জনসচেতনতা জেগে উঠুক

প্রায়শই সবাই কমবেশি জনসচেতনতার কথা বলে থাকেন। তোতা পাখির মতন বলেন, জনসচেতনতা জরুরি। যেমন, বাল্যবিবাহ রোধে, জঙ্গি দমনে, মাদক নির্মূলে, ধর্ষণ রোধে, পরিবেশ রক্ষায়, অপরাধ দমনে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ইত্যাদি অনিষ্টকর অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে জনসচেতনতাকে অত্যাবশকীয় উল্লেখ করে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। যেন জনসচেতনতা ছাড়া উপায় নেই বাঁচবার, রক্ষা পাবার।

আর সেই ধরনের বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে জনসচেতনতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সকল পরিকল্পনা, বক্তব্য প্রদানের প্রচলন বেশ সক্রিয় আমাদের সমাজে, দেশে। যেমন, সচেতনতামূলক কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, টিভি-রেডিও অনুষ্ঠান- সচেতন হতে হবে, সচেতনতা জরুরি এমন বক্তব্য, বিবৃতিও অজস এবং তা ক্রমবর্ধমান। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কোনো প্রতিকূল অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য জনসচেতনতা জরুরি এবং তা প্রাথমিকভাবে। একজন সচেতন মানুষ প্রাথমিকভাবে পারেন নিজেকে সঠিকভাবে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিণ করতে এবং প্রতিকূল অবস্থায় নিজেকে রক্ষা করতে। তাই বোধহয় ‘জনসচেতনতা’ শব্দটির এত বেশি বেশি জনপ্রিয়তা সমাজে।

কিন্তু জনসচেতনতা আসলে কী? সাদামাটা বললে দাঁড়ায়, একটি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করে সেই বিষয়ের ভালোমন্দ দিকটি সম্পর্কে সতর্ক হওয়া বা থাকা, নিজেকে নিরাপদ রাখা। দর্শন শাস্ত্রে বা সমাজবিজ্ঞানে হয়তো এক্ষেত্রে সংজ্ঞার আরো ব্যাপকতা আছে। সেইদিকে আর না যাই। আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে, এমন যুক্তি কিন্তু কেবল পাঠ্যপুস্তক পড়েই মানুষ অর্জন করেন না। বরং মানুষের পোড়ার ইতিহাস, যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতা এখানে জ্ঞান অর্জনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দগ্ধ হয়ে মানুষ মৃত্যুবরণ করেন, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে এই অভিজ্ঞতা মানুষকে আগুনের কাছে যাওয়া থেকে বিরত রাখে, সতর্ক ও সাবধান হতে উদ্বুদ্ধ করে। এটা সোজা হিসেব।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো পোড়ায় জীবন ছাই হওয়া এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ। এই পরিণতিই হলো আগুন থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার সচেতনতা। যা মানুষ না পড়েও দেখে শেখে। আগুন মানুষকে পোড়াতে চাইলেও মানুষের এই সতর্ক অবস্থান তার এই চাওয়াকে বাড়তে দেয় না। ফলে জীবন ঝুঁকির থেকে রক্ষা পায়। এক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক প্রচারপ্রচারণাও বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। যিনি আগুনে পোড়েননি, তিনিও কিন্তু প্রচার-প্রচারণায় সাবধান হতে শেখেন। বলাবাহুল্য যে, এখানে আইনের শাসন নেই। শাস্তির বিধানও নেই। অনুভূতির অবিকল ধারায় সম্ভবত আগুনে পোড়ার পরিণতি ও অভিজ্ঞতা মানুষের জীবনে এক ও অভিন্ন থেকে যায়। কিন্তু যেখানে আইনের শাসন আছে, শাসক আছেন, সেসব ক্ষেত্রে কোন অবস্থার পরিণতি ও তার ধরন-ধারণ ভিন্ন হতে দেখা যায়। কারণ আইনের শাসনটা ব্যক্তি-গোষ্ঠীর দোষে দুষ্টুমুক্ত হতে পারে না। সেসব ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক উদ্যোগ কার্যকর হয়ে উঠতে পারে না।

