জঙ্গিবাদ ও প্রকৃতিপ্রেমী

নিজকে পাখিপ্রেমী কিংবা প্রকৃতিপ্রেমী বলে পরিচয় দিতে সংকোচবোধ করছি গত সপ্তাহ থেকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাচরের জঙ্গি প্রশিক্ষণের ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেছি দেশবাসীর সঙ্গে আমিও। বিশেষ করে দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকার ২৯.১১.২০১৭ তারিখের শিরোনাম ‘পাখিপ্রেমীর আড়ালে জঙ্গি প্রশিক্ষণ’ আমাকে বিচলিত করেছে খানিকটা। সংবাদ পাঠে আরো বিচলিত হয়ে পড়ি জঙ্গিদের কূটকৌশল জানতে পেরে। বিষয়টা নিয়ে আমার প্রিয় মানুষদের একজন দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবু বকর চৌধুরী ভাইয়ের সঙ্গে মতবিনিময়ও করি। তিনিও হতবাক হয়েছেন জঙ্গিদের অপকৌশলের সংবাদে। কারণ আমরা দু’জনই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ; পাখিপ্রেমী তো বটেই। পাখ-পাখালি কিংবা প্রকৃতি নিয়ে লেখালেখি করে মানুষকে উৎসাহিত করি প্রকৃতি সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে। অথচ সেই ভালো কাজটিকে কলুষিত করে দিল কি-না জঙ্গিবাদীরা। বিষয়টা জঘন্য! ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে আমাদের। ভাগ্যিস আমাদের আইন শৃঙ্খলাবাহিনী সচেষ্ট ছিল, না হলে আরো বড় ধরনের নাশকতা ঘটার সম্ভাবনা থেকে যেত।

জঙ্গিবাদ নিয়ে ইতিপূর্বেও লিখেছি। তাই হয়তো একই কথা বারবার আসতে পারে। কথাগুলো বারবার আসলেও বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের। কেন বারবার লিখছি? কেন আমাদের সন্তানেরা বিপথগামী হচ্ছে? সেই বিষয়টি আগে মাথায় আনতে হবে এবং বুঝেশুনে তার প্রতিকারও করতে হবে। নিজে প্রতিকার করতে না পারলে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হতে হবে।

প্রথমত বলতে হয়, জঙ্গিবাদ শব্দটা নতুন নয়, তবে এদের কর্মকাণ্ড নতুন করে ধরা দেয় আমাদের কাছে প্রায়ই। অর্থাৎ নতুনরূপে নতুন আইডিয়া নিয়ে জঙ্গিরা কিছু একটা করার বদ্ধপরিকরে গোপনে নাশকতায় অংশ নিয়ে নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে রক্তপাত ঘটিয়ে থাকে। তেমনি একটি নতুন আইডিয়ার প্রমাণ পেলাম আমরা পদ্মার চরের ঘটনায়। এ ধরনের হরেক আইডিয়া জঙ্গিদের মাথায় গিজগিজ করছে, যা দেশের উন্নয়মূলক কোনো কাজে খাটাতে পারে না এই বিপথগামী মানুষগুলো।

জঙ্গিদের মূল উদ্দেশ্যটা কি হতে পারে তা মিশনে অংশগ্রহণকারীদেরও জানার বাইরে থাকে। তারা জানে মিশন সফল করা মানে হচ্ছে স্বর্গপ্রাপ্তি। সফল করতে না পারলেও সমস্যা নেই, অংশগ্রহণ করলেই হবে, এমনটি-ই ওদের ইন্ধনদাতার পরামর্শ। ফলে কিছু তরুণকে প্রলোভনে পড়ে বিপথগামী হওয়ার সংবাদ জানতে পারি আমরা। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি বিত্তশালীদের সন্তানরা এগিয়ে আছে। যাদের অধিকাংশই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তন্মধ্যে যেটি লক্ষণীয় সেটি হচ্ছে এরা বেশিরভাগই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

প্রশ্ন হতে পারে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে গিয়ে তরুণরা কেন জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে? যদিও এ প্রশ্নের সঠিক জবাব আমাদের জানা নেই, তবে ধারণা করা যেতে পারে বিপথগামী হওয়ার অন্যতম কারণগুলো। যেমন: পাবলিক ভার্সিটিগুলোতে রাজনৈতিক চর্চার পাশাপাশি রয়েছে নানাধর্মী বিনোদনের ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীরা অতি ব্যস্ত থাকেন লেখাপড়া, বিনোদন কিংবা ছাত্ররাজনীতি নিয়ে। তাছাড়া পাবলিক ভার্সিটি পড়ুয়ারা এমনিতেই মেধাবী ছাত্র। তার ওপর অধিকাংশ শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকে ভার্সিটি পেরিয়ে দ্রুত কিছু একটা করে পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা। যা লক্ষ্য করা যায় না বেসরকারি ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। তাদের অধিকাংশ অভিভাবকদের রয়েছে অঢেল সম্পদ। ফলে পারিবারিক সচ্ছলতার বিষয় নিয়ে তাদের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন পড়ে না। এরা ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও নিজেরা রাজনৈতিক চর্চা থেকে দূরে থাকেন। কারণ প্রাইভেট ভার্সিটিতে সে ধরনের সুযোগ নেই।

এদের মধ্যে আবার অনেক শিক্ষার্থী আছেন তারা বিভিন্ন কারণে হতাশায় ভুগে থাকেন। সেই কারণগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে বাবা-মায়ের সম্পর্কের অবনতি কিংবা নিজের প্রেমে ব্যর্থতা দেখা দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। সব মিলিয়ে যখন শিক্ষার্থীরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে দিগি¦দিক হারিয়ে ফেলে সেই সুযোগে কাছে ভিড়তে থাকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। খুব কাছে টানতে চেষ্টা করে তখন তারা। বিভিন্ন কৌশল খাটিয়ে এক সময় শিক্ষার্থীটিকে কব্জা করে ফেলেন। ধীরে ধীরে প্ররোচিত করে স্বর্গপ্রাপ্তির লোভ দেখিয়ে একসময় নাশকতা কর্মকাণ্ডে পাঠিয়ে থাকেন, যা ঘটছে সাম্প্রতিক সময়েও।

নব্বই দশক পরবর্তীতে জঙ্গিবাদের বিষয়টি আমাদের গোচরীভূত হয় ব্যাপকভাবে। ইতিপূর্বে শব্দটি মানুষের জানা থাকলেও চাক্ষুষ কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা দেখার সুযোগ হয়নি। নব্বই দশক পরবর্তীতে বিভিন্নরূপে বিভিন্ন নাম ধারণ করে এবং নতুন কৌশলে জঙ্গি সংগঠনগুলো আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। অবশ্য তার প্রতিকারও করছেন আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর লোকজন। বড় ধরনের অনেক নাশকতা থেকে রক্ষা করেছেন তারা দেশবাসীকে। হিম্মত দেখিয়ে জঙ্গিদের মোকাবিলাও করেছেন; প্রাণও বিসর্জন দিয়েছেন কেউ কেউ। সাধুবাদ জানাতে হয় তাই তাদেরকে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক
বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ

মানবকণ্ঠ/এফএইচ