গাভির দুধ-দইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কীটনাশক, সিসা!

গাভির দুধ-দইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কীটনাশক, সিসা!সরকারি এক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় গাভির দুধে (ক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া) সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ও নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান পাওয়া গেছে। এতে আরো পাওয়া গেছে বিভিন্ন অণুজীবও। তার পাশাপাশি প্যাকেটজাত গাভির দুধেও অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত। এর মধ্যে রয়েছে দইও। এই পণ্যেও মিলেছে সিসা।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) গবেষণায় এমন ‘ভয়াবহ’ ফলা উঠে এসেছে। সংস্থাটি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গাভির খাবার, দুধ, দই ও প্যাকেটজাত দুধ নিয়ে এই জরিপের কাজ করেছে।

এই গবেষণার ফলাফলকে দেশের পুষ্টিবিদ, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আখ্যায়িত করেছেন, ‘ভয়াবহ’ বলে। তারা এতে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে বলেও মত প্রকাশ করেছেন। এ জন্য সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। তদারকি বাড়াতে হবে। গবেষণাটি পরিচালনার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গাভির দুধের ৯৬টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করে সরকারি ওই প্রতিষ্ঠান এনএফএসএল। প্রতিষ্ঠানটি সূত্রে জানা গেছে, গাভির দুধ ও গোখাদ্য সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। দই ঢাকা শহরের বিভিন্ন ব্র্যান্ড দোকান ও আশপাশের উপজেলার দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধ এবং আমদানি করা প্যাকেট দুধ। এগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে ল্যাবরেটরিতে পৌঁছানোর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, প্রায় সব গোখাদ্যে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কীটনাশকও মিলেছে কোনো কোনো খাবারে। সিসা ও ক্রোমিয়ামও আছে। মানুষের রোগ প্রতিরোধ শক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এগুলো। সিসা ও ক্রোমিয়াম ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গোখাদ্যের ৩০টি নমুনা গবেষণা শেষে দেখা গেছে, এর মধ্যে কীটনাশক (২ নমুনায়), ক্রোমিয়াম (১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন (২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন (৩০টি নমুনায়) এবং আফলাটক্সিন (৪টি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রা পাওয়া যায়।

গাভির দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সিসা পাওয়া যায়। ৯৬ শতাংশ দুধে মেলে বিভিন্ন অণুজীব।

প্যাকেটজাত দুধের ৩১টি নমুনায় ৩০ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে আছে টেট্রাসাইক্লিন। একটি নমুনায় সিসা মিলেছে। একই সঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন অণুজীব পাওয়া গেছে।

দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে। আর ৫১ শতাংশ নমুনায় মিলেছে বিভিন্ন অণুজীব। টিএমএস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফার্মাসোলজি ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক মো. ফারুক বলেন, এ ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। তবে এ ধরনের ঘটতে পারে। কেননা গাভী যে খাবার খায় তা মিল্কের মধ্যে মিশে যেতে পারে।

আবার গরু মোটাতাজা করার জন্য বিভিন্ন ওষুধ দিয়ে থাকে। সেইওষুধের প্রভাবেও হয়তো বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক গরুর দুধের মধ্যে চলে যেতে পারে। এ কারণে হয়তো গবেষণায় ভয়ঙ্কর তথ্য উঠে এসেছে। তবে এখন প্রযুক্তির আধুনিকায়নে গাভীর দুধে কোন ধরনের কীটনাশক আছে কিনা, বা অন্য কোনো ক্ষতিকর দ্রব্যাদি আছে কিনা তা পরীক্ষাগারে আগেই পরীক্ষা করা বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) পরিচালক গোলাম রহমান জানান, এই গবেষণার যে প্রতিবেদন উঠে এসেছে তা সত্যি খুব ভয়ঙ্কর। আমাদের ভোক্তা অধিকার আইন খুব শক্তিশালী নয়। কীটনাশকের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে শিশু ও বিভিন্ন বয়সী রোগীদের। দুগ¬ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে আরো বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। দোষী সাব্যস্তদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো ভয়ঙ্কর চিত্র যেন উঠে না আসে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু স্পেশালিস্ট অধ্যাপক ডা. মেহেদী হাসান টিটো জাানান, জাতিগতভাবে আমরা খুব দুর্ভাগা। আমাদের প্রতি খাদ্যেই ভেজালে ভরা। সবেচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিশুরা। বয়স্করাও যারা অসুস্থ তাদের কিডনিতেও এর প্রভাব পড়বে। লাঞ্চেও বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

পুরান ঢাকার অধিবাসী অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলাম খান জানান, আমরা ভোক্তারা সচেতন নই। ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কেও আমরা সঠিকভাবে জানি না। তাই অসাধু কিছু ব্যবসায়ী এ ধরনের সুযোগ নিচ্ছে। গরুর দুধে পানি মিশানো হয় জানতাম। আজকে জানলাম কীটনাশক ও সীসা পাওয়ার কথা। সরকারের কাছে আহ্বান থাকবে জনগণের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।

মানবকণ্ঠ/এএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.