গুজব দেশে সংকট তৈরি করে

‘গুজব’ শব্দটি এখন বহুল আলোচিত। যেটি সাধারণ জনেমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়। বিশেষ করে দেশে কোনো আন্দোলন হলে এ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শেষ প্রান্তে এসে এই শব্দটি বেশ আলোচিত হয়েছে। এটি দেশের যে কোনো সময় ভয়ঙ্কর ক্ষতি করে ফেলতে পারে। এই শব্দটি উসকানি দেয়, বিভ্রান্তি করে। সাধারণ মানুষও তথ্যের যাচাই-বাছাই না করে গোড়ামির মতো বিশ্বাস করে। ফলে মিথ্যা জিনিসটা সত্য হয়ে যায়। আর এই মিথ্যা বা গুজবই দেশকে সংকটে ফেলে।
গুজব বন্ধ করার একটি প্রক্রিয়া হতে পারে তথ্যেও স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখা। সত্য তথ্য প্রকাশে কাউকে বাধা না দেয়া। অথবা সবাই যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে সেটি হুটহাট বন্ধ না করে দেয়া। তথ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ যদি বন্ধ করে দেয়া হয় বা মানুষ মনে করতে থাকে যে, সব কথা প্রকাশ্যে আসছে না, তখনই সন্দেহ সৃষ্টি হয় ও গুজব ছড়াতে থাকে। তাই গুজব যদি বন্ধ করতে চান তবে তথ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ চলতে দিতে হবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
গুজব তথ্যেও শূন্যস্থান পূরণ করে। কিছুদিন আগে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের সময় আমরা দেখিছি। নানা গুজব ছড়ানো হয়েছে। গুজব থেকে রক্ষার জন্য হঠাৎ করে সরকার ২৪ ঘণ্টার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বন্ধ করে দিয়েছে। ঢাকার জিগাতলার ঘটনা আমাদের সবার জানা। এখানে ধর্ষণ হয়েছে, আবার চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে এমন ঘটনাও শুনেছি। তবে তার কোনো সত্যতা জানা যায়নি। কিন্তু একটি পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল সেখানে কিছুই ঘটেনি। কিন্তু সত্য ঘটনা হলো কিছু না কিছু তো ঘটেছিল। সেটা অতিমাত্রায় না হোক কম হলেও ঘটেছিল। যা আমরা মূলধারার গণমাধ্যমে দেখেছি। সেখানে যখন বলা হচ্ছিল জিগাতলায় কিছুই ঘটেনি। তখন এই প্রচারণাকে গুজবের বাইরে কোনোভাবেই ফেলা যায় না। তাই অসত্য তথ্য বা গুজব থেকে রক্ষা বা প্রতিরোধের উপায় হলো সত্য প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়া। না হলে আন্দোলনকারীরা আরো উত্তেজিত হবে। আরো গুজব ছড়াবে।
গুজব বলে অনেক সময় সঠিক তথ্যকেও চাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে যখন কেউ কাজ করে বা রাস্তায় থাকে, তখন তাদের পক্ষেও নানারকম গুজব ছড়াতে থাকে। গুজবের শিকার হলে উভয়েই এর শিকার হয়। এজন্য এসব গুজবের ভিডিও অডিও যখন প্রকাশ হতে থাকে, তখন একে গুজব বলে আর থামানো যায় না। তখন গুজবটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যদি সব ঘটনাকেই গুজব বলা হয় আর এর অডিও-ভিডিও কোনো প্রামাণ্য মানুষের কাছে থাকে, তখন মানুষ কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা এর যাচাই করতে পারে না। তখন সবটাকেই সত্য মনে করে। এই বিভ্রান্তি থেকে এড়ানোর জন্য সবাইকে তথ্য ক্রস করে দেখতে হবে। যাছাই-বাছাই করে সত্যটা নিজেই জেনে নিতে হবে। গুজবে কান দেয়া যাবে না।
একটি গুজবকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি চক্র কাজ করে। তারা বিভিন্ন ভিডিও, অডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আর এটা ভাইরাল হয়ে যায়। বিশেষ করে রাজনীতিক অর্থ্যা সংবেদনশীল কোনো ইস্যু। ভিডিও, অডিও বা লেখা যদি কোনো রাজনীতিক দলের পক্ষে হয় তাহলে তিনি সেটা ফলাও করে তার মতাদর্শী সবাই ট্যাগ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার দেন। আর যিনি শেয়ার দিয়েছেন তিনি যদি দ্বায়িত্বশীল হন তবে ওনার অনুসারীরা সেটা বিশ্বাস করে এবং তারাও সেটা শেয়ার দেয় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফলে একটি মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তাই যারা দায়িত্বশীল তারা কোনো কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার দেয়ার সময় সত্য-মিথ্যা যাচাই করে শেয়ার দিতে হবে। তাহলে গুজব এড়ানো সম্ভব।
সংকটকালে মিডিয়ার সাধারণ তথ্য প্রবাহ অবাধে এবং যে কোনো ধরনের সেন্সরশিপ থেকে মুক্তভাবে চলতে দেয়ার সুযোগ না দেয়া হলে গুজব বন্ধ করা কঠিন হবে। কারণ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ সুযোগ-সুবিধার সময়। তারা যদি পুরো ঘটনাকেই গুজব বলে, তাহলে যেহেতু ঘটনাগুলোর বড় একটি অংশের অনেক প্রামাণ্য মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে, তাই মানুষ প্রচারিত সব তথ্য বা গুজবকেই সত্য মনে করতে থাকবে। এখানে যারা প্রভাবিত হয়, তাদের দায়টা বড় নয়। যারা ছড়ায় তাদের দায়টা বেশি। যারা মিডিয়া হাউসগুলোকে প্রভাবিত করে তাদের দায় আরো বেশি। তাই মিডিয়া হাউসগুলোকে স্বাধীন করে দিতে হবে। মনে রাখবেন মূল ধারার মিডিয়া কোনো সময় গুজব ছড়ায় না। তাই তাদের হাতেই আপনি নিরাপদ।
বাঙালিদের একটি স্বভাব কোনো তথ্য জানা মাত্রই উত্তেজিত হয়ে যায়। সেটার সঠিক ভুল যাচাই করে না। কোনো তথ্য পাওয়া মাত্রই ভুলেও উত্তেজিত হওয়া যাবে না। সত্য ঘটনাটি কি সেটা আগে জানুন তারপর উত্তেজিত হোন। আরেকটি ব্যাপার হলো আমরা সহজেই আবেগ প্রবণ হয়ে যাই। সেরকম হওয়া থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে।
এমন এক ভিডিও দেখলে সেটা দেখা আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন। তখন আপনার মধ্যে স্বাভাবিক বিবেক বোধ কাজ করবে না। তাই গুজব এড়াতে আবেগপ্রবণ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন। তাই গুজবে বিশ্বাস বা গুজব না ছড়িয়ে দেশকে সংকট থেকে রক্ষা করুন। – শতাব্দী জুবায়ের