক সংস্কার ও অগ্রগতি হয়েছে। জামায়াত নারীদের এমপি নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছে। উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত করেছে অনেককে। জামায়াতের নারী সদস্যের সংখ্যা এখন অর্ধেকের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মেয়েদের রুকন করার ব্যাপারে কড়াকড়ি শিথিল করা হয়েছে। দলের সংখ্যালঘু সদস্য করা হয়েছে ৮০ হাজারের কাছাকাছি। সামনে এ সংখ্যা আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’

শাহ হান্নান পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী আর বাংলাদেশ-জামায়াত এক নয় বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘বর্তমান জামায়াতে ইসলামী ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীনতার সময়ের ভ‚মিকার জন্য তাদের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক নয়। এর পরও দলের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম জেল থেকে মুক্তি পাবার পর বায়তুল মোকাররমে জামায়াতের বিশাল জনসভায় ১৯৭১ সালে জামায়াতের সে সময়ের রাজনৈতিক ভ‚মিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রয়োজন মনে করা হলে এখন আবারো ক্ষমার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।’
জামায়াতের নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে শাহ হান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের কিছু ঐতিহাসিক নাম রয়েছে। যেমন মুসলিম লীগ ভারতে, পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে রয়েছে। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীও ভারত পাকিস্তান এমনকি শ্রীলঙ্কায়ও রয়েছে। ১৯৭৯ সালে এখানে যে জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটি নতুন জামায়াতে ইসলামী। একেবারে অল্পসংখ্যক রয়েছেন যারা স্বাধীনতা পূর্ব জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংবিধান, রাজনৈতিক বাস্তবতা এসব কিছু মেনে নিয়েই জামায়াত এখানে কাজ করছে। জামায়াতের বিলুপ্তির প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এরপরও জামায়াত হয়তো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে পারে। ইসলামের প্রচার ও সমাজ কল্যাণমূলক কাজ দলের নতুন ফোকাস হতে পারে। আর কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি নিয়ে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।’

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এই সিদ্ধান্তটিকে সঠিক বলে মনে করি না। কোনো সংগঠন বা ফোরামে সবার সব পরামর্শ গৃহীত হবে এমনটি বাস্তবসম্মত নয়। এরপরও এটি তার অধিকার। আমি তার সব ধরনের কল্যাণ কামনা করি।’
অন্যদিকে সংস্কার তোলার পর জামায়াতে ইসলামীতে চলছে অস্থিরতা চরমে। একাত্তরের ভ‚মিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া-না চাওয়া, জোটপ্রধান বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা-না রাখা, নতুন দল গঠন প্রভৃতি নিয়ে দলটিতে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। রাজ্জাক কেন দল থেকে পদত্যাগ করলেন এ নিয়ে দলে চলছে বিশ্লেষণ। তিনি নতুন কোনো দল গঠন করেন কি না তা নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এহসানুল মাহবুব যোবায়ের বলেন, ‘নতুন দল গঠনসহ নানা প্রস্তাব রয়েছে। জামায়াত একটি বড় দল। দলের বিভিন্ন স্তর থেকে নানা রকমের প্রস্তাব আসে। কেন্দ্রীয় নেতারা বিচার-বিশ্নেষণ করে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। নতুন দল হবে কি না, তার নেতৃত্বে কারা থাকবেন, প্রয়োজন হলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে।’

মানবকণ্ঠ/এএম