গাজীপুর যেন মৃত্যুপুরী: ২৪ ঘণ্টায় ৭ লাশ উদ্ধার

গাজীপুর যেন মৃত্যুপুরী: ২৪ ঘণ্টায় ৭ লাশ উদ্ধার

গাজীপুরে পৃথকস্থান ও আলাদা ঘটনায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৭ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে ৪ জন নারী। শনিবার ভোররাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত এসব লাশ উদ্ধার। লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।

রোববার গাজীপুর মহানগরের মাজুখান এলাকায় এক নারীকে যৌন হয়রানির জেরে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নারীসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত তারা মিয়া টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ি থানাধীন পাইসকা গ্রামের মৃত আব্দুল গফুর মিয়ার ছেলে।

জয়দেবপুর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, মহানগরের মাঝুখান এলাকার মাজিদুল হকের বাসার ভাড়াটিয়া তারা মিয়া একই এলাকার আকলিমাকে যৌন হয়রানি করে আসছিলেন। আকলিমা বিষয়টি স্বজনদের জানায়। পরে আকলিমা ও তার ভাই মাজিদুল শনিবার রাতে তারা মিয়াকে ডেকে নিয়ে বেদম মারধর করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মাজিদুল, আকলিমাও আরজান বেগম নামে তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

এছাড়া রোববার সকালে জেলার শ্রীপুর উপজেলার আবদার গ্রামের ছমির উদ্দিনের ভাড়া বাড়ি থেকে ঝুমার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তার স্বামী সোহাগ মিয়াকে আটক করা হয়েছে। নিহত ঝুমা আক্তার উপজেলা বরমী ইউনিয়নের কায়েতপাড়া গ্রামের ফজর আলীর মেয়ে। আট মাস আগে একই ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া গ্রামের হাফিজ উদ্দিন ওরফে হাবির ছেলে সোহাগ মিয়ার (২৫) সঙ্গে ঝুমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার এলাকায় ছমির উদ্দিনের ভাড়া বাড়িতে থেকে ঝুমা স্থানীয় মাহদিন গার্মেন্টস ও স্বামী সোহাগ মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় অপর একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতো।

ঝুমার বড় ভাই মামুন বলেন, এক লাখ টাকা যৌতুক নির্ধারণ করে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। বিয়ের পর ধার দেনা করে ৫০ হাজার টাকা পরিশোধও করা হয়। পরবর্তীতে ৫০ হাজার টাকার জন্য চাপ দিলে আমরা কিছুদিন সময় চাই। এতে ঝুমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালায়। গত শনিবার রাত ১১টার দিকে ঝুমা মোবাইল ফোনে তার মাকে বাকি ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য আকুতি জানায়। পরে সকাল ৬টার দিকে তারা ঝুমার মৃত্যুর খবর শুনতে পাই।তিনি অভিযোগ করেন, ঝুমা আত্মহত্যা করেনি। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন।

শ্রীপুর থানার এসআই আব্দুল মালেক জানান, সকালে খবর পেয়ে নিহত ঝুমার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজ উদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী সোহাগ মিয়াকে আটক করা হয়েছে।

এদিকে শনিবার শ্রীপুরে শ্রমিক কলোনী থেকে সুমি আক্তার নুপুর নামে এক তরুণীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সুমি আক্তার নুপুর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের সাগর মিয়ার মেয়ে। সুমি আক্তার নুপুর (২০) শ্রমিক কলোনীর একটি কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

শ্রীপুর থানার এসআই আশরাফুল্লাহ বলেন, নিহত নুপুর শ্রীপুর পৌর এলাকার বৈরাগীরচালা গ্রামে থেকে মোশারফ কম্পোজিট কারখানায় চাকরি করতো। সম্প্রতি ওই চাকরি ছেড়ে এএ ইয়ার্ন ডায়িং কারখানায় নতুন চাকরির খোঁজে বৃহস্পতিবার রাতে পূর্বপরিচিত সহকর্মীদের কাছে যান নুপুর। চাকরির জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে যাবতীয় কাগজপত্রও জমা দেন। শুক্রবার রাতে এএ ইয়ার্ন ডায়িং কারখানার শ্রমিক কোয়ার্টারের একটি কক্ষে অন্যান্য শ্রমিকদের সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েন নুপুর। শনিবার ভোরে কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে ওই কক্ষের একজন শ্রমিক নুপুরকে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতে দেখেন। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মাওনা চৌরাস্তার আলহেরা হাসপাতালে এবং পরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

অপরদিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পার হতে গিয়ে বাস চাপায় এক পোশাক কারখানার কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। নিহত মো. বিল্লাল হোসেনের বাড়ি দিনাজপুরে। তিনি স্থানীয় নিপ্পন গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেড পোশাক কারখানার কোয়ালিটি কর্মকর্তা ছিলেন।

গাজীপুর ট্রাফিক বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিল্লাল শনিবার দুপুরের খাবার খেয়ে কারখানায় ফিরছিলেন। এ সময় গাজীপুরগামী বলাকা পরিবহনের একটি বাস তাকে চাপা দিলে গুরুতর আহত হন। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে টঙ্গী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকায় নেয়ার পথে বিল্লালের মারা যায়। বিল্লালের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার সহকর্মীরা বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় ।

এছাড়া গাজীপুরের টঙ্গীতে এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। এ ঘটনায় নিহতের বোন তাহমিনা বেগম টঙ্গী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন। নিহত সীমা আক্তার (১৭) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার রসুল্লাবাদ গ্রামের ফরিদ মিয়ার মেয়ে।

নিহত সীমার বড় বোন তাহমিনা বেগম জানান, গত ৩০ অগাস্ট সীমা তার টঙ্গীর শিলমুন এলাকার ভাড়া বাড়িতে বেড়াতে আসেন। তাদের মামা খলিল মিয়া একই এলাকায় সপরিবারে বসবাস করেন। মামাত ভাই সজল মিয়া ও সজীব মিয়া দুইজনেই সীমা আক্তারকে পছন্দ করতেন। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছিল। কয়েকদিন আগে সীমাকে তারা ভয়ও দেখান। সজল পূর্ব শত্রুতার জেরে আমার বোনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে হাসপাতালে রেখে কৌশলে পালিয়ে গেছে।

টঙ্গী থানার এসআই রমজান আলী বলেন, টঙ্গীর শিলমুন এলাকায় শুক্রবার বিকালে বড় বোনের ভাড়া বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন ওই তরুণী। পরে শনিবার স্থানীয় একটি হাসপাতালে তার লাশ পাওয়া যায়। মরদেহের সুরতহাল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরো বলেন, শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সীমা বাড়ির ছাদে কাপড় আনতে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। রাতে মামাতো ভাই সজল তাদের বাড়িতে ফোন করে জানান সীমা অসুস্থ অবস্থায় টঙ্গী আবেদা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি আছেন। শনিবার সকালে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে গিয়ে সীমার লাশ পান।

অপরদিকে সদর উপজেলার ভিম বাজার এলাকার জঙ্গল থেকে এক অজ্ঞাত নারীর হাত পা বাধা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, শনিবার সকালে সদর উপজেলার ভিমবাজার এলাকায় রোভার স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাশের একটি জঙ্গলে গাছে হাত পা বাধা অবস্থায় এক নারীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা। পরে পুলিশে খবর দিলে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করে। নিহতের পরনে লাল জামা এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

জেলার কালিয়াকৈরের সফিপুর আন্দারমানিক এলাকায় এক মাদক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। নিহত উজ্জ্বল পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানার দুপটি এলাকার রস্তম আলী খানের ছেলে।

কালিয়াকৈর থানাধীন মৌচাক পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মো. সেলিম রেজা জানান, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের লস্করচালা এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকতেন মাদক ব্যবসায়ী উজ্জ্বল। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাদক বিক্রির টাকা নিয়ে সফিপুর-আন্ধার মানিক সড়কে পেঁপেবাগান এলাকায় তার সঙ্গে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর ঝগড়া বাধে। একপর্যায়ে ওই মাদক ব্যবসায়ীরা উজ্জ্বলকে পাশের কলা বাগানে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যান।

কালিয়াকৈর থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মাদকসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশ লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

মানবকণ্ঠ/এসএ/এফএইচ