ছোট মন্ত্রিসভায় থাকছেন নবীন-প্রবীণ ২৫ সদস্য!

আগামী অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ সরকারে আওয়ামী লীগ ও জোটের নেতারা মন্ত্রী থাকবেন। যুক্ত হবে কিছু নতুন মুখ, বাদ পড়বেন বিতর্কিত মন্ত্রীরা। জাতীয় পার্টির (এরশাদ) কয়েকজন নতুন মুখ যুক্ত হতে পারেন এ নির্বাচনকালীন সরকারে। এ সরকারে মন্ত্রীর সংখ্যা থাকবে ২৫ জন। একইসঙ্গে ঢেলে সাজানো হচ্ছে প্রশাসন যন্ত্রও। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর ৩ দিন আগে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আগামী নির্বাচনেও একই পদ্ধতিতে এগোচ্ছে সরকার। ডিসেম্বরের মধ্যে (২৭ অথবা ২৮) জাতীয় নির্বাচন হবে সরকারি তরফে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের ৯০ দিন আগে যে কোনো সময় সরকার নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে পারে। সেই হিসেবে অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হবে। যদিও সংবিধানে নির্বাচনকালীন কোনো সরকার নেই।

সূত্র জানায়, সরকার নির্বাচনকালীন যে স্বল্প পরিসরের সরকার গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে- এটা নির্বাচিত এমপিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে, এর প্রধান হবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা ও নির্বাচন কমিশনকে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পন্ন করতে সহায়তা করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার আগামী অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে। ছোট আকারের এ সরকার গঠন অক্টোবরের ১৬ বা ১৮ তারিখে হতে পারে। মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ২১ থেকে ২৫ জন হতে পারে। ২০১৪ সালে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় ২৯ জন সদস্য ছিলেন। এবার সংখ্যা কমাতে চান প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের জোটের মন্ত্রীরা নির্বাচনকালীন সরকারে থাকছেন এমনটা প্রায় নিশ্চিত। দলের বিতর্কিত অনেক মন্ত্রী বাদ যাবেন। স্থান পাবে কিছু নতুন মুখ। তবে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) নির্বাচনকালীন সরকারে কয়েকজনকে নতুন মন্ত্রী করতে চাইছে। এজন্য দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এরশাদ ৫ জনের একটি তালিকা করেছেন। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ ও তার অনুসারী ৫ নেতার একটি তালিকা প্রধানমন্ত্রীর হাতে দেয়ার জন্য তৈরি করে রেখেছেন। এই তালিকায় জি এম কাদেরের নামও রয়েছে। যেহেতু নির্বাচনকালীন সরকারে অনির্বাচিত কাউকে মন্ত্রী করা হবে না, সে কারণে জাতীয় পার্টির সরকারে থাকা মন্ত্রীরা একটু স্বস্তিতে আছেন বলে জানা গেছে। একই কারণে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপি থেকে কাউকে রাখতে পারছে না ক্ষমতাসীনরা।

এ ছাড়া নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের আগেই প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে রদবদলসহ শীর্ষ পর্যায়কেও ঢেলে সাজানো হবে। নির্বাচন কমিশনের অধীনেই নির্বাচন হবে। ওই সরকার শুধু রুটিনমাফিক কাজ করবে এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সব রকম সহায়তা করবে। সেটি প্রশাসন ও দলের নীতি নির্ধারণী মহল থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

নির্বাচনকালীন সরকার গঠন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। যেহেতু নির্বাচনকালীন সরকারকে রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়- সে কারণে মন্ত্রিসভার আকারো ছোট হয়। সেটাও নির্ধারণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকারই নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করবে। মন্ত্রিসভার আকার ছোট বা বড় হতে পারে। এ এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান মন্ত্রিসভায় ৩৩ মন্ত্রী, ১৭ প্রতিমন্ত্রী ও ২ জন উপমন্ত্রী রয়েছেন। মন্ত্রী মর্যাদায় ৫ জন উপদেষ্টা রয়েছেন। মোট ৫৭ জন।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারের ছোট আকারের মন্ত্রিসভায় দক্ষ মন্ত্রীদের জায়গা দিচ্ছেন। একইসঙ্গে অসুস্থ, হাই প্রোফাইলের বিতর্কিত ও নেতিবাচক ভাবমূর্তির মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে নির্বাচনের আগেই চমক দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকারে মন্ত্রী হিসেবে থাকতে পারেন- অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ. ক. ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়র হোমেন মঞ্জু, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসনাত মাহমুদ চৌধুরী, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম মেহের আফরোজ চুমকি, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। বাকিরা বাদ পড়তে পারেন বলে জানা গেছে।

যেসব মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে সরকারকে বিভিন্ন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে তাদের নির্বাচনকালীন সরকারে রাখা হচ্ছে না। এই তালিকায় আছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, ভূমিমন্ত্রী, ধর্ম বিষয়কমন্ত্রী।

এদিকে নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রয়েছে দুই মেরুতে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর বিএনপি বলছে, তারা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবেন না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নয়, সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে।

২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রাখা হয়। সে অনুযায়ী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ছিল। তবে ওই সরকারকে একটি সর্বদলীয় সরকারের রূপ দেয়া হয়েছিল জাতীয় পার্টি ও অন্য আরো দু’একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে। বিএনপিকে ওই সরকারে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দলটি সাড়া দেয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ও সংবিধান অনুসারে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হচ্ছে। সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রিসভার প্রধান থাকবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সরকার গঠন প্রক্রিয়া শুরুর কার্যক্রমও আওয়ামী লীগই করবে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিরাই এ সরকারের অংশ হবেন এ সিদ্ধান্তে এখনো অনড় সরকার।

সূত্রমতে, সংবিধানে সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুই ধরনের বিধান রয়েছে। এর একটি হচ্ছে চলমান সংসদের মেয়াদ অবসানের ক্ষেত্রে এবং অন্যটি মেয়াদ পূর্তির আগেই সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে- (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে, এবং (খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।’

সংবিধানের এই বিধান অনুসারে, বর্তমান দশম সংসদের মেয়াদ পূর্ণ করলে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে যে কোনো দিন ভোট হতে হবে। ১২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বোতভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।’

সম্প্রতি ১৪ দলের এক সভা শেষে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই হবে। এ সময় মন্ত্রিসভার আকার ছোট থাকবে। সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক শ. ম. রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার গঠন প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। এ সরকারকে নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু আইনে কোথাও নির্বাচনকালীন সরকারের অস্তিত্ব নেই। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে স্বল্প পরিসরে মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার চর্চা করতে গিয়ে কতজন সদস্য রাখবেন বা কবে গঠন করবেন তা আইনে সুনির্দিষ্ট না হলেও তফসিল ঘোষণার পূর্ব মুহূর্তে গঠন করাটাই দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। সংবিধানের ৫৫ ও ৫৬ ধারায় প্রধানমন্ত্রীকে এ অধিকার দেয়া আছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হলে ওই সরকার রুটিনমাফিক দায়িত্ব পালন এবং নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচনে সার্বিক সহায়তা করবে। সংবিধানের ১২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যেরূপ কর্মচারীর প্রয়োজন হইবে, নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে সেইরূপ কর্মচারী প্রদানের ব্যবস্থা করিবেন।’ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাহী বিভাগের সহযোগিতার বিষয়ে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’

মানবকণ্ঠ/এএএএম