গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আজও মেলেনি

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বুকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম একটি গণহত্যা সংঘটিত করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মাত্র ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ওই সেনাবাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে। ২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইটে ১০ হাজার নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করে পাকসেনারা। তাদের মধ্যে ছিল ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ। এত অল্প সময়ে এত মানুষ হত্যার নজির পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। কিন্তু সেই গণহত্যার স্বীকৃতি এখনো মেলেনি। স্বীকৃতি না মিললে বিচার হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে না। আর বিচার না হলে এ ধরনের অপরাধ ফের সংঘটনের আশঙ্কা থাকে। এজন্য জোরেশোরে দাবি উঠছে- এ স্বীকৃতি আদায়ের।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ডেও প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার মাটিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ১ লাখ মানুষ নিহত হন। নিউয়র্ক টাইমস অবশ্য এ সংখ্যা ৩৫ হাজার বলে দাবি করেছে। আন্তার্জাতিক মহলের হিসাবেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে তিন মিলিয়ন বা ত্রিশ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। শত শত বধ্যভূমি ও গণহত্যার শিকার লাখ লাখ পরিবারের সদস্যরা আজো বেঁচে আছেন। ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা বলছেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য মাত্র চার দশক আগে বিশ্বের সম্মুখে সংঘটিত গণহত্যা আজো বিশ্বের ইতিহাসে স্থান পায়নি। তাই আন্তর্জাতিক মহলে এত বড় হত্যাকাণ্ড অনুচ্চারিতই থেকে যায়। কেন ৪৮ বছর পরও একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি জরুরি এ প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধ সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের অন্যতম নেতা সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব ম. হামিদ বলেন, যে হত্যাকাণ্ডের বিচার হয় না, স্বীকৃতি মেলে না, সেটা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না। ৪৮ বছর পরও আমরা এ হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইছি আমাদের জন্য, আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য। কেননা গণহত্যার বিচার না হলে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

কলামিস্ট ড. নুজহাত চৌধুরী বলেন, ২০১৭ সালে জাতীয় সংসদ ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আরেক ধাপ আমরা অগ্রসর হলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী বলেন, আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে আমরা ২৫ শে মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গণহত্যা বিষয় রেজুলেশন যেদিন গৃহীত হয়, সেই দিনটিকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণা করে ২০১৭ সালে। কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বেগবান থাকলে সেভাবে প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে পারলে ২৫ মার্চকেই আমরা আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে দেখতে পেতাম।

রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল একে মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে এ স্বীকৃতি আদায় করা খুব সহজ হবে বলে আমার মনে হয় না। যেসব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য বিশেষ করে আমেরিকা যুদ্ধের গণহত্যাকারীদের পক্ষ অবলম্বন করেছে। সেই গণহত্যাগুলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বর্জিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি হত্যা, রুয়ান্ডা ও কম্বোডিয়ার মতো হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনাকে জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি জড়িত রয়েছে। পশ্চিমা বহুদেশ প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে ১৯৭১ সালে গণহত্যাকারীদের সমর্থন দিয়েছে। আমাদের গণহত্যার স্বীকৃতি সবার অমানবিক চেহারা উন্মোচন করবে। এটা তারা এত সহজে হতে দেবে তা আমার মনে হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. অসীম কুমার সরকার বলেন, বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিললে এবং বিচার হলে আজ হয়তো মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা হতো না। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর গণহত্যা চালিয়ে পার পেয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজ দেশে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে- বেলুচিস্তান তার করুণ উদাহরণ।

সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী বলেন, গণহত্যা একটি দুটি নয়- লাখ লাখ প্রাণের বিনাশ করে। সুতরাং এর