চা চাষে ১৪ বছর আগের স্বপ্ন পূরণ!

চা চাষে ১৪ বছর আগের স্বপ্ন পূরণ!

‘১৪ বছর আগে হুনছিলাম আমগর পাহাড়ে চা গাছের বাগান হইবো। কিন্তু কেউ চা চারা আনে নাই। ফনিক্স সাহেব আনছে। আমরা চা গাছের চারা লাগাইছি। এহন গাছও হইছে, গাছে পাতাও আইছে। চায়ের আবাদ হবো এই পাহাড়ে, এইটা হুনার পর থ্যাইকাই স্বপ্ন ছিল চা চারা লাগানোর। আমার চা চারা লাগানোর স্বপ্ন পূরণ হইছে। এহন শুধু চা পাতা বেচার ট্যাহা খাওনের অপেক্ষায় আছি।’ পাহাড়ে চা চাষের স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই মনের অভিব্যক্তি তুলে ধরেন শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গান্ধীগাঁও গ্রামের কৃষক আজিমুল হক আজমত।

সূত্র জানায়, ভারত সীমানা ঘেঁষা শেরপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে চা চাষের সম্ভাব্যতা উঁকি দেয়ায় বাংলাদেশ চা বোর্ড এবং চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল ২০০৪ সালে জরিপ চালায়। পরে জেলার ঝিনাইগাতীর ১ হাজার ৮৫৬ একর, নালিতাবাড়ীর ২ হাজার ৫শ’ একর ও শ্রীবরদী উপজেলায় ১ হাজার ১৫১ একর জমি চা চাষের উপযোগী বলে ঘোষণা করে। পরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জমি, অর্থায়ন, উদ্যোক্তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা আর গড়ে ওঠেনি। প্রায় ১৪ বছর পর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ‘গারো হিলস টি কোম্পানি’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ওই তিনটি উপজেলার ক্ষুদ্র চাষীদের মাধ্যমে ২৭টি প্রদর্শনী বাগানের জন্য ২৭ হাজার চা চারা বিতরণ কার্যক্রম করা হয়।

গারো হিলস টি কোম্পানি সূত্র জানায়, এ অঞ্চলে বন্যহাতির আক্রমণ ও মাটির ধরনের কারণে পাহাড়ি এলাকার জমিতে নিয়মিত ফসলের আবাদ তেমন হতো না। তাই নানা অসুবিধার কারণে চাষিরা ফসল চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিলেন। চা চাষ তাদের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। চা চাষ শুরুর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে নতুন নতুন কৃষক চা চাষের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ফলে এ কোম্পানি পঞ্চগড় থেকে চা গাছের কাটিং এনে প্রায় দুই লাখ চারা উত্পাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। আর এসব চারা রোপণ করা হবে প্রায় ১০৬ বিঘা জমিতে।

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) সাবেক সহকারী অধীক্ষক এম এ খালেক জানান, এ অঞ্চলে চা চাষাবাদের জন্য জমির মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার সময় আমি বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে ছিলাম। এখানকার মাটি, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও অন্য পরিবেশগত অবস্থা চা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বড় বিনিয়োগ ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখানেও চা শিল্পের ব্যাপক প্রসার হবে।

উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মি. নবেশ খকসি বলেন, গারো পাহাড়ে বন্যহাতির আক্রমণে ফসলাদি যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এ জন্য এ এলাকার চাষি ভাইয়েরা ফসল ঘরে তুলতে পারে না। এখন চা চাষ শুরু হওয়ায় আদিবাসীরা চা চাষ করতে আগ্রহী হয়েছেন।

গারো হিলস টি কোম্পানির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসাইন ফনিক্স বলেন, এ অঞ্চলের মাটি চা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তাই ক্ষুদ্র চাষিদের মাধ্যমে ২৭টি প্রদর্শনী বাগানে ২৭ হাজার চা চারা পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা হয়েছে। ওই গাছগুলোতে পাতা আসতে শুরু করেছে। তা দেখে এখন অনেক আদিবাসী ও বাঙালি কৃষক আগ্রহী হয়েছেন চা চাষে।

তিনি আরো বলেন, আমরা বিশ্বাস করি চা চাষের মাধ্যমে যে চা উত্পাদন হবে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি গজনী অবকাশ পর্যটন কেন্দ্রে আগত দর্শনার্থীরা চা বাগানের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হবেন।

বিগত দিনে বন্যহাতির আক্রমণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের ফসল ও প্রাণহানি ঘটার কারণে এ জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর এক বিশেষ পরিচিত রয়েছে। সেই পাহাড়ি জনপদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্তায় চা চাষের মাধ্যমে নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। সবুজ পাতায় সৌন্দর্য বৃদ্ধির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন ঝিনাইগাতী উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাদশা।

মানবকণ্ঠ/এসএস