যেমন, মাদক নির্মূলে জনসচেতনতার কথাই ধরি। মাদক ব্যবসা করে, মাদককে অবৈধভাবে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ করে যারা দিব্যি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, গডফাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন, তারা খুব সহজেই আইনের শাসনের আওতায় আসেন না। অর্থাৎ তাদের বিচার হতে দেখা যায় না, সাধারণত বিচার হয় না। বড় মাদক ব্যবসায়ীদের বিচার না হওয়ার এই পরিণতি বা সংস্কৃতি ছোট ছোট মাদক ব্যবসায়ীর জন্ম দেয়, উৎসাহিত করে। মাদক ব্যবসার অবাধ বিস্তার ঘটে। দেশের গ্রামগঞ্জে, অলিতেগলিতে মাদকের আসক্তি বাড়ে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ ঘটে। অথচ সীমান্তে আমাদের চৌকস সীমান্তরক্ষাকারী বাহিনী আছেন।

তারা কর্তব্যরত থাকাকালীন অবস্থায় মাদকের প্রবেশ যতটা দুঃখজনক তার চাইতেও বেশি উদ্বেগজনক। এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায়ীদের, গডফাদারদের শাস্তি না হওয়ার সংস্কৃতি বা পরিণতি অন্যকে ভীত করে না। আর এই ভীত না হওয়ার সংস্কৃতিই মাদককে নির্মূল করছে না। মাদকবিরোধী অভিযান যদি এসব জায়গায় তৎপর হতো, তাহলে মাদকমুক্ত দেশ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকত।

আবার একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার হিসেবে দেখা যায় যে, ৫৫৭ দিনে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৫,০৬৩ জন। কিছুদিন আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিশুকিশোরদের একটি অভাবনীয় আন্দোলন হয়ে গেল। দেখলাম বিচারপতি থেকে শুরু করে মন্ত্রী, পুলিশ ও সাধারণ মানুষের অনেকেরই বৈধ কাগজপত্র ছাড়া গাড়ি নিয়ে চলাচল করছেন। সবাই লজ্জিত হয়েছেন। সরকার বলেছে, শিশুকিশোরদের নিরাপদ সড়কের দাবি যৌক্তিক এবং তারা একটি খসড়া আইনও পাস করেছে। কিন্তু সড়ক নিরাপদ হয়নি। বাস-ট্রাক চালকদের বেপরোয়া স্বভাব থিতোয়নি। বরং হিংস তা বেড়েছে। কারণ, ঐ একটাই। এই সেক্টরের অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি, হয় না।

শিশু-কিশোরদের আন্দোলনের পর দেখেছি দিনে প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি চালক ও মালিকদের পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র গ্রহণের দীর্ঘ লাইন পড়েছে বিআরটিএতে। তারা স্বীকার করেছেন, এতদিন বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কাগজপত্র ছাড়াই পরিবহন চালিয়েছেন। অথচ রাস্তায় রাস্তায় ট্রাফিক সার্জেন্ট গাড়ির কাগজপত্র চেক করেন। মামলা করেন। অর্থদণ্ড দেন। পরিবহন সেক্টরে মালিক-শ্রমিকদের বেপরোয়া আচরণ অনেকটাই রাজনৈতিক দাপটে সংঘটিত হয়। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, সড়কের সু®ু¤ ব্যবস্থাহীনতা, ট্রাফিক ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা, সড়ক নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বহীনতা ইত্যাদি বহুবিদ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে এবং এসব অপরাধে কঠিন শাস্তি নিশ্চিত হতে দেখা যায় না।

ভীত হয় না সেকারণে মালিক ও চালক। উক্ত দুটি ক্ষেত্রে জনসচেতনতার রূপ কী হতে পারে? মাদক কিংবা সড়ক দুর্ঘটনা নির্মূলে কাকে, কাদের সচেতন বা সতর্ক করা জরুরি, এমন প্রশ্নের উত্তর কিন্তু একটাই। আর তা হলো, যাদের দায়িত্বহীনতা, নৈতিকতার অভাব, অসৎ ও স্বার্থপরতা প্রবল, তাদেরকে শাস্তির আওতায় এনে এমন অপরাধে যেন আর কেউ জড়িয়ে না পড়েন, উৎসাহিত না হোন সেই কাজটি করা এবং তা ত্বরিত গতিতে, স্বচ্ছভাবে, প্রকাশ্যে। অপরাধীরা শাস্তি ভোগ না করলে, অপরাধ নির্মূল হবে না। কখনো কোথাও হয়নি তা। অপরাধের প্রতি সবাইকে ভীত করতে হলে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির থাকতে হবে। আর এই কাজটি হবে আইনের শাসনে। লেখক : প্রাবন্ধিক

মানবকণ্ঠ/এএএম