ছুটির দিনের বইমেলা

বাঙালির ভাষা, সাংস্কৃতি বোধ ও ঐতিহ্য হলো অমর একুশে বইমেলার মূল ভিত্তি। লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকদের কাছে অমর একুশে বইমেলা এক সেরা উৎসব। তাই তো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বইমেলা প্রাঙ্গণে বসে কবি, সাহিত্যিক, লেখক, বই আর সংস্কৃতিপ্রেমীদের মিলনমেলা। এবারের মেলার ৮ম দিন গতকাল শুক্রবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। তাই দিনের শুরুটা ছিল ছোটদের জন্য। আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা কমিটি এ সময়টিকে ঘোষণা করেছে ‘শিশু প্রহর’ হিসেবে। নামটা হয়েছে ষোলোআনা সার্থক। দিনের শুরুতে মেলা সত্যিই অন্য রকম ছিল ক্ষুদে পাঠকদের কারণে। বড়দের ভিড় ও ধাক্কাধাক্কি নেই। মা-বাবার হাত ধরে মনের খুশিতে শিশুদের ঘুরে বেড়ানো। বায়না ধরে দুই হাত ভর্তি করে বই কেনা আর অভিভাবকদের হাত ধরে নিশ্চিন্তে-নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ায় শিশুরা।

বিকেলে ঠিক উল্টো চিত্র। অবশ্য গ্রন্থমেলার ছুটির দিনগুলোতে যেমন বরাবর হয়, যা প্রত্যাশা থাকে, তার ব্যতিক্রম হয়নি। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। বড় প্যাভিলিয়ন থেকে শুরু করে ছোটছোট স্টল সর্বত্রই বইপ্রেমীদের ঢল। সকলেই বইয়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে বের হচ্ছেন। আর এমন একটি দিনের অপেক্ষায় ছিলেন প্রকাশক ও লেখকরা। অবশেষে সে দিন ধরা দেয়ায় খুশির ঝলক ছুটেছে পুরো মেলাজুড়ে।

অন্যদিন বিকেল ৩টায় শুরু হলেও শুক্রবার ছুটির দিনে মেলা শুরু হয় সকাল ১১টা থেকে। কিন্তু লোক সমাগমে একটুও কমতি ছিল না প্রথম থেকেই। সকাল ১১টায় শিশুদের জন্য শুরু হলেও মূল মেলাও পিছিয়ে ছিল না এ সময় থেকে। কিন্তু দুপুর তিনটা বাজলে চারিদিক থেকে মিছিল আকারে মানুষ আসতে শুরু করে। ঘণ্টা পেরুতেই পুরো মেলা প্রাঙ্গণ এক বিশাল মানব মেলায় রূপ নেয়। আর সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ মেলায় হাঁটাই দায় হয়ে যায়। বড় প্যাভিলিয়নগুলোর সামনে বইপ্রেমীদের এতটাই ভিড় জমে যে স্টলের বিক্রয় কর্মীরা হাপিয়ে উঠতে থাকেন। তাই বলে ক্ষান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ ছিলনা।

শুক্রবারের বাড়তি ভিড়ের কথা মাথায় রেখে একাডেমি কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতিটাও এ দিন ছিল একটু বেশি। সকাল ১১টায় এবং বিকেল তিনটার আগে দুইবার পানি ছিটানো হয় ধুলা ওড়া বন্ধ করার জন্য। তবে তাতেও কোনো কাজ হয়নি। মানুষের চাপে পানি ছিটানোর এক ঘণ্টার মধ্যেই আবারো উড়তে শুরু করে ধুলো। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষও তাই নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার অপ্রয়োজনীয় কোনো চেষ্টাই করেনি। তারাও জানিয়েছে মানুষের চাপ সামলাতে তারা সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

