চীন-ভারতের দ্বন্দ্ব আলোচনার টেবিলে সমাধান হোক

প্রাচীনকালে মধ্যচীন থেকে পারস্য তুরস্ক হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত একটা বাণিজ্য পথ ছিল। এ পথে চীনের তৈরি রেশম বস্ত্র ইউরোপ পর্যন্ত যেত। এ পথটাকে বলা হতো সিল্ক রোড। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাজাখস্থান সফরের সময় ঘোষণা করেছিলেন যে, চীন এ রোডটার পরিকাঠামো নতুনভাবে গড়ে তুলে পুনঃজীবিত করতে চায়। চীনের প্রাচীনকালে নৌ-বাণিজ্য সম্প্রসারিত ছিল মালয়েশিয়া পর্যন্ত। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, চীন তার এ মেরিটাইম রোডটাও পুনঃস্থাপন করতে উৎসাহী। পরবর্তী সময়ে চীন তার এ পরিকল্পনাটা ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পেশ করে।

গত ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে বিষয়টা নিয়ে আলোচনার জন্য চীন বিশ্বনেতাদের একটা বৈঠক ডেকেছিল। বৈঠকে ২৯টি সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ ১০০টি দেশের প্রতিনিধিরা যোগদান করেছিলেন। বিশ্বনেতারা এ বিষয়টা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা করেছেন। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে স্থল ও নৌপথের সংযোগ কাঠামো দিয়ে পরিবেষ্টিত করে ফেলবে যাতে ৬৫টি দেশ এ সংযোগ কাঠামোর আওতায় আসবে। এ ৬৫টি দেশে বিশ্বের ৬০ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। চীন বৈঠকে বিরাট অঙ্কের অর্থবরাদ্দের কথাও ঘোষণা দিয়েছে। চীন বলেছে, এ পরিকাঠামোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য বহু দেশকে তার অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো সংস্কার করতে হবে চীন সেখানেও অর্থের জোগান দেবে।

ভারত চীনের এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের পরিকল্পনাকে বাণিজ্যের ছদ্মাবরণে কোনো সুদূরপ্রসারী চীনা দুরভিসন্ধি বলে মনে করেছে কিনা জানি না। তবে তারা বেইজিংয়ের এ বৈঠকে যোগদান করেনি। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শিল্প বাণিজ্যের কথা শুনলেই উন্মাদ হয়ে ওঠেন। আর আমরা ভারতীয় টিভির টকশোতে দেখেছি ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরাও ভারতকে এ প্রকল্পে অংশগ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু যোগদান না করে বরঞ্চ উল্টো ভারত তার প্রাচীন মেরিটাইম বাণিজ্যের পথটা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে দিয়েছে। প্রাচীনকালে ভারতীয় বণিকেরা জাভা, সুমাত্রা হয়ে চীন পর্যন্ত সুতি বস্ত্র ও রঞ্জনদ্রব্যের ব্যবসা করত। সে যুগে ভারতীয়রা পাকা রং তৈরি করতে জানত। ভারতীয়দের তৈরি রঞ্জনদ্রব্য দিয়ে কাপড় রাঙালে ‘কাপড় ছিঁড়ে যাবে তবে রং উঠবে না’ এমন এক সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ইস্পাতের ব্যবহারও রপ্ত করেছিল ভারতীয়রা। তারা ইস্পাতের সুনিপুণ অস্ত্র তৈরি করতে পেরেছিল। পারস্যে আলেকজান্ডারের অনেক অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল আর এগুলো নাকি ভারতীয় কারিগরদের দ্বারা তৈরি।

চীন ও ভারত যখন উদ্যোগী হয়ে ব্রিকস ব্যাংক গঠন করল তখন আমরা প্রতিবেশীরা উৎফুল্ল হয়েছিলাম এই ভেবে যে, সম্ভবত তারা কলোনিয়েল লিগেসি পরিত্যাগ করতে সফল হয়েছে। সুপ্রাচীনকাল থেকে চীন আর ভারত এ দুই প্রাচীন সভ্যতার মাঝে হৃদ্যতা ছিল। কথিত আছে চীনের এক রাজা স্বপ্নে দেখেছিলেন দক্ষিণ দিক থেকে এক আলোকোজ্জ্বল মূর্তি চীনের দিকে আসছে আর এ স্বপ্ন দেখার পর রাজা এ আলোকোজ্জ্বল মূর্তিটির সন্ধানে লোক পাঠিয়েছিলেন ভারতে। তারা ভারত থেকে বুদ্ধের মূর্তি ও বুদ্ধের পুস্তকাদি নিয়ে গিয়েছিল চীনে। সে জন্য দেখা যায় চীনের কনফুসিয়াস মতবাদের পাশে বুদ্ধের মতবাদও স্থান করে নিয়েছিল। বাংলাদেশের সোনারগাঁয়ের অতীশ দ্বীপঙ্কর যাকে বুদ্ধ সাহিত্য দ্বিতীয় বুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছে, তিনি তার জীবন কাটিয়েছেন চীন দেশে।

প্রাচীনকালের এ বুদ্ধ ধর্মীয় যাজকের সমাধি মন্দিরও চীনে। সে মন্দির থেকে বাংলাদেশ সরকার তার চিতাভস্ম বাংলাদেশে এনেছিল। সযত্নে চীনারা তার চিতাভস্ম সংরক্ষণ করে রেখেছিল। সেই যে ভারত আর চীনের মাঝে সু-সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল তা শতাব্দীর পর শতাব্দী অব্যাহত ছিল। যখন ইংরেজরা অহফিয়ামের ব্যবসা করে চীন জাতিকে ছারখার করে দিচ্ছিল তখন ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় পত্রিকা বেঙ্গল স্পেকটেটর, হিন্দু পেট্রিয়ট, সোম প্রকাশ, অমৃতবাজার পত্রিকা, সুলভ সমাচার, ন্যাশনাল পেপার ও সাধারণী পত্রিকা তার বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেছিল। সাধারণীর এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন-‘যে অহিফেনই শ্রীরাম লক্ষ্মণের সন্তানগণকে নির্বীর্য করিয়াছে সেই অহিফেনই চীন দিগের সর্বনাশ করিতেছে।’ আফিং এর যুদ্ধের সময় যখন ইংরেজ রণতরী ও ফরাসি রণতরী চীন উপকূলে অবস্থান নিয়েছিল তখন সোম প্রকাশ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে মন্তব্য লিখেছিলেন, ‘চীনের স্বাধীনতা সংশয় দোলায় আরূঢ় হইয়াছে।’ চীন আর জাপানের মধ্যে ফরমোসা দ্বীপকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ বাধার সম্ভাবনা দেখা দিলে অমৃতবাজার পত্রিকা তার সম্পাদকীয়তে লিখেছিল; ‘চীন ও জাপানের সম্রাটগণ কি নির্বোধ। তাহাদের বুকের ওপর শত্রুমণ্ডিত দণ্ডায়মান রহিয়াছে। এমন অবস্থায় তাহারা আপনারা কাটাকাটি করিয়া মরিলে কয়দিন আর তাহাদের রাজ্য স্বাধীন থাকিবে।’

চীনের চীন রাজবংশ, হান রাজবংশ, চাউ রাজবংশ, সুঙ রাজবংশ কত রাজবংশের ইতিহাস পড়েছি। চীনের শাসনবিধি রচিত হয়েছিল কনফুসিয়াসের আদর্শবাদের ওপর ভিত্তি করে। তাই দেখা যায় চীনের সম্রাটেরা কখনো নিষ্ঠুর ছিলেন না। তারা ছিলেন শান্তিবাদী। খ্রিস্টের জন্মের আগে প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যগুলোর মাঝে রোম আর চীন সাম্রাজ্যই ছিল বড় সাম্রাজ্য। ইতিহাস যদিওবা রোমকে ‘স সাগরা পৃথিবীর অধিশ্বরী’ বলে আখ্যায়িত করেছিল কিন্তু চীন সাম্রাজ্য কখনো রোমের চেয়ে বড় ভিন্ন ছোট ছিল না। বড় চীন কখনো কারো উদ্বেগের কারণ হয়নি। ভারত ও চীন দুই হাজার বছর পাশাপাশি নিরুপদ্রব বসবাস করেছে। গত শতাব্দীর পাঁচ দশকে চীনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। মাও সে তুং-এর নেতৃত্বে বস্তুবাদীরা বিপ্লব করেছে। তাতে পুরনো মূল্যবোধেরও পরিবর্তন এসেছে।

১৯৬২ সালে চীন অহেতুক ভারত আক্রমণ করে ডিব্রুগড় পর্যন্ত অধিকার করে নিয়েছিল। আবার তাৎক্ষণিক অধিকার ছেড়ে দিয়ে চলেও গিয়েছিল। ১৯৬২ সাল থেকে ভারত সামরিক প্রস্তুতিতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। এখন চীন যেমন আণবিক শক্তির অধিকারী ভারতও তার আণবিক শক্তি গড়ে তুলেছে। আবার ভারতের আরেক প্রতিবেশী পাকিস্তানেরও আণবিক বোমা রয়েছে। ভারতের সঙ্গে চীন পাকিস্তান কারো ভালো সম্পর্ক নেই। তাতে করে দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার এই তিন দেশ চীন-ভারত-পাকিস্তান এক সর্বনাশা বিপদের মাঝে পথ চলছে।

গত ৭ জুলাই বঙ্গোপসাগরে আমেরিকা, ভারত আর জাপানের নৌ-মহড়া শুরু হয়। শেষ ১৭ জুলাই। চীনের সাব-মেরিন নাকি তার আনাগোনা ভারত মহাসাগরে বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার ভারত ঘোষণা দিয়েছে, চীনের যে কোনো স্থানে আঘাত করার মতো ক্ষেপণাস্ত্র তারা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। পুতিন একটা সুন্দর কথা কয়দিন আগে বলেছেন- আণবিক যুদ্ধ যদি আরম্ভ হয় তাহলে কোন পক্ষ জিতল তা দেখার জন্য কোনো পক্ষই আর জীবিত থাকবে না।

চীন ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড করে ভারতকে ঘিরে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে বলে ভারত মনে করছে। যে সিল্ক রোড পশ্চিম চীন থেকে পাকিস্তানের গোয়াধর পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে তা প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। গোয়াধরে বন্দরও নির্মাণ করা হয়েছে এবং এ বন্দরে চীন নৌঘাঁটি স্থাপন করে ভারতকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে। শ্রীলঙ্কায়ও চীন নতুন বন্দর ও নৌঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। ভারত পাল্টা চীনের পার্শ্ববর্তী দেশ ভিয়েতনামের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র মরিশাসে ভারত নৌঘাঁটি স্থাপন করছে এবং মরিশাস থেকে দুইটি দ্বীপ কিনে নিচ্ছে যেখানে আরো নৌঘাঁটি স্থাপন করা হবে। সিসিলিতেও তারা নৌঘাঁটি স্থাপন করতে সামরিক চুক্তি সম্পাদন করেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীন ভারতের সমর প্রস্তুতিতে খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে ভারত ও চীনের পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট দেশ। কারণ ভারত ও চীন উভয়ের হাতে মনরো ডকট্রিন রয়েছে। আমার প্রতিবেশী আমার কথার বাইরে যেতে পারবে না, আমার ভালোমন্দ সব কাজের সহযোগী হয়ে থাকতে হবে। এই হচ্ছে মনরো ডকট্রিনের মর্মকথা। বৃহত্তম এই দুই প্রতিবেশীর দ্বন্দ্বের কারণে প্রতিবেশী ছোট দেশগুলোর জন্য বহু অদৃশ্য বাধা তাদের সম্মুখে উপস্থিত হচ্ছে যা তাদের উন্নয়নকে ব্যাহত করবে। তাই ছোট দেশগুলো চায় এই বৃহৎ দেশ দুটি শান্তিপূর্ণ আলোচনার মধ্য দিয়ে তাদের সমস্যা সমাধান করুক।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
bakthiaruddinchoudhury@gmail.com

মানবকণ্ঠ/এসএস