গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

নিয়মিত হাঁটাচলা, শারীরিক অনুশীলন ও পারস্পরিক আলোচনার মধ্য দিয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ও মাত্রা কমানো সম্ভব। এর সঙ্গে দরকার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন। সচেতনতা যেমন মানুষকে এই রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারে, তেমনি চিকিৎসা ব্যয়ও কমাতে পারে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও লন্ডনের ইউসিএল ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের এক সমীক্ষায় এসব তথ্য জানা গেছে। যুক্তরাজ্যের মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের অর্থায়নে টানা তিন বছর এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, এক সময় ধারণা করা হতো শহরের মানুষ পরিশ্রম করে না, সেজন্য তারা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগে ভোগে। কিন্তু এখন গ্রামের মানুষও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের ২০-৩০ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের ক্ষুধা পেটে গ্লুকোজের পরিমাণ অস্বাভাবিক। আর এই জনগোষ্ঠীর অন্তত ১০ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস বিষয়ক সচেতনতা খুব কম। মূলত গ্রামে কৃষিকাজের পরিধি কমে যাওয়া, হাঁটাচলা কম করা এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং মানসম্মত খাদ্যাভ্যাসের অভাবই এজন্য দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। ২ বছরব্যাপী পরিচালিত উপর্যুক্ত এই সমীক্ষায় গ্রামের মানুষদের সচেতন করার মধ্য দিয়ে ডায়াবেটিসের প্রকোপ কমানো সম্ভব হয়েছে। ফরিদপুরের মধুখালী, বোয়ালমারী, সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার ৯৬টি গ্রামের মানুষকে নিয়ে সমীক্ষাটি করা হয়েছে। যেখানে ৩২টি গ্রামের মানুষ ১৪ মাস মোবাইল ফোনে মাসে দুটি করে স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত দুটি ভয়েস বার্তা পেয়েছেন। ৩২টি গ্রামের মানুষ প্রতি মাসে একবার করে ১৮ মাস বৈঠক করেছেন আর বাকি ৩২টি গ্রামের মানুষ কেবল সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন, অর্থাত্ ডাক্তারের কাছে যাওয়া এবং প্রয়োজনবোধে গ্লুকোজ টেস্ট করা।

দুই বছর পর দেখা যাচ্ছে, যে ৩২টি গ্রামের মানুষ নিয়মিত বৈঠক এবং শারীরিক অনুশীলন, খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক চাপ নিয়ে আলোচনা করতেন, তাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সাধারণ সেবা গ্রহণকারীদের তুলনায় ৬৪ শতাংশ কমেছে। আর যারা মোবাইল ফোনে ভয়েস বার্তা পেতেন, তাদের ডায়াবেটিস বিষয়ক সচেতনতা বাড়লেও ডায়াবেটিসের মাত্রা কমেনি। দেখা যায়, প্রকল্প এলাকার ১২ হাজার ২৮০ জন মানুষের মধ্যে (৩০ বা তদূর্ধ্ব নারী-পুরুষ) ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ ডায়াবেটিস ও ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, সভায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রবণতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি সচেতনতা বেড়েছে।

সমীক্ষা প্রতিবেদনের কেস স্টাডিতে দেখা যায়, ফরিদপুরের সালথা উপজেলার ৫৬ বছর বয়সী নারী মনোয়ারা বেগমের সমপ্রতি ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধ খেয়ে ও চিনি খাওয়া কমিয়েও তিনি রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে পারছিলেন না। সমীক্ষার অংশ হিসেবে তার গ্রামে এক গ্রুপ গঠিত হয়। এরপর তিনি সেই গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে সকালে হাঁটতে শুরু করেন। প্রথমে কষ্ট লাগলেও ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, এতে তার রক্তে শর্করার পরিমাণ কমছে। শুধু হাঁটাহাঁটি বা শারীরিক কসরতই নয়, মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনেরও চেষ্টা করা হয়েছে। ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার পান্না বেগম এখন কম তেল দিয়ে রান্না করেন। একই সঙ্গে ঘরের আশপাশে সবজি উৎপাদন করছেন তিনি। খাবারে ভাতের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে তার পরিবার এখন ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খাচ্ছেন। সমীক্ষার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে পান্না বেগম ডায়াবেটিসের লক্ষণ, এর জটিলতা ও কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা যায় তা শিখেছেন। জেনেছেন, তিনি নিজেও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছেন। এসব বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে পেরে তিনি আনন্দিত।

মানবকণ্ঠ/এসএস