গৃহিণীর গ্রহণযোগ্যতা

টুম্পা ভট্টাচার্য্য :
সব গৃহিণী নারীরা আপনি কি চাকরি বা জব করেন? একথার সম্মুখীন নিশ্চয়ই হয়েছেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সংসার সামলানোর জন্য হয়তো অনেকে বাইরে কাজ করতে পারে না। আর যখন তারা ওই প্রশ্নের সামনে পড়ে তখন হয়তো মনটা খারাপ ও ছোট হয়ে আসে। আর সে জন্য সংসারকে দায়ী করতে থাকে। সৃষ্টি হয় সংসারের প্রতি বিরূপভাব। কিন্তু আমরা/আপনারা কখনো কি ভেবেছেন আপনাদের ঘরের সার্ভিসটা বাইরের কাজ থেকে কতটা মূল্যবান? সমস্ত শ্রম, শক্তি ও ভালোবাসা দিয়ে আপনার সংসার গড়া। আপনার ঘরের সার্ভিসে কখনো বেতন, বোনাস, ভাতা, ছুটি ও অবসর না থাকা সত্ত্বেও নিরলস সংসারের জন্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন এ সেবা কতটা মহৎ ও নিঃস্বার্থ।
৩৬৫ দিন আপনি এভাবে মায়া মমতা দিয়ে সেবা দিয়ে থাকেন এবং সারা জীবন দিয়ে যান। আপনি একজন বিশ্বস্ত সেবিকা, শিক্ষিকা, রাঁধুনী, পরিচারিকা একাধারে সব পেশা পালন করছেন সংসারের জন্য। আপনার সেবা পৃথিবীর সমস্ত সেবার ঊর্ধ্বে যা কোনো কিছুর বিনিময়ে মূল্যায়ন করা যায় না। এরপরেও মনে হয় আপনাদের কিছুই করতে পারছেন না? আসলে এই হীনমন্ন্যতার জন্য আমাদের সমাজ ও পরিবেশ দায়ী। এতে আপনাদের দোষ নেই। আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই এরকম। যার জন্য গৃহিণীরা হীনম্মন্যতায় ভোগে। যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে সংসারের জন্য নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন কেন আজো তারা সমাজের চোখে অবহেলিত? বর্তমানে নারী শিক্ষার হার তুলনামূলক বৃদ্ধি পেলেও সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে অনেকে জব করতে পারছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একাধিক সন্তানের দায়িত্ব থাকার কারণে আর জব করা হয়ে ওঠে না। অনেকে ভালো অবস্থানে কাজ করেও সংসারের কথা ভেবে জব ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই ছাড়ের মূল্যায়নটা কখনো সেভাবে করা হয় না। খুব অবাক হয় যখন কাজের বুয়া দুই ঘণ্টা শ্রমের বিনিময়ে ৩-৪ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পায়। একজন গৃহিণী সেই বুয়ার থেকেও মূল্যহীন? দিনের ২৪ ঘণ্টায় ৮ ঘণ্টা ঘুম ছাড়া বাকি ১৬ ঘণ্টা সে ঘরের জন্য শ্রম দিয়ে চলছে, বিনিময়ে পায় থাকা খাওয়া ও প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো। যদি কাজের হিসেবে পারিশ্রমিক হিসেব করা হয় তবে দেখা যাবে মাসে লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
কিন্তু তার বিনিময়ে সামান্য হাত খরচও দেখা যায় হাত পেতে নিতে হয়। একটা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করতে হয় তার থেকে অনেকগুণ বেশি একটা সংসারের ব্যবস্থাপনায় মাথা ও শরীর খাটাতে হয়। এরপরও সেই নারীকে ঘরে বাইরে কথার সম্মুখীন হতে হয় কি কাজ করে? কোনো সার্ভিস করা হয় কি না? আর যেই শুনে না সেই আচরণের ভাষা বদলে যায়। আমি কয়েকজন স্বামীকে জিজ্ঞেস করলাম। আচ্ছা আপনাদের কি মনে হয় না স্ত্রী হিসেবে নির্দিষ্ট একটা পারিশ্রমিক দেয়া উচিত যেহেতু সে আপনার পরিবারের দেখাশোনার আজীবন দায়িত্ব নিয়েছে? উত্তর আসল পরিবার তো আমার একার নয়। আর পারিশ্রমিক দিলে সম্পর্কে আর ভালোবাসা থাকে না। অনেক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তরটা দিল। যদিও সেই আত্মবিশ্বাসটা ছিল পুরুষতন্ত্রের অহংকার ও বিদ্রুপের হাসি। সত্যি তো কত সহজে একজন নারীকে বুঝ দেয়া যায় ভালোবাসা দোহাই দিয়ে নারীর সর্বস্ব পাওয়া যায়। গৃহবধূ এই শব্দটাও আপত্তিকর কেননা বধূতো গৃহেরই হয়।
এটাতে একধরনের ঘোমটাতে আড়াল করার চেষ্টা মাত্র। সে তুলনায় গৃহরক্ষিতা বললে বেশ মানানসই মনে হয়। নতুবা কেন বলা হয় না গৃহ ব্যবস্থাপক? কারণ সেটাতে থাকে মর্যাদা আর বিবাহিত নারীকে সমাজ হোক বা গৃহে কোথাও মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত হতে দেয়া হয় না। যতক্ষণ না সে কোনো উপাধিযুক্ত কাজ করছে। তবে কষ্ট হয় একজন গৃহিণী সেই বুয়া থেকেও মূল্যহীন যখন। নারী কাজ করলেও শান্তি নেই যদি না সেই কাজ থেকে কিছু ইনকাম না হয়। গৃহকাজ সামলে যদি কিছু নিজের জন্য কাজ করা হয় তখনো তাকে সে সম্মানটুকু দেয়া হয় না কারণ তাতে কোনো ইনকাম নেই। যেমন ধরুন আমি নিজের কথাই বলি সারাদিন ঘর সামলে একটু সময় পেলে লেখালেখি করি এরপরও সবার প্রশ্ন আপনি কি কিছু করেন? আর কী করলে কিছু করা হয় তা আমার সত্যিই বোধগম্যতার বাইরে। অনেকেই বলে এত কষ্ট করে লেখালেখি করে কি লাভ? কিছু তো উপার্জন হচ্ছে না। সত্যি তখন খুবই অবাক আর কষ্ট হয়। এক ঘণ্টা ব্যক্তিগত সময় বাঁচিয়ে লেখালেখির পারিশ্রমিক হিসেবে আনা হয় অথচ সারাদিনের শ্রমের মূল্যের কোনো হিসেব নেই। যদিও বিনিময় হিসেবে বলছে ভালোবাসার একটা মিথ্যা নাম মাত্র। গৃহবধূ (গৃহরক্ষিতা) চিরজীবন অবহেলিত ছিল আর থাকবে আমাদের সুশীল (সু-শীল-নরসুন্দর) সমাজ সভ্য মুখোশ আড়ালে থাকবে। গৃহিণী তুমি জীবন দিয়ে কাজ করে যাও বিনিময়ে তোমার আছে একবুক মিথ্যা আশ্বাস ও ভালোবাসা।