গতকাল যেসব স্টলগুলোর সামনে সবচেয়ে বেশি ভিড় জমেছিল তার মধ্যে প্রথম সারিতে ছিল তাম্রলিপি প্রকাশনা। এর প্রকাশক এ কে তরিকুল ইসলাম রনি মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘এমন দিনের জন্যই আমরা অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে প্রত্যাশিত পাঠক এসেছে। আমরাও খুশি। কারণ বিক্রি অনেক ভালো। যে প্রকাশক লেখক পাঠকের চাহিদা মাথায় রেখে বই বিনির্মাণের কাজ করেন তাদের বই বিক্রি না হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
পাঠকের উপছে পড়া ভিড় জমে থাকা আরেক পাবলিকেশন্স ইত্যাদি। এর প্রকাশক আদিত্য অন্তর মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আজ মনটা অনেক ভালো। আর এর কারণটাও সবার জানা। আমাদের প্রত্যাশিত মতো পাঠক আসছেন, কিনছেন। এটিই তো আমাদের সারা বছরের প্রত্যাশা থাকে। তবে আগামী শুক্রবার আরো জমবে। কারণ সে সময় বাণিজ্যমেলা থাকবে না।’

কথাসাহিত্যিক আহমেদ মোস্তফা কামাল মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘এটা প্রত্যাশিত ছিল। লেখক প্রকাশকসহ প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট সকলেই এমন দিনের প্রত্যাশায় থাকে। আর সে দিন আসায় খুশিও বাধ ভাঙা।’

গাজীপুর থেকে বই কিনতে শুক্রবার মেলায় এসেছিলেন তরিকুল হাসান। তিনি বলেন, আজ ছুটির দিন। অন্যদিন সময় পাই না। ফলে স্ত্রী-বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আর আসা হয় কিনা বলতে পারি না। সকাল ১১টায় এসেছি। দুপুরে একবার বের হয়েছিলাম। তিনটায় আবার এসেছি। থাকব রাত নয়টা পর্যন্ত। তারপর একবারে বাড়ি যাব।’

তরিকুলের মতো অনেকেই এদিন ঢাকার বাইরে থেকে মেলায় এসেছিলেন। তারাও ফিরেছেন হাতভরা বইয়ের ব্যাগ নিয়ে। তবে লেখক, প্রকাশক এমনকি পাঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে আগামী শুক্রবার হবে এবারের মেলার শ্রেষ্ঠ শুক্রবার। আর এর কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, গতকাল শুক্রবার ছিল বাণিজ্যমেলার শেষ দিন। অন্যদিকে এদিন বিপিএলেরও ফাইনাল ম্যাচ থাকায় তারও কিছুটা প্রভাব ছিল। তবে আগামী শুক্রবার এসবের কোনো কিছুই থাকবে না। ফলে মেলা জমবে বিস্তর।

শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা: অমর একুশে উদ্যাপনের অংশ হিসেবে সকাল সাড়ে ৮টায় গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী আবুল বারক্ আলভী। এতে ক-শাখায় ৪০৬, খ-শাখায় ৩৪৭ এবং গ-শাখায় ১৫৭ জন সর্বমোট ৯১০ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেন। আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার প্রদান করা হবে।
স্বেচ্ছায় রক্তদানের রেকর্ড: মেলার প্রবেশ পথে গত চার ফ্রেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ পুলিশের নেতৃত্বে পুলিশ ব্লাড ব্যাংকের উদ্যোগে চলছে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। এখানে গতকাল শুক্রবার রেকর্ড শতাধিক লোক স্বেচ্ছায় রক্ত প্রদান করেছেন। পুলিশের ব্লাড ব্যাঙ্ক শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই এ কে এম সিদ্দিকুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, এবারে আজই সবচেয়ে বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় রক্ত প্রদান করেছে। এটা অত্যন্ত আনন্দের খবর যে মানুষ স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে উৎসাহিত হচ্ছে।

লেখক বলছি কর্নার: প্রথমবারের মতো এ বছর ভালো মানের ৫ জন লেখককে ২০ মিনিট করে নিজের বই নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে মেলা আয়োজক কর্তৃপক্ষ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেক পাড়ে ‘লেখক বলছি’ কর্নারের এ আয়োজনে গতকাল শুক্রবার নিজেদের সাহিত্যকর্ম বিষয়ে আলাপনে অংশ নেন নাসরীন জাহান (এসেছি সূর্যাস্ত থেকে), মিনার মনসুর (আমার আজব ঘোড়া), রফিকুর রশিদ (ওরা সবাই যুদ্ধে গেল), আহমাদ মোস্তফা কামাল (নিরুদ্দেশ যাত্রা) এবং দ্রাবিড় সৈকত (বিকস্বর কুত্রাপি)।

