চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

আজ ১০ আগস্ট, বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট তৎকালীন মহকুমা শহর নড়াইলের চিত্রা নদীর পাশে মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম মো. মেছের আলী এবং মাতার নাম মাজু বিবি। বাবা-মা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া। বাবা ছিলেন দরিদ্র রাজমিস্ত্রী। শিল্পী সুলতানের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নড়াইল জেলা প্রশাসন ও এসএম সুলতান ফাউন্ডেশন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে শিল্পীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কোরানখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অন্যতম ।

এসএম সুলতান ১৯৪১ সালে সুলতান কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র হয়েও তিনি কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বাসায় থেকে কলেজে পড়াশোনার সুযোগ পান। কয়েক বছর পর একঘেঁয়েমি শিক্ষা জীবন তাকে দুর্বিসহ করে তোলে।

এরপর ১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এক বছর পর ১৯৪৪ সালে শিক্ষা জীবনের ইতি টেনে শুরু করলেন বোহেমিয়ান জীবনের। চলে গেলেন কাশ্মির। সেখানে উপজাতিদের সঙ্গে শুরু করেন বসবাস। ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। সেসময় হার্ডসন নামে এক কানাডিয়ান মহিলার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। তার সহযোগিতায় ১৯৪৬ সালে কাশ্মিরের সিমলায় তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়।

দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি কাশ্মির ছেড়ে লাহোরে চলে যান। সেসময় শিল্পী ও পণ্ডিত নাগী চুগড়তাই, শাকের আলী, শেখ আহম্মদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে তার। ১৯৪৮ সালে লাহোরে ও ১৯৪৯ সালে করাচির ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের চিত্র প্রদর্শনীতেত তিনি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।

শিল্পী সুলতান ১৯৫০ সালে নিউইয়র্কে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে ব্রকলিন ইনস্টিটিউট অব আর্ট প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের পক্ষে অংশ নিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ইউরোপ, আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় ২০টি প্রদর্শনীতে অংশ নেন তিনি।

১৯৫৩ সালে তিনি ফের দেশে ফিরে আসেন। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি কোনো প্রদর্শনী করতে পারেননি। তবে ১৯৭৬ সালে ঢাকায় তার একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

এই ২২টি বছর তিনি নড়াইলের পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি ছাত্রছাত্রীদের ছবি আঁকায় উদ্বুদ্ধ করেছেন।

পাশাপাশি নিজ গ্রামে নন্দনকানন প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, ফাইন আর্ট স্কুল, ১৯৬৯ সালে নড়াইল শহরের কুড়িগ্রামে ফাইন আর্ট স্কুল এবং স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালে যশোরে একাডেমি অব ফাইন আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যশোরের ফাইন আর্ট স্কুলটি পরে চারুপীঠ নামে পরিবর্তন করা হয় এবং কুড়িগ্রামের ফাইন আর্ট ইনস্টিটিউটের নাম পরিবর্তন করে শিশুস্বর্গ নামকরণ করা হয়।

জীবনের শেষ ক’টা দিন তিনি তার প্রিয় মাতৃভূমি নড়াইলেই বসবাস করেন তার প্রিয় পশুপাখি ও ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে। হেয়ালী শিল্পী শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের শিশুস্বর্গ।

১৯৮৩ সালে প্রথম তিনি সরকারের সহযোগিতা পান। সরকারি সহযোগিতায় নড়াইল শহরের কুড়িগ্রামে চিত্রা নদীর পাড়ে ২ বিঘা জমিতে তার বাসভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নড়াইলের মাটি, প্রকৃতি আর মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে জীবনের শেষ ক’টা দিন অতিবাহিত করেন।

কালোত্তীর্ণ এই শিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্সিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন।

১৯৯৪ সালের এই দিনে শিল্পী সুলতান তার অগণিত ভক্তদের কাঁদিয়ে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাকে চিত্রা নদীর পাড়ে সবুজ-শ্যামল ছায়াঘেরা বাড়ির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

শিল্পী সুলতানের মৃত্যুর পর তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নড়াইলবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সুলতানের বসতবাড়ি সংলগ্ন ২ একর ৫৭ শতক জমিতে ২০০১ সালের জুলাই মাসে শিশুস্বর্গ ও ‘সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা’ নির্মাণ শুরু হয়। ২০০৩ সালের জুলাই মাসে নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

স্মৃতি সংগ্রহশালায় শিল্পীর আঁকা বেশ কিছু দুর্লভ ছবি ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র রয়েছে। শিল্পীর জীবদ্দশায় ভাসমান শিশুস্বর্গটি (নৌকা) বর্তমানে ডাঙ্গায় তুলে রাখা হয়েছে। সেটি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদেও জন্য এসএম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার পাশেই চিত্রা নদীতে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি দর্শনীয় সিঁড়ি ঘাট। এখান থেকে দর্শনার্থীরা চিত্রা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ ও নৌকায় চিত্রা নদীতে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।

জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, শিল্পী সুলতানের স্মৃতি সংরক্ষণ, স্মৃতি সংগ্রহশালাকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের চিন্তা-ভাবনা চলছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস