ঘাড় ব্যথার কারণ ও চিকিৎসা

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষই জীবনে কোনো না কোনো সময় ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত হয়েছেন। আসুন আজকের বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিই ঘাড় ব্যথা কেন হয় ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে।

প্রশ্ন: প্রথমেই জানতে চাই ঘাড় ব্যথা কেন হয়?
উত্তর: অনেক কারণে ঘাড় ব্যথা হতে পারে। বয়স অনুসারে ঘাড় ব্যথা ভিন্ন ভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। যেমন- শিশুদের ক্ষেত্রে টরটিকলিস বা হঠাৎ ঘাড়ের মাংসপেশি টেনে ধরা, তরুণদের ক্ষেত্রে সারভাইক্যাল রিবস বা ঘাড়ের অতিরিক্ত হাড়ের কারণে ও সারভাইক্যাল ডিক্স প্রলেপস বা সারভাইক্যাল ডিস্ক ডিজিজ ইত্যাদি। বয়স্কদের ক্ষেত্রে খুব পরিচিত রোগ। যেমন- সারভাইক্যাল ক্যানেল স্টেনোসিস বা স্পাইনাল ক্যানাল সরু হওয়া, সারভাইক্যাল ডিক্স প্রলেপস বা হারনিয়েশন, অস্টিওপরোসিস বা হাড়ের ক্ষয় ও ভঙ্গুরতা রোগ, সারভাইক্যাল অস্টিওআর্থ্রাইটিস, হাড়ের ইনফেকশন, ডিস্কাইটিস (ডিস্কের প্রদাহ), হাড় ও স্নায়ুর টিউমার।

প্রশ্ন: বাচ্চাদের ক্ষেত্রে টরটিকলিস নামে যে রোগের কথা বললেন এটি কেন হয়?
উত্তর: আমাদের সারভাইক্যাল স্পাইনের দুই পাশে দুইটি প্রধান মাংসপেশি থাকে। এই মাংসপেশিটির নাম স্টারনোক্লাইডো-মাস্টয়েড বলা হয়। এই মাংসপেশিটি আমাদের ঘাড়ের মুভমেন্ট বা নাড়াচাড়া করতে সাহায্য করে। এই মাংসপেশিটি যখন কোনো কারণে হঠাৎ শক্ত হয়ে এক পাশে টেনে ধরে তখন এই অবস্থানকে টরটিকলিস বলে।

প্রশ্ন: তাহলে টরটিকলিসের চিকিৎসা কী?
উত্তর: এর প্রধান চিকিৎসা হলো আক্রান্ত মাংসপেশিকে রিলাক্স করা। এক্ষেত্রে আমাদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় কিছু ম্যানুয়াল টেকনিক বা পদ্ধতি রয়েছে যাকে ম্যানুয়াল থেরাপি বলা হয় এর মাধ্যমে সহজেই মাংসপেশিকে রিলাক্স বা স্বাভাবিক করা সম্ভব।

প্রশ্ন: সারভাইক্যাল স্পনডাইলোসিস একটি সুপরিচিত রোগ। যা বেশিরভাগ বয়স্ক লোকেরই হয়ে থাকে। এই সম্পর্কে একটু বলবেন?
উত্তর: হ্যাঁ ঠিক বলেছেন। সারভাইক্যাল স্পনডাইলোসিস একটি পরিচিত রোগ। আমাদের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ মানুষই এর সঙ্গে পরিচিত। এই রোগটি বয়সের কারণে মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ। বয়স চল্লিশের ওপর গেলে যেমন চুল পেকে যায় তেমনি মেরুদণ্ডের হাড় বা কশেরুকা গুলোরও ক্ষয় হতে থাকে। পাশাপাশি দুই কশেরুকার মধ্যবর্তী স্থান বা ইন্টারভার্টিব্র্যাল ডিস্ক স্পেস কমে যায় ও আক্রান্ত কশেরুকাগুলোতে ছোট ছোট হুকের মতো হাড় বৃদ্ধি পায় যাকে মেডিকেল পরিভাষায় অস্টিওফাইট বলে, যার ফলে আক্রান্ত নার্ভ রুটের ওপর চাপ পড়ে এবং রোগী ব্যথা অনুভব করে।

প্রশ্ন: সারভাইক্যাল স্পনডাইলোসিস কাদের বেশি হয়?
উত্তর: এটি মহিলা ও পুরুষ উভয়েরই হয়। তবে কিছু কিছু পেশার মানুষের বেশি হয়ে থাকে। যেমন- কম্পিউটারে কাজ করেন, সামনের দিকে ঝুঁকে কাজ করেন, লেখালেখি করেন, গৃহিণী বা গৃহস্থালি কাজ করেন তারা বেশি আক্রান্ত হন।

প্রশ্ন: সারভাইক্যাল স্পনডাইলোসিসের ক্ষেত্রে রোগীর কী কী উপসর্গ দেখা দেয়?
উত্তর: উপসর্গ— ১. ঘাড় ব্যথা এবং এই ব্যথা কাঁধ, বাহু, হাত ও আঙ্গুল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ২. কাঁধ, বাহু, হাত ও আঙ্গুলে অস্বাভাবিক অনুভ‚তি বা অবশ ভাব। ৩. বাহু, হাত ও আঙ্গুল দুর্বল হতে পারে। ৪. সব সময় ঘাড় ধরে বা জমে (স্টিফনেস) আছে এবং আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। ৫. ঘাড়ের মুভমেন্ট ও দাঁড়ানো অবস্থায় কাজ করলে ব্যথা বেড়ে যায়। ৬. ঘাড় নিচু করে ভারী কিছু তোলা বা অতিরিক্ত কাজের পর তীক্ষ্ণ ব্যথা। ৭. হাঁচি, কাশি দিলে বা সামনে ঝুঁকলে ব্যথা বেড়ে যায়। ৯. শরীরে অসহ্য দুর্বলতা লাগে, ঘুমের বিঘ্ন ঘটে এবং কাজ করতে অক্ষমতা লাগে, শারীরিক ভারসাম্য হারাবে। ১০. প্রস্রাব ও পায়খানার নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হবে। ১১. রাতে বেশি ব্যথা হলে বা ব্যথার জন্য ঘুম ভেঙে যায়।

প্রশ্ন: সারভাইক্যাল স্পনডাইলোসিসের ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় আপনারা কী করে থাকেন?
উত্তর: খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। এই রোগে যে সমস্যাটি হয় আমরা বলেছি মেরুদণ্ডের হাড়ের মধ্যকার স্পেসটি কমে যায়। এই স্পেস বাড়ানোর জন্য আমাদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা খুবই ইফেকটিভ বা ফলদায়ক। এক্ষেত্রে আমরা ট্রাকশনের মাধ্যমে স্পেসটি বাড়িয়ে দিই পাশাপাশি কিছু এক্সারসাইজ বা ব্যায়ামের মধ্যে ঘাড়ের মাংসপেশিগুলোর শক্তি বৃদ্ধি করি, যেন পরবর্তীতে আবার স্পেসটি কমে না যায়।

প্রশ্ন: ঘাড় ব্যথার রোগীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
উত্তর: ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত রোগীরা দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা নিন।

প্রশ্ন: আর যারা এখনো ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত হননি, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
উত্তর: যারা এখনো ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত হননি তারা কিছু নিয়ম মেনে চলুন তাহলে ঘাড় ব্যথা প্রতিরোধ করতে পারবেন। যেমন- ১। সামনের দিকে ঝুঁকে দীর্ঘক্ষণ কাজ করবেন না। কাজের মাঝে কিছু সময় বিশ্রাম নিন। ২। যারা কম্পিউটারে কাজ করেন তাদের কম্পিউটারের মনিটর চোখের লেভেল অনুযায়ী রাখুন। যেন খুব বেশি ঝুঁকতে না হয়। ৩। শোবার সময় ১টা মধ্যম সাইজের বালিশ ব্যবহার করবেন যার অর্ধেক টুকু মাথা ও বাকি অর্ধেকটুকু ঘাড়ের দিকে থাকবে। কারণ আমরা অনেকেই খুব নিচু বালিশ ব্যবহার করি যার ফলে আমাদের সারভাইক্যাল স্পাইনে যে স্বাভাবিক বক্রতাকে নষ্ট করে দেয়, তেমনি কেউ যদি খুব উঁচু বা ডাবল বালিশ ব্যবহার করেন সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক বক্রতা নয় হয়। ৪। যাদের সারভাইক্যাল স্পাইনের ডিস্ক স্পেস কমে যাওয়ার কারণে ঘাড় ব্যথায় ভুগছেন তারা ভ্রমণের সময় ঈবৎারপধষ ঈড়ষষধৎ ব্যবহার করবেন। যাতে গাড়ির ঝাঁকুনিতে ডিস্ক স্পেস আরো কমে না যায়। ৫। সর্বোপরি ঘাড়ের মাংসপেশির শক্তি ঠিক রাখার জন্য ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করুন।

লেখক: বাত, ব্যথা,প্যারালাইসিস রোগে ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ, কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান-ফিজিওথেরাপি বিভাগ
প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চিফ-কনসালট্যান্ট, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল।