গৃহবধূর মাদক ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্প

হামিদা খাতুন। পেশায় গৃহিণী। দুই সন্তানের জননী। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। সংসারের সচ্ছলতার জন্য স্বামী ব্যস্ত থাকেন সকাল থেকে গভীর রাত অবদি। দেশের প্রতিষ্ঠিত দুটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন স্বামী। তাই সংসারে প্রাচুর্যতা না থাকলেও ছিল সচ্ছলতা।

তবে সেই হামিদা এখন রাজধানীর একজন প্রতিষ্ঠিত মাদক ব্যবসায়ী। মাদারটেক থেকে উত্তরা পর্যন্ত তিনি ছুটে চলেন ইয়াবা নিয়ে। তার এখন নেই সংসারের শত ব্যস্ততা। স্বামী-সন্তানের সেবাযত্নের দায়বদ্ধতাও নেই তার। বরং মাদকসেবীদের ‘সেবাতেই’ তার এখন যত ব্যস্ততা!

অবশ্য এর আগে হামিদা ইতি টানেন তার ২২ বছরের সংসার জীবনের। শুধুু ইতি টেনেই ক্ষান্ত হননি। সাঙ্গপাঙ্গসহ নিজ সংসারের সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যান তিনি। শ্বশুর-শাশুড়ির হজে যাওয়ার জন্য গচ্ছিত টাকাসহ স্বর্ণ ও স্বামীর সঞ্চিত কয়েক লাখ টাকাও লুট করে নিতে ভোলেননি তিনি।

সর্বনাশা ইয়াবার ভয়ঙ্কর থাবায় সহজ-সরল গৃহবধূ হামিদার সুখের সংসার আজ ছিন্নভিন্ন। চারটি জীবন আজ অনিশ্চয়তায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এই দম্পতির বড় সন্তানটিও এখন মাদকাসক্ত। মা হামিদাই তাকে মাদকাসক্ত করেছেন। নিজের অপকর্মের পথ সহজ করতে হামিদা তাদের বড় সন্তান, অষ্টম শ্রেণির ছাত্রটিকে নেশা খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতেন। এভাবে ধীরে ধীরে সে হয়ে পড়ে মাদকাসক্ত। স্ত্রীর এই অবস্থার কথা কাউকে বলতেও পারছেন না স্বামী ইমরান (ছদ্ম নাম)। সংসার আর সন্তান হারিয়ে দিশেহারা ইমরানের ভাবনায় শুধুই আত্মহননের চিন্তা। অসহ্য এই মানসিক যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েছেন তিনি।

ইমরান এই প্রতিবেদককে জানান, তার স্ত্রীর মাদকাসক্ত থেকে মাদক বিক্রেতা হয়ে ওঠার কাহিনী। নিজের পছন্দে পরিবারের অমতে বিয়ে করেন হামিদাকে। পুরান ঢাকার লালবাগে বাসা ভাড়া নিয়ে শুরু করেন সংসার জীবন। ভালোই চলছিল। বিয়ের ৩ বছর পর জন্ম নেয় ছেলেসন্তান। ব্যয় বাড়ে সংসারের। ব্যয় সংকুলানের জন্য বিকেলের পর আরেকটি চাকরিতে যোগদান করেন। বাসায় ফেরেন গভীর রাতে। এর মধ্যে লালবাগ থেকে বাসা বদল করে সন্তানের পড়াশোনার সুবিধার্থে চলে আসেন মাদারটেকে। মূলত এখান থেকেই শুরু হয় স্ত্রীর নেশার হাতেখড়ি। তারা যে এলাকাটিতে থাকতেন এর কিছুটা অদূরেই ছিল একটি বস্তি। নিম্নবিত্ত মানুষের বসবাস সেখানে। সেই বস্তিরই কিছু নারীর সঙ্গে ক্ষুদ্র ঋণের বিষয়ে পরিচয় হয় হামিদার। তাদের কাছ থেকে সমিতি থেকে ঋণও নেন তিনি। ধীরে ধীরে টাকার নেশায় পেয়ে বসে হামিদাকে। তিনি নিজেই বিভিন্ন নারীর কাছ থেকে উচ্চহারে সুদ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে টাকা সংগ্রহ করতে শুরু করেন। এই কাজ করতে গিয়েই হামিদার সঙ্গে পরিচয় হয় স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী দুই নারী তাছলিমা ও মমতাজের সঙ্গে। তবে এসব বিষয়ে তেমন কিছুই জানতেন না স্বামী ইমরান। তিনি দৈনন্দিন রুটিনে সকালবেলা অফিসের উদ্দেশে বের হয়ে ফিরতেন গভীর রাতে। গত কয়েক বছর ধরে ইমরান ও স্ত্রীর মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করতে শুরু করেন। বাসায় প্রায় সময়ই সিগারেটের অবশিষ্টাংশসহ কিছু ছেঁড়া কাগজ (ইয়াবা সেবনের নানান উপাদান) দেখতে পেতেন। বাসার শয়নকক্ষসহ সব কিছু থাকত এলোমেলো। কারণে-অকারণে উত্তেজিত হয়ে উঠতেন হামিদা। অস্থির থাকেন সব সময়। আগের মতো স্বামী-সন্তানের খেয়ালও রাখতেন না। বাসায় ফিরে স্ত্রীকে আগের মতো তার জন্য প্রতীক্ষাও করতে দেখতেন না। এসব বিষয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিভিন্ন কথা বলে প্রসঙ্গগুলো এড়িয়ে যেতেন। এরই মধ্যে একদিন কিছু সময় আগেই বাসায় ফিরে অসেন ইমরান। বাসার সদর দরজা খোলা পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে চমকে ওঠেন। স্ত্রী হামিদার শয্যাপাশে আরেক পুরুষের উপস্থিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান তিনি। হাতেনাতে ধরে ফেলেন অজ্ঞাত ওই পুরুষকে। কিন্তু এতে বেঁকে বসেন হামিদা। ধারালো ছুরি নিয়ে তারা দু’জন ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বামী ইমরানের ওপর। প্রাণভয়ে নিজের বাসা থেকেই দৌঁড়ে পালান তিনি।

এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন স্ত্রীর অধঃপতনের তথ্য-উপাত্ত। একসময় বিচ্ছেদও হয় তাদের।

কিন্তু এতেই সমাপ্ত হয়নি সবকিছু। এর কিছুদিন পর হামিদা ও তার দলের লোকজন মিলে লুট করে তার সাবেক সংসারের সব কিছু। ইমরান অভিযোগ করেন, বাসায় তার বাবা-মায়ের হজে যাওয়ার ৪ লাখ টাকা ছিল। এ ছাড়া সমিতি থেকে ঋণ নেয়া দেড় লাখ টাকা ও ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কারও ছিল। হামিদা ও তার দলের লোকজন নগদ সাড়ে ৫ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ছাড়াও বাসার টিভি-ফ্রিজসহ সব অসবাবপত্র নিয়ে যায়।

এ বিষয়ে সবুজবাগ থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে সাধারণ একটি ডায়েরি করে। পরে তিনি আদালতে এ বিষয়ে একটি মামলা করেন।

ইমরান অভিযোগ করেন, হামিদা তাদের বড় ছেলেকেও মাদকাসক্ত করে ফেলেছে। সে এখন রাস্তার ধারে একটি চায়ের দোকানে কাজ করে। তিল তিল করে গড়ে তোলা তার সংসারটি এখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ছেলেদের সঙ্গেও তাকে যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না হামিদা। তার সাবেক স্ত্রী হামিদা এখন পুরোদস্তুর একজন মাদক ব্যবসায়ী। তিনি ফাহিম ওরফে সাব্বির নামে এক যুবকের ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসা করছেন। সবুজবাগ থানা-পুলিশকে এসব বিষয়ে অবগত করার পরও তারা এসব চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমনকি যেদিন তার বাসার মালামাল লুট করা হয় ওই সময়ও তিনি থানায় গেলে পুলিশের কাছ থেকে কোনো সাহায্য করা হয়নি তাকে।

মানবকণ্ঠ/এসএস