চমক থাকছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে

চমক থাকছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ইশতেহারে সংবিধানে সংশোধনী, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ করার ঘোষণাসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার বিভাগ, বাকস্বাধীনতা, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে খাতভিত্তিক চমক রয়েছে। প্রধান্য দেয়া হয়েছে দেশের বৃহৎ তরুণ প্রজন্মকে। ইশতেহারে তারুণ্যের চিন্তার প্রতিফলন ঘটবে বলে মানবকণ্ঠকে জানালেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। জনগণের মতামত নিতে শিগগিরই খসড়াটি বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ওয়েবসাইটে দেয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একটি সূত্র।

‘এগিয়ে যাব একসঙ্গে, ভোট দেব ধানের শীষে’ এই স্লোগান আর ঐকমত্য, সবার অংশগ্রহণ এবং প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে সরকার পরিচালনার অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনী খসড়া ইশতেহার তৈরি করেছে ইশতেহার কমিটি। আগামী দু’একদিনের মধ্যে ইশতেহারে চূড়ান্ত খসড়া স্টিয়ারিং কমিটির কাছে পাঠাবে। স্টিয়ারিং কমিটির শীর্ষ নেতাদের সম্মতির পর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার- এমনটি জানালেন ইশতেহার কমিটির অন্যতম সদস্য সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ। তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, এখনো চূড়ান্ত হয়নি ইশতেহার। আমরা দু’একদিনের মধ্যে ইশতেহার চূড়ান্ত করব। ইশতেহার কমিটিতে ঐক্যফ্রন্টের সব শরিক দলের প্রতিনিধি আছেন। প্রত্যেকের প্রস্তাব সামনে রেখেই ইশতেহার তৈরি হচ্ছে। ইশতেহার গতানুগতিক হবে না। অনেক চমক থাকবে ইশতেহারে। আগামী ৮ ডিসেম্বর ইশতেহারটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

ঐক্যফ্রন্টের সূত্র জানায়, ক্ষমতায় গেলে একই ব্যক্তি যাতে পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন, সে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এ ছাড়া নিম্ন আদালত পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের অধীন করা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে এমপির ভেটো ক্ষমতা প্রদান, নির্বাচনকালীন সরকারের বিধান তৈরি ও নির্বাচনে বিজয়ী ও পরাজিত সব দলের জন্য রাষ্ট্রের মালিকানা নিশ্চিত করার আশ্বাসসহ বড় ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকছে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে। বিষয়টি অবশ্যই খোলাশা করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। গত শনিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে প্রয়োজনে সংবিধানে সংশোধনী এনে ঘাটতি দূর করব।’

ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি প্রধান্য দেয়া হয়েছে দেশের সোয়া দুই কোটি তরুণ প্রজন্মকে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের তরুণদের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর যে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। শহরে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দিয়ে পরিবহন নীতি প্রণয়ন করা হবে বলেও উল্লেখ রয়েছে নির্বাচনী ইশতেহারে।

সোয়া দুই কোটি তরুণ ভোটারের মন জয় করতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বড় পরিকল্পনা নিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। পুলিশ ও সামরিক বাহিনী ছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের কোনো বয়সসীমা রাখবে না তারা। অনগ্রসর জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা চালু করা হবে। ত্রিশোর্ধ্ব শিক্ষিত বেকারের জন্য বেকার ভাতা চালু করা হবে। তিন বছরের মধ্যে সব সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে।

পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষা বাতিলের প্রতিশ্রুতিও থাকছে নির্বাচনী ইশতেহারে। এ ছাড়াও সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়া হবে। প্রথম বছর থেকেই ডাকসুসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত, বেসরকারি শিক্ষা পুরোপুরি ভ্যাটমুক্ত এবং মাদরাসার শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থান করা হবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির ইশতেহারে তারুণ্যের চিন্তার প্রতিফলন ঘটবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। সোমবার বিকেলে তিনি নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান। এর আগে বিএনপি কার্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন নেতাদের কাছ থেকে তারুণ্যের ইশতেহার ভাবনা গ্রহণ করেন রিজভী।

রিজভী বলেন, এই ইশতেহারের যতটুকু পড়েছি তাতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন-২০৩০-এর প্রতিফলন ঘটেছে। আজকে গণতন্ত্র সঙ্কুচিত। তাই এই তারুণ্য দীপ্তদের শক্তির স্ফূরণ ঘটাতে হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ তাদের মতামত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তুলে ধরছে।