মোড়ক উন্মোচন: বিগত বছরের মতো এবারো মেলায় রয়েছে মোড়ক উন্মোচন কর্নার। প্রতিদিনই অনেক বই আসলেও মোড়ক উন্মোচনন করান গুটি কয়েক লেখন। তবে যারা এ কর্নারে এসে মোড়ক উন্মোচন করাচ্ছেন তাদের বক্তব্য শুনে অনেক পাঠক আগ্রহী হচ্ছেন সে সব বই কিনতে। আর এ কারণে মোড়ক উন্মোচনের আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। গতকাল ৪৯ টিসহ এখন পর্যন্ত মোট ৯৩টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। গতকাল ছিল মেলায় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের রেকর্ড।

নতুন বই: গতকাল শুক্রবার এবারের মেলায় সর্বাধিক সংখ্যক বই এসেছে। এদিন মোট ২৬৩টি নতুন বই এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমির জনসংযোগ অফিস। এর মধ্যে গল্প ৩৪টি, উপন্যাস ৩৩টি, প্রবন্ধ ১৯টি, কবিতা ৮৩টি, গবেষণা ৩টি, ছড়া ৭টি, শিশুসাহিত্য ১৩টি, জীবনী ১১টি, মুক্তযুদ্ধ বিষয়ক ৬টি, নাটক ১টি, বিজ্ঞান বিষয়ক ৫টি, ভ্রমণ বিষয়ক ৫, ইতিহাস বিষয়ক ৩টি, রাজনীতি ৩টি, স্বাস্থ্য বিষয়ক ২টি, রম্য ৪টি, সায়েন্স ফিকশন ২টি, ধর্মীয় ৩টি, কম্পিউটার ৩টি, অভিধান ১টি, অনুবাদ ১টি এবং অন্যান্য ২১টিসহ মোট ২৬৩ টি নতুন বই এসেছে।

উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রিয়া প্রকাশনী এনেছে আলী ইমামের ছোটগল্প ‘গল্পগুলো বারো দেশের’, জনতা প্রকাশনী এনেছে সৈয়দ শামসুল হকের শিশুতোষ গল্প ‘কলম ও নৌকার গল্প’, ভাষা প্রকাশ এনেছে যতীন সরকারের প্রবন্ধ ‘সংস্কৃতি ভাবনা’, কথা প্রকাশ এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের কিশোরগল্প ‘কলাপাতা ও লাল জবা ফুল’, সময় প্রকাশন এনেছে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর সাহিত্য ‘এক ডজন একজনে’, কবি প্রকাশনী এনেছে আবুল হাসানের কবিতার বই ‘প্রেমের কবিতা সমগ্র’, পাঠক সমাবেশ এনেছে সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘নির্বাচিত সহজিয়া কড়চা’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. এনেছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতার বই ‘ঈহা’, বিদ্যা প্রকাশ এনেছে মোহিত কামালের উপন্যাস ‘লুইপার কালসাপ’, চন্দ্রবতী একাডেমি এনেছে আনিসুজ্জামানের ‘স্মরণ ও বরণ’।

মূল মঞ্চের আয়োজন: বিকেল ৪ টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘চিত্রশিল্পী পরিতোষ সেন: জš§শতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবুল মনসুর। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মতলুব আলী এবং সৈয়দ আবুল মকসুদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রফিকুন নবী।

আলোচনা সভায় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন কবি অঞ্জনা সাহা এবং রনজু রাইম। আবৃত্তি পরিবেশন করেন মীর বরকত। সঞ্জয় রায়ের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘গীতিসত্র’ এবং ফারহানা চৌধুরীর পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন: ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা)’ নৃত্যশিল্পীবৃন্দ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনা করেন।

আজকের আয়োজন: আজ অমর একুশে গ্রন্থমেলার নবম দিন। মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে মেলার শিশুপ্রহর। সকাল ১০ টায় একাডেমি প্রাঙ্গণে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন ও শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে লেখক অনুবাদক ‘আবদুল হক: জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি শীর্ষক’ আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সৈয়দ আজিজুল হক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন অজয় দাশগুপ্ত, সোহরাব হাসান এবং আহমাদ মাযহার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সুব্রত বড়ুয়া। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মানবকণ্ঠ/এএম