ছোটদের ব্যাংক হিসাবে জমা এক হাজার ৪১৯ কোটি টাকা

ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ী হয়ে উঠছে দেশের স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের চালু করা স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের জনপ্রিয়তাও অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এতে প্রতিদিনই বাড়ছে স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় খোলা হিসাব সংখ্যা ও সঞ্চয় স্থিতি।

৭ বছরের ব্যবধানে ১৫ লাখেরও বেশি ছাড়িয়েছে স্কুল ব্যাংকিংয়ের হিসাব সংখ্যা। একই সময়ে সঞ্চয় স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে ছোট ছোট শিশুরাও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে সঞ্চয় প্রবণতা। যাদের সঞ্চয় প্রবণতা যত বেশি তাদের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। তারা বলেন, স্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থীদের জমানো টাকা বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ হচ্ছে। যা দেশের উন্নয়ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে তাদেরও বড় অবদান রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৮ সালের জুন প্রান্তিক শেষে স্কুল ব্যাংকিংয়ের হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩৬টি। যা গত মার্চ শেষে ছিল ১৪ লাখ ৬১ হাজার ৮৬০টি। তিন মাসে অ্যাকাউন্ট বেড়েছে প্রায় ১ লাখ। স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ। ফলে ব্যাংকগুলোতে এই কার্যক্রমের আওতায় খোলা হিসাবের পাশাপাশি আমানতের পরিমাণও অব্যাহতভাবে বাড়ছে। জুন পর্যন্ত স্কুল শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ব্যাংকে ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা জমিয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসা শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি সুদহার পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

স্কুল শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং সুবিধা ও তথ্য প্রযুক্তিগত সেবার সঙ্গে পরিচিত করানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের ২ নভেম্বর স্কুল ব্যাংকিং বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি করে। এরপর থেকেই স্কুল পড়ুয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আকর্ষণীয় মুনাফার নানা স্কিম চালু করে। ২০১০ সালে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সাল থেকে। প্রথম বছরে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয় ২৯ হাজার ৮০টি। দেড় লাখ স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে সময় লাগে আড়াই বছর।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় দেশের ব্যাংকগুলোয় মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৭টি হিসাব খোলা হয়। ওই সময় হিসাবগুলোয় মোট স্থিতি ছিল ৯৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষে ১২ লাখ ৫৭ হাজার ৩৭০টি হিসাবের বিপরীতে জমাকৃত সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ২০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২০১৩ সালে ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৫ হাজার ৮০৩টি। ওই সময় স্থিতির পরিমাণ ছিল ৩০৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১৪ সাল শেষে স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৫০ হাজার ৩০৩টি। আর হিসাব স্থিতির পরিমাণ ছিল ৭১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ক্ষুদে সঞ্চয়ীদের হিসাবে জমা পড়ে ৮৪৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আর সর্বশেষ ২০১৮ সালের জুন প্রান্তিক শেষে স্কুল ব্যাংকিংয়ের হিসাব সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩৬টি। আর আমানত স্থিতির পরিমাণ ১ হাজার ৪১৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

স্কুল ব্যাংকিংয়ের অগ্রগতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক আবুল বশর মানবকণ্ঠকে বলেন, স্কুলগামী শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম খুবই ভালোভাবে এগোচ্ছে। এতে সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকের অংশগ্রহণ সন্তোষজনক। শিক্ষার্থীরাও ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যাংকিং কার্যক্রমের সুফল ভোগ করে আনন্দিত। তিনি জানান, স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংককে সঙ্গে নিয়ে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে ‘স্কুল ব্যাংকিং কনফারেন্স’ সম্পন্ন করেছে। আগামীতেও এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। তিনি আরো বলেন, দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ স্কুলের ছাত্রছাত্রী। স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সঞ্চয়ের অভ্যাস ছেলেমেয়েদের মনে এনে দেবে আর্থিক শৃঙ্খলা, যা তাদের সুশৃঙ্খল জীবন গঠনেও সহায়ক হবে। এসব হিসাবকে বীমার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

স্কুল ব্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণ করা রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী শব্দ সকাল জানান, আমার মা আমার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছেন। যা আমার জন্য অনেক উৎসাহব্যঞ্জক এবং আনন্দদায়ক ঘটনা ছিল। এখন থেকে আমি নিয়মিত ওই অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করি এবং নিজের জমানো টাকা দিয়ে বাবা-মাসহ বন্ধুবান্ধদের জš§দিনে উপহার কিনে দেই। এটি আমার জন্য খুবই মজার একটি অভিজ্ঞতা। তিনি আরো বলেন, আমার অ্যাকাউন্ট থাকায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা আমি সেখানে জমিয়ে রাখি।

জানা গেছে, স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় হিসাব খোলা ও পরিচালনা করা খুবই সহজ। ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির আগ্রহী ছাত্রছাত্রীরা তাদের বাবা-মা অথবা বৈধ অভিভাবকের সঙ্গে যৌথ নামে হিসাব খুলতে পারে। মাত্র ১০০ টাকা প্রাথমিক জমা দিয়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ব্যাংকের শাখায় এ হিসাব খোলা যায়। এ হিসাবে কোনো ফি বা চার্জ আরোপ করা হয় না। এমনকি ন্যূনতম স্থিতি রাখার বাধ্যবাধকতাও নেই। স্কুল শিক্ষার্থীদের হিসাব থেকে বেতন-ফি পরিশোধও হচ্ছে। যেসব ব্যাংকে ইন্টারনেট ব্যাংকিং আছে, অভিভাবকরা সেসব ব্যাংকে অনলাইনেই এসব হিসাব থেকে বেতন-ফি পরিশোধ করতে পারছেন।

এটিএম কার্ডেও এটা পরিশোধ করা যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে অভিভাবকদের স্কুলে বেতন-ফি দিতে হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের ব্যাংকে শিক্ষার্থীদের হিসাব ও টাকা জমার পরিমাণ অনেক কম। ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা পিছিয়ে রয়েছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের ব্যাংক শাখার মাধ্যমে খোলা স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের তুলনায় শহরাঞ্চলের ব্যাংক শাখার মাধ্যমে খোলা স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা প্রায় ৫৭.৭৩ শতাংশ বেশি।

ব্যাংকে জমার ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলের জমার পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। এ বছরের জুন পর্যন্ত ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯৩ জন স্কুলছাত্র তাদের ব্যাংক হিসাবে ৭৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা জমিয়েছে। আর ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩ জন স্কুলছাত্রী জমিয়েছে ৬৪৩ কোটি ৭ লাখ টাকা। জুন পর্যন্ত গ্রামের ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৪৪৮ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন ব্যাংকে ৩২৯ কোটি টাকা জমা রেখেছে। শহরের ৯ লাখ ৪২ হাজার ৩৮৮ জন শিক্ষার্থী জমা করেছে ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই এগিয়ে রয়েছে। স্কুল ব্যাংকিংয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।

এর পরেই রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড। আর আমানত বা সঞ্চয় স্থিতির দিক থেকে শীর্ষ অবস্থান ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের। এর পরেই রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক লিমিটেড।

মানবকণ্ঠ/এএএম