চিকিৎসায় ব্যর্থতা

সারাদেশের বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এ ব্যবস্থা যেন সরকারের নিয়ন্ত্রণের প্রায় বাইরে চলে গেছে। পুরো ব্যবস্থায় এখন চলছে মালিক, চিকিৎসকের স্বেচ্ছাচার ও চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারণা। স্বাস্থ্যসেবা পরিণত হয়েছে লাভজনক ব্যবসায়। দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক। শতকরা ৯০ ভাগ অপ্রয়োজনীয় ও ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে ওইসব হাসপাতাল-ক্লিনিকের চিকিৎসা সেবা। এ ধরনের হাসপাতাল-ক্লিনিকের কারণেই চিকিৎসা সেবায় ব্যার্থতার হার বাড়ছে। এসব ব্যর্থতার কয়েকটি নি¤েœ উল্লেখ করা হলো-
১। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার আলগিরচর গ্রামের প্রবাসী আউয়াল হোসেনের স্ত্রী খাদিজা আক্তার। সন্তান সম্ভবা খাদিজার আল্ট্রাসনো করে ডাক্তার বলেছেন যমজ সন্তান রয়েছে তার। ভর্তি করা হয় স্থানীয় গৌরীপুরের লাইফ কেয়ার নামের ক্লিনিকে। সন্তান ভূমিষ্টে গত ১৮ সেপ্টেম্বর করা হয় অস্ত্রোপচার। জš§ নেয় খাদিজার একটি কন্যা সন্তান। অপর বাচ্চা গর্ভে রেখেই করা হয় সেলাই। এরপর খাদিজা অসুস্থ হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুনরায় গত ২৫ অক্টোবর করা হয় জরুরি অস্ত্রোপচার। অস্ত্রোপচারে তার গর্ভ থেকে আবারো জš§ নেয় মৃত ছেলে সন্তান। এরপর খাদিজাকে পোস্ট অপারেটিভে রাখা হয়।
২। রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক প্রসূতির অস্ত্রোপচারের সময় গর্ভের ভেতর থাকা নবজাতকের মাথা কেটে গেছে। এতে ওই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর শাখায় গত ২৭ অক্টোবর এ ঘটনা ঘটে। চিকিৎসকের অদক্ষতার কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করছেন মৃত ওই কন্যা শিশুর স্বজনরা।
৩। তানিয়ার হাতের মেহেদীর রং না শুকাতেই ভুল চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়। গত ৩ নভেম্বর নাটোরের গুরুদাসপুরের নাজিরপুর বাজারের আনোয়ার হোসেন ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে। জানা যায়, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক আমিনুল ইসলাম সোহেলের ভাই আমিরুল ইসলাম সাগর ব্যথা উপশমসহ তিনটি ইনজেকশন দেয়ার পর পরই তানিয়া মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। রাতেই পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নাটোর পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় প্রভাবশালীদের চাপে থানা পুলিশের সহায়তায় একলাখ টাকায় আপস করেছে নিহতের পরিবার।
৪। ঘুষের টাকা ছিল না অন্তঃসত্ত্বা পারভীনের (২৬) কাছে। তাই হাসপাতালে ভর্তি না করে তাড়িয়ে দেয় কর্মচারীরা। ফলে চিকিৎসা পাননি অন্তঃসত্ত্বা পারভীন। পরে হাসপাতালের কম্পাউন্ডে সন্তান প্রসব করেন। জšে§র দু-তিন মিনিটের মধ্যে মারা যায় নবজাতক। রাজধানীর আজিমপুরের মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে (মেটার্নিটি) গত ১৭ অক্টোবর এ ঘটনা ঘটে।
৫। ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন শিরীন আক্তার নামের এক নারী কনস্টেবল। কুমিল্লার ভিশন হসপিটাল প্রাইভেট লিমিটেডে বচ্চা প্রসব করাতে গিয়ে দুটি কিডনিই হারিয়েছন তিনি। গত ১৭ মে প্রসব বেদনা উঠলে তাকে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার ভিশন হাসপাতালে চিকিৎসক সিজার করার সময় ভুল করে কিডনির সঙ্গে যুক্ত দুটি রগ কেটে ফেলেছেন। এ কারণে শিরীনের দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। তিন মাসেরও অধিক সময় ধরে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এই নারী কনস্টেবল। এ ঘটনায় শিরীনের বাবা আবু জাহের বাদী হয়ে কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
৬। হয়েছিল ডেঙ্গু জ্বর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা করিয়েছেন ব্লাড ক্যান্সারের। অতঃপর মৃত্যু হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আফিয়া জাহানের। এমন অভিযোগ করেছেন তার সহপাঠীরা। ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৮ মে রাজধানীর গ্রিন রোডের সেন্ট্রাল হাসপাতালে।
৭। ভুল চিকিৎসায় টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতি উপজেলার ভাটি তাহিরপুর গ্রামের মহসিন মিয়ার স্ত্রী গৃহবধূ লাকী আক্তারের গত ২৮ জুলাই মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, ২৫ জুলাই লাকি আক্তার উপজেলার মধ্যবাজারের সোনিয়া ডায়গনস্টিক অ্যান্ড ডক্টরস চেম্বারসের চিকিৎসক মো. মনির হোসেনের কাছ থেকে শারীরিক অসুস্থতার জন্য ব্যবস্থাপত্র নেন। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ সেবনের পর অবস্থার অবনতি হলে ২৮ জুলাই শুক্রবার ফের চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করেন। ফের ব্যবস্থাপত্রে অতিরিক্ত ওষুধ লিখে দেন মনির হোসেন। এসব ওষুধ সেবনের পর সন্ধ্যায় লাকী আক্তারের মৃত্যু হয়। গণরোষ ঠেকাতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে মো. মনির হোসেন নামে কথিত চিকিৎসককে আটক করেছে পুলিশ।