জবির ভিসিকে অবরুদ্ধ করেছে ছাত্রলীগ

সমাবর্তনের দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানকে অবরুদ্ধ করেছে জবি শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে উপাচার্যের গাড়িও আটকে রাখেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রোববার দুপুর ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এ ঘটনা সংঘটিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, স্থানের অভাব ও রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার স্বার্থের কথা ভেবেই সমাবর্তন আয়োজনে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এটা শুধু অজুহাত। তাদের দাবি, সমাবর্তন না হওয়ার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাব।

জানা যায়, সমাবর্তনের দাবিতে রোববার দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে মিছিল করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি সম্পূর্ণ ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে শেষ হওয়া মাত্র আবার জবি শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্যোগে মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে গেট আটকিয়ে তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় উপাচার্য ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। তারা বার বার বের হতে চাইলেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কঠোর অবস্থানের কারণে কেউ বের হতে পারেননি। একপর্যায় তারা প্রশাসনিক ভবনের গেট ছেড়ে দিলে উপাচার্য ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা প্রশাসনিক ভবনের ভেতর থেকে বের হন। উপাচার্যের গাড়ি যখন প্রশাসনিক ভবন ও ভাষা শহীদ রফিক ভবনের মাঝখানে তখন আবার ছাত্রলীগের একটি মিছিল গাড়িটি আটকে ফেলে এবং প্রায় ১৫ মিনিট উপাচার্যের গাড়িটি সেখানে অবস্থান করে। পরে বিভিন্ন শিক্ষকদের অনুরোধে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখান থেকে সরে যান। এরপর উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হন।

এদিকে ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয় ব্রিটিশ আমল থেকে শিক্ষার আলো ছড়ানো দেশের প্রাচীনতম এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর পার হয়ে গেছে প্রায় ১৩টি বছর। স্নাতকোত্তর শেষ করে বের হয়ে গেছেন প্রায় সব বিভাগের অন্তত ৭ থেকে ৮টি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। কোনো কোনো বিভাগের নবম ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও শেষ করে ফেলেছেন শিক্ষাজীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতর থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, যেসব শিক্ষার্থীরা তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজ থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করেছেন, সেই ২০০৩-০৪ ও ২০০৪-০৫ সেশনের প্রায় ১৯ হাজার ২৭১ জন শিক্ষার্থীসহ সমাবর্তন প্রত্যাশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫৭ হাজার ৯৩০ জন। যদিও ২০০৩-০৪ ও ২০০৪-০৫ সেশনের শিক্ষার্থীদের এরই মধ্যে সনদপত্র দেয়া হয়েছে। তাদের ছাড়াও বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী সমাবর্তন প্রত্যাশী।

এদিকে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ থেকে একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা জীবন শেষ করে প্রবেশ করার চেষ্টা করছেন কর্ম জীবনে। এমন শিক্ষার্থীরা কয়েকবার সমাবর্তনের দাবি জানালেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি। বরং সমাবর্তন করার জায়গা সংকটকে প্রধান কারণ হিসেবে সবার সামনে টেনে এনেছেন। আবার কোনো কোনো সময় রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে শিক্ষার্থীদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। আর শিক্ষার্থীরা সমাবর্তন না পেয়ে হতাশ হয়েই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিচ্ছেন।

জবির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মতে, সমাবর্তন আয়োজনে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো বার বার সামনে এনেছে প্রশাসন। কিন্তু সেই শঙ্কা অমূলক বলে দাবি করেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। সমাবর্তন প্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের দাবি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে প্রতিষ্ঠিত এমন বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিকবার সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও সমাবর্তন হয়েছে। সেখানে রাজধানীতে অবস্থিত হয়েও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সমাবর্তন আয়োজনের সদিচ্ছা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠেই তা আয়োজন করা সম্ভব।

এ বিষয়ে জবি শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সমাবর্তন আমাদের প্রাণের দাবি। জবি শাখা ছাত্রলীগের কমিটি হওয়ার পরই লিখিতভাবে আমরা উপাচার্যের কাছে সমাবর্তনের জন্য আবেদন করেছি। কয়েকবার সরাসরি এ বিষয়ে কথা বলেছি এমনকি সমাবর্তন করার মতো জায়গাও দেখিয়ে দিয়েছি। উপাচার্য বার বার বলেছেন, সমাবর্তন হবে। কিন্তু কবে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেননি উপাচার্য ড. মীজানুর রহমান।’

জবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জয়নুল আবেদীন রাসেল বলেন, ‘আমরা সমাবর্তনের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাদের বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি চায় তাহলে সমাবর্তনে আসতে পারবেন। আর রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্ব হলো সরকারের। রাষ্ট্রপতি যেখানেই যাক সরকার তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে।’

এ বিষয়ে জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন,‘সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের একটা অধিকার। আর শিক্ষার্থীদের এ অধিকার রক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চেষ্টা করে যাচ্ছে। সমাবর্তন করার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট জায়গা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় এক জায়গায় আর সমাবর্তন অন্য জায়গায় হবে এটা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার কথাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।’

মানবকণ্ঠ/এফএইচ