গ্রুপিং আছে কার্যক্রম নেই চট্টগ্রামে অস্তিত্ব সংকটে জাপা

দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি কাগজে-কলমে গণ্য হলেও চট্টগ্রামে দলটির অবস্থান দিন দিন খারাপ হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে দুই এমপি ও একজন মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর, দক্ষিণে বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জাতীয় পার্টি। তিন কমিটির কোনো কার্যক্রম নেই বললে চলে। চট্টগ্রাম মহানগরে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সোলায়মান আলম শেঠ ও নগর জাপার সভাপতি সংরক্ষিত আসনের এমপি মাহজাবিন মোরশেদের দ্বন্দ্ব চরমে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান মাস্টার শামসুল আলম ও দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির একাংশের সভাপতি নুরুচ্ছফা সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মারমুখী পর্যায়ে। উত্তরে একেবারেই অবস্থা খারাপ। এখানে রয়েছে দুটি কমিটি। একটি কমিটিতে নেতৃত্বে দিচ্ছেন শফিকুল ইসলাম বাচ্চু অন্যটিতে দলের যুগ্ম মহাসচিব দিদারুল কবির। এত সমস্যা থাকার পরও গত সপ্তাহে দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ চট্টগ্রামে এসে সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রামে কোনো গ্রুপিং নেই। তার এ বক্তব্যের সঙ্গে চট্টগ্রামে জাতীয় পার্টির মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় নগর জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সোলায়মান আলম শেঠ। ২০১৩ সালে জিয়াউদ্দিন বাবলু জাতীয় পার্টির মহাসচিব হলে ভেঙে দেয়া হয় চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি। ২০১৩ সালে মাহজাবিন মোরশেদকে সভাপতি করে চট্টগ্রাম মহানগর জাপার নতুন কমিটি দেয়া হয়। ওই সময় জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে সোলায়মান আলম শেঠের মতপার্থক্য থাকায় ওই কমিটির দুই বছর মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও ভেঙে দেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ সেই কমিটি প্রায় ৪ বছর পার করলেও এখনো পর্যন্ত কোনো থানা কমিটি তো দূরের কথা কোনো ওয়ার্ড কমিটিও গঠন করতে পারেনি। মাঝে মাঝে এমপি মাহজাবিনের উদ্যোগে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠানে চিহ্নিত কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন। তবে কোনো সাংগঠনিক কমিটি গঠনের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নগর জাতীয় পার্টির সভাপতি এমপি মাহজাবিন মুরশেদ বলেন, সাংগঠনিক ও জাতীয় দিবসগুলো পালন করা হয়। এ ছাড়াও অঙ্গ সংগঠনগুলো নিয়মিত কার্যক্রম চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে নগরের বেশ কয়েকটি থানায় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অন্যদিকে নগর জাতীয় পার্টির কার্যক্রম নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সোলায়মান আলম শেঠ বলেন, চট্টগ্রাম নগরে একসময় জাতীয় পার্টি প্রতিটি ওয়ার্ডে সক্রিয় ছিল। বর্তমানে থানা কমিটিই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। কেউ এমপিগিরি নিয়ে ব্যস্ত থাকলে দল গোছাবে কিভাবে। দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে আমি অতীতেও ছিলাম এখনও আছি। আগামীতেও থাকব। গত সপ্তাহে দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ চট্টগ্রামে আসলে তাকে দলের বেহাল অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। তিনি খুব শিগগির ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আগামীতে চট্টগ্রামে জাতীয় পার্টির সুদিন অপেক্ষা করছে।

এদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির অবস্থাও বেহাল। চরম গ্রুপিং চলছে মাস্টার শামসু ও নুরুচ্ছফা সরকারের সঙ্গে। দু’জনই নিজেদের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি দাবি করে আসছেন। পৃথক পৃথকভাবে গত এক বছর ধরে কর্মসূচি পালন করে আসছেন। বিগত দুই বছর আগে জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান মাস্টার শামসুকে সভাপতি ও নুরুচ্ছফা সরকারকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হলে তারা দুই জন বেশ কিছু দিন একত্রিত হয়ে কার্যক্রম চালান। এক বছর না যেতে ফাটল ধরে দুই জনের মধ্যে। আবার শুরু হয় গ্রুপিং। এ দুই নেতার গ্রুপিং এখন মারমুখী পর্যায়ে। তবে গ্রুপিং থাকলেও দলের কার্যক্রম তেমন চোখে পড়ে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাস্টার শামসুল আলম বলেন, দলের চেয়ারম্যান আমাকে সভাপতি হিসেবে অনুমোদন দিয়ে কমিটি দিয়েছেন। আমিই বৈধ সভাপতি। আমার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির কার্যক্রম চলছে।

অন্যদিকে নুরুচ্ছফা সরকার নিজেকে সভাপতি দাবি করে বলেন, মাস্টার শামসু দলের নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। আমরা তাকে সভাপতি হিসেবে মানি না। জাতীয় পার্টি কেন্দ্রের নির্দেশে আমার নেতৃত্বে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামে জাতীয় পার্টির দুই জেলা ও নগর কমিটির মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জাতীয় পার্টির। গত দুই বছর শফিকুল ইসলাম বাচ্চুকে ও আরেক শফিকুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি কমিটি দেয়া হয়। শুরু থেকেই এ কমিটির কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো ছিল না। মৃত প্রায় উত্তর জেলা জাতীয় পার্টিকে কিছু চাঙ্গা করার জন্য নিজেকে সভাপতি দাবি করে আরেকটি কমিটি ঘোষণা করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব দিদারুল কবির। এ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর নুর। দুইভাগে বিভক্ত হয়ে কমিটি বিদ্যমান থাকলেও উভয় গ্রুপে সাংগঠনিক কার্যক্রম তো দূরের কথা আনুষ্ঠানিকতা নেই।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব দিদারুল কবির বলেন, উত্তর চট্টগ্রামে তো জাতীয় পার্টি নেই বললে চলে। তিনি আরো বলেন, দুই শফির কমিটি উত্তর চট্টগ্রামে জাতীয় পার্টিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এসব বিষয়ে দলের চেয়ারম্যানকে বার বার বলার পরও কেন্দ্র থেকে কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বলে তিনি জানান।

আরেক কমিটির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, দেশের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। বৃহৎ এ দলে গ্রুপিং থাকতে পারে। এরপরও আমরা কেন্দ্রের নির্দেশে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.