ছুটছে ঘরমুখো মানুষ

ঘরে ফেরা মানুষের চাপ বাড়তে শুরু হয়েছে, ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক পথেও। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ফেরার উদ্দেশে বের হওয়া মানুষের ভিড় কয়েকগুণ বেড়েছে। ঈদযাত্রার তৃতীয় দিন গতকাল মঙ্গলবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে দিনের প্রথম ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেসের মাধ্যমে ঈদ যাত্রার চলাচল শুরু হয়। অথচ প্রথম ট্রেনই বিলম্বে ছাড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সুন্দরবন এক্সপ্রেস দেরিতে ছাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।

মিজানুর রহমান নামে খুলনাগামী এক যাত্রী বলেন, সেহরি খেয়ে স্টেশনে এসেছি, অথচ ট্রেন ছাড়তে দেরি। সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও ৩০ মিনিট দেরিতে ৬টা ৫৯ মিনিটে কমলাপুর স্টেশন ছেড়েছে। খুলনা থেকে সুন্দরবন ট্রেন আসতে দেরি করায় ট্রেন ছাড়তে আধাঘণ্টা দেরি হয়েছে বলে জানান ট্রেনের অ্যাটেন্ডেন্স মনির হোসেন। দিনের অন্য ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ে ছেড়েছে বলে জানিয়ে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ঈদকে সামনে রেখে প্রতিদিন ট্রেনে প্রায় ৭০ হাজার যাত্রী ঢাকা ছাড়ছেন। মঙ্গলবার যাত্রীদের জন্য ৩২টি আন্তঃনগর ট্রেন এবং ৩৪টি মেইল ও লোকাল ট্রেনের ব্যবস্থা ছিল।

যাত্রীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের যাত্রা নিরাপদ করতে কমলাপুরে গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), রেলওয়ে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা নিয়োজিত আছেন। তিনি বলেন, অন্যান্য দিনে যাত্রী কিছুটা কম হলেও মঙ্গলবার ৭০ হাজার যাত্রী ট্রেনে ঢাকা ছেড়েছেন। বুধবার থেকে আরো বেশি যাত্রীর ঢাকা ছাড়ার বিষয়টি মাথায় রেখে বুধবার থেকে ট্রেনবহরে আরো পাঁচটি ট্রেন যোগ হবে।

মঙ্গলবার দিনের প্রথম ট্রেন সুন্দরবন ৩০ মিনিট দেরিতে ছাড়লেও অন্যান্য ট্রেন ছাড়ছে সময় মতোই। এতে খুশি যাত্রীরা। রেহানা নামে মহানগর প্রভাতি ট্রেনের এক যাত্রী বলেন, অনেক কষ্টের পর ট্রেনের টিকিট মিলেছে। ট্রেন সময় মতো ছাড়ায় ভালো লাগছে, কম সময়ের মধ্যেই পরিবারের কাছে ফিরতে পারব।

রাজধানীর কল্যাণপুর ও গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে মানুষ বাসে বাড়ি যাওয়ার জন্য টার্মিনালমুখী হয়েছে সকাল থেকেই। একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার অফিস শেষে বুধবার থেকে বেশিরভাগ মানুষ বাড়ি ফিরবে। আবার অনেকে অর্ধেক বেলা অফিস করে রওনা দিয়েছে গতকালই।

বাসের টিকিট বিক্রেতারা জানান, অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় মানুষের চাপ কম। যেহেতু টিকিট আগে থেকে কাটা, তাই মানুষ যথাসময়ে আসছে এবং বাসে উঠে যাচ্ছে। এমনকি বাসও পূর্ব নির্ধারিত সময়ে ছাড়ছে। এ ছাড়া গাবতলী-কল্যাণপুর এলাকার রাস্তায় কোনো যানজটও নেই। তবে বরিশাল, যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা রুটের বাসগুলোকে আরিচা ফেরিঘাটে দীর্ঘ সময় ধরে যানজটে ভুগতে হওয়ায় বাস আসতে দেরি হচ্ছে ও কিছু বাস ছাড়তে দেরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ পরিবহনগুলো বিকল্প ব্যবস্থা বা অন্য বাস রেডি রাখছে। কেননা ফেরিঘাটের সমস্যা দীর্ঘদিন। কিন্তু উত্তরবঙ্গ রুটের বাসগুলোর ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা যায়নি।

ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী গোল্ডেন লাইন পরিবহনের গাবতলী কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতা আজিজুল বলেন, যাত্রীদের চাপ বাড়লে আজ থেকেই আমাদের অতিরিক্ত বাস চলাচল শুরু হতো। কিন্তু আমাদের অগ্রিম টিকিটেরই দুই একটা করে সিট খালি আছে। তবে রাতের বাসগুলোতে খালি নেই। বুধবার থেকে যাত্রীরা আসা শুরু করবে। তখন আমরা অতিরিক্ত বাস সার্ভিস চালু করব। তবে বরাবরের মতো আমরা ফেরিঘাটের জ্যামের ব্যাপারে চিন্তায় আছি। যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা রুটের পরিবহনগুলোর এই দুশ্চিন্তা থাকলেও উত্তরবঙ্গের বাসগুলোর ক্ষেত্রে ফেরিঘাটের দুরবস্থার চিন্তা না থাকলেও চন্দ্রার পর থেকে টাঙ্গাইল হয়ে যমুনা সেতুর আগ পর্যন্ত জ্যাম হবে কি না সে ব্যাপারে চিন্তিত থাকতে দেখা গেছে।

কল্যাণপুর ও গাবতলী এলাকায় বাসের কাউন্টারগুলোর পাশে মিরপুরের দারুস সালাম থানার অন্তর্গত কন্ট্রোল রুম ও ওয়াচ টাওয়ার দেখা গেছে। যেখানে মেট্রোপলিটন পুলিশ সদস্যরা অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা রোধ, বাসের টিকিটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় মনিটরিং এবং ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। যার কারণে এই এলাকায় যানজট লক্ষ্য করা যায়নি। দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সেলিমুজ্জামান বলেন, গাবতলীতে আমাদের কন্ট্রোল রুম ও ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। আর কল্যাণপুরে কন্ট্রোল রুম। আমরা ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। তাই যানজট নেই, থাকবেও না আশা করি। এ ছাড়া নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ছাড় নেই।

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধান নদী বন্দর সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলমুখী নৌযানগুলোতে স্বাভাবিক অবস্থা থেকে মাত্রাতিরিক্ত সব ধরনের চাপ সামাল দিতে প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকা নদী বন্দর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ঈদ যাত্রা নিশ্চিত করতে এখন পর্যন্ত একাধিক সভা করে কর্ম পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এসব সভায় স্বয়ং নৌমন্ত্রীও একাধিকবার উপস্থিত থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন না করতে। প্রয়োজনে যাত্রীদের একাধিক দিনে গন্তব্যে পৌঁছানোর দিকে মনোযোগ দিতে বলেছেন মন্ত্রী। বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠিত এসব সভা থেকে নৌযান মালিক, পুলিশ, র‌্যাব, বিআইডব্লিওটিএ, ঢাকা জেলা পরিষদ ও ঢাকা নদী বন্দরের প্রতিনিধি নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সকল পদক্ষেপ কিংবা যে কোনো আদেশ সবার মেনে চলার প্রতি কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

ঢাকা নদী বন্দর ও বিআইডব্লিওটিএর একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নৌপথে ঈদ যাত্রায় সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সামগ্রিক কাজকে সহজর করতে যাবতীয় কাজকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর এক অংশে থাকছে যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তা এবং অন্য অংশে থাকছে নৌযান চলাচল, যাত্রী ওঠানো এবং নৌযান ছেড়ে যাওয়া।
ঈদের সময় টার্মিনালে অতিরিক্ত যাত্রীর প্রবেশ ও টার্মিনালে অবস্থানের সময় যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে ২৫০ জন নৌ-পুলিশ, ১৫০ জন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), র‌্যাবের আট জন করে ১৬ জনের দুটি টিম, বিএনসিসি ক্যাডেটদের ৬০ জন সদস্য, ডিপিডিসি ৩৬ জন সদস্য কাজ করবে।

এ ছাড়া সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সামলাতে কাজ করবে র‌্যাব, ডিএমপি ও নৌ-পুলিশ। যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করবে তারা। অধিক যাত্রী পরিবহনের স্বার্থে ঈদের আগে চলাচল করা সকল লঞ্চের যাতায়াত একমুখী করা হবে অর্থাৎ প্রতিটি লঞ্চ একবার ঢাকা থেকে ছেড়ে যাবে এবং তা গন্তব্যে পৌঁছার পর মাত্র ৩০ মিনিটের যাত্রা বিরতি শেষে ফের ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসবে। ফলে কার্যত কিছু লঞ্চ বেশি পাবে যাত্রীরা এবং লঞ্চগুলোও বেশি যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।

ঈদের আগে এবং পরে বন্দরের সার্বিক দিক ও যাত্রী নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম-পরিচালক (ট্রাফিক) আলমগীর কবির বলেন, ঈদে আমাদের অবশ্যই অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করতে হবে। কারণ ঈদে ২০-৩০ লাখ মানুষ হয় কিন্তু আমাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন লঞ্চের সংখ্যা ২০৯ এবং বিআইডব্লিওটিএ এর ছয়টি। এ দিয়ে কোনোভাবেই এত বিশাল যাত্রী স্বাভাবিকভাবে পরিবহন সম্ভব নয়। তাই আমরা বেশ কয়েকটি করণীয় ঠিক করেছি। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী হলেও তা যেন স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে সেদিকে আমরা খেয়াল রাখব। প্রতিটি লঞ্চকে ওয়ান ওয়েতে কনভার্ট করে ঢাকা থেকে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত করা হবে। এতে আমাদের লঞ্চ সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে এবং অধিক যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে।

মানবকণ্ঠ/এএএম

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.