চিকিৎসা, মামলাসহ বহুবিধ খরচের ধাক্কায় বিপর্যস্ত বেবির পরিবার

সামান্য দুটি ডাবের হিসাব না মেলায় প্রথমে গৃহকর্মী রহিমা আক্তার বেবিকে নির্যাতন এবং এরপর সাততলা থেকে ফেলে দেয়ার ঘটনার পর খুবই খারাপ সময় পার করছে বেবি ও তার পরিবার। মামলা পরিচালনার জন্য সহায়তা দিতে কোনো মানবাধিকার সংগঠন পাশে দাঁড়ায়নি বেবির। বড় ধরনের কোনো আর্থিক সাহায্য নিয়েও এ পরিবারটির পাশে দাঁড়ায়নি কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তি বা সংগঠন। ঢাকা মেডিকেলের ওয়ার্ডে থাকায় চিকিৎসক, নার্সের সেবা সহায়তা পেলেও এক্স-রে, অপারেশনসহ বিভিন্ন খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বেবির পরিবার। গতকাল শনিবার বেবির সঙ্গে দেখা করতে গেলে নিজেদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বেবির মা মাসুমা বেগম।

তিনি বলেন, একে মেয়ের চিকিৎসার জন্য এত খরচ, আবার তার মামলা চালানোর জন্য খরচ- কেউ আমাদের পাশে নেই। এভাবে কিভাবে সব দিক সামাল দেব। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাদের কষ্ট দেখে পাশে দাঁড়ান তাহলে মেয়েটার চিকিৎসা ভালো হবে।

বেবির ভাই শুক্কুর আলী জানান, প্রথমে আশা করেছিলাম কোনো মানবাধিকার সংগঠন আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। কেউ না আসায় পরে অ্যাডভোকেট বিশ্বনাথ ঘোষকে (বিশ্বজিৎ) মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছি। এই অ্যাডভোকেটকে অনেক ভালো মানুষ বলেই মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ন্যায়বিচার পাইয়ে দেবেন।

গতকাল বেবি জানান, আগের চেয়ে তিনি ভালো অনুভব করছেন। ডাক্তার বলেছে তার পেছনের হাড় ভেঙে গেছে। এর জন্য অপারেশন লাগবে। এর জন্য ৫০-৬০ হাজার টাকা লাগতে পারে।

শুক্কুর আলী জানান, গণমাধ্যমে সাহায্য চেয়ে দেয়া তার বিকাশ নম্বরে এ পর্যন্ত ৬ হাজার টাকা এসেছে। এ টাকা দিয়েই চলছে বেবির চিকিৎসা।

বেবির মা বলেন, আমার মেয়ের যে এ অবস্থা করেছে ওই লোক তো এখন জেলে। তার স্ত্রী (নিজেও সেদিন মারধরের শিকার হয়) ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এখানে এসেছিলেন। তারা বলেছেন, আপনার মেয়েকে ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব। আমি রাজি হইনি। এখন বলেন, আমাদের কাছে কিছু টাকা নিয়ে মেয়ের চিকিৎসা করেন। আমি বলেছি, এখন কোনো টাকা নেব না। মামলা চলছে, কোর্ট থেকে বিচারের রায়ে যদি টাকা দিতে বলে তখন নেব।

বেবির মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার হাসিখুশি সুন্দর মেয়ে। যারা তার এই অবস্থা করল তাদের কোনো শাস্তি হবে না? এ দেশে কি খালি টাকারই দাম? মানুষের কোনো দাম নাই?

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, যেহেতু এই ঘটনাটা সবাই জানে। এই ঘটনা মিডিয়াতে এসেছে। তাই এই মামলার বিচার আদালত দ্রুত করবে। এ প্রসঙ্গে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহবাগ থানার পুলিশ কর্মকর্তা জাফর ইকবাল বলেন, এই ভিকটিম (বেবি) এবং ঘটনার অন্য আরেকজন ভিকটিমের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। ভিকটিম এখনো চিকিৎসাধীন আছে। তার আরো ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা লাগবে। তদন্ত রিপোর্টে ডাক্তারের বক্তব্যের ব্যাপার আছে।

কেউ যদি বেবিকে সাহায্য করতে চান তাহলে অর্থ পাঠাতে পারেন বেবির ভাই শুক্কুর আলীর বিকাশ নম্বর-০১৭৪১৭৭৫৫৩৩-এ।

১৬ জুন পরীবাগের ৩ নম্বর রোডের ১৬তলা দিগন্ত টাওয়ারের সালেহ আহমেদের বাসায় কাজ নেয় বেবি। বাসায় ১৫-২০টি ডাব এনে রেখেছিলেন গৃহকর্তা। সেখানে ২টি ডাব কম থাকায় উত্তেজিত হয়ে ওঠেন তিনি। তিনি এ জন্য বেবিকে দোষারোপ করে তাকে মারধর করতে থাকেন। একপর্যায়ে ৭তলার বারান্দা থেকে বেবিকে নিচে ফেলে দেন। এ সময় অন্য এক গৃহকর্মী এবং গৃহকর্ত্রীকেও মারধর করেন ওই গৃহকর্তা। পরে, ওই বাসার দারোয়ান ও কেয়ারটেকার ফোনে বেবির স্বজন এবং পুলিশকে ঘটনাটি জানান। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার সময় সালেহ আহম্মেদ মাতাল অবস্থায় ছিলেন বলে বেবি তার স্বজনদের জানিয়েছেন। বর্তমানে ওই গৃহকর্তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে র‌্যাব তার বিলাসবহুল গাড়িটিও জব্দ করেছে।

বেবি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার আধাখোলা গ্রামের বাবুল হাওলাদার ও মাসুমা বেগমের মেয়ে। বেবির স্বামী অনেক আগেই তাকে ছেড়ে গেছে। আছে দুই সন্তান মিরাজ ও মুনিয়া। ঝালকাঠির একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে মুনিয়া। ছেলে ঢাকাতেই একটি কারখানায় কাজ করে। ছেলে ও মা তার সঙ্গে থাকে। একমাত্র ভাই শুক্কুর ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করে।

মানবকণ্ঠ/এসএস