খসড়া ইশতেহারে আরো বলা হয়েছে, মুঠোফোনে ইন্টারনেটের খরচ কমিয়ে অর্ধেক করা হবে। দেশের বিভিন্ন গণজমায়েতের স্থানে ওয়াইফাই ফ্রি করে দেয়া হবে। সংখ্যালঘুদের জন্য মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। দেশের দারিদ্র্যপ্রবণ জেলাগুলোতে শিল্পায়নের লক্ষ্যে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র এবং অন্য সব সরঞ্জাম কেনা হবে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অন্য বিদেশি সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা হবে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট ইউনিট-ব্যবহারকারীদের বিদ্যুতের দাম অন্তত ৫ বছর না বাড়ানো।

নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে- মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ক্ষমতায় এলে তারা বাতিল করবে নিরাপত্তা আইন। সরকারি পদক্ষেপ এবং সরকারের পদধারীদের বিরুদ্ধে সমালোচনা, এমনকি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপেরও অধিকার থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব গণমাধ্যমের ওপর কোনো রকম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, পুলিশি নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ করবে ঐক্যফ্রন্ট। ইশতেহারে তারা বলেছে, রিমান্ডের নামে পুলিশি হেফাজতে যে কোনো প্রকার শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করা হবে। এর মধ্যে নাগরিক নিরাপত্তার বিধান করতে জোর প্রতিশ্রুতি থাকবে। যেমন, সাদা পোশাকে কাউকে গ্রেফতার করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিল, মামলাজট কমাতে উচ্চআদালতের ছুটি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকবে। বিপথগামী রাজনৈতিক কর্মীদের হাত থেকেও নাগরিকরা সুরক্ষিত থাকবে।

ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে এবং সংবিধান নির্দেশিত সব দায়িত্ব পালনে ন্যায়পালকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা থাকছে ইশতেহারে। খসড়ায় বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হবে। দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা গ্রেফতারে সরকারের অনুমতির বিধান (সরকারি চাকরি আইন-২০১৮) বাতিল করা হবে। ব্যাংকিং খাতে ও শেয়ারবাজারে লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কৃষক-শ্রমিকদের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে। উল্লেখ করা হয়েছে, ক্ষমতায় গেলে সব খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং গার্মেন্টসসহ অন্য সব শিল্প এলাকায় শ্রমিকদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে আবাসনের ব্যবস্থা, কৃষি ভর্তুকি বাড়িয়ে সার বীজ ও অন্য কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা হবে।

অতিদরিদ্র ও দুস্থদের জন্য বিনা মূল্যে খাদ্য বিতরণ এবং বিনা মূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। বয়স্ক ভাতা, দুস্থ মহিলা ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তাদের ভাতার পরিমাণ এবং আওতা বাড়ানো হবে। শ্রমিক-খেতমজুরসহ গ্রাম ও শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুলভ মূল্যে রেশনিং চালু করা হবে। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন ন্যূনতম ১২ হাজার টাকা, কৃষকের যৌক্তিক মুনাফা অর্জনে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকবে ইশতেহারে।

দায়িত্বপ্রাপ্তির এক বছরের মধ্যে মানুষকে ভেজাল ও রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকছে ইশতেহারে।

নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করা হয়েছে ইশতেহারের খসড়ায়। বলা হয়েছে, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রথার পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীর জন্য বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মনোনয়নের বিধান করা হবে। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে। ইউরোপ, জাপানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শ্রমশক্তির রফতানির জন্য নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করা হবে।

ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে. বাতিল করা হবে হাওড়ের ইজারা। চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে হাওড়-অঞ্চলে মানুষেরা ইজারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

ইশতেহারে শেয়ারবাজার-ব্যাংক সেক্টরের লুটপাট, জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি যুক্ত করার প্রস্তাব খসড়ায় থাকলেও চূড়ান্তভাবে থাকছে কিনা, এমন সন্দেহ আছে কমিটির কয়েক সদস্যের।

স্বাস্থ্যখাতে নানা রকম বাস্তবিক প্রতিশ্রুতি দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে খসড়ায়। বলা হয়েছে, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, ডায়ালাইসিস খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার কমিটির সদস্য ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে মিথ্যা কিংবা অবাস্তব কোনো প্রতিশ্রুতি থাকবে না। বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতিই ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে। জনগণের মতামত নিতে ৮ ডিসেম্বর এর খসড়া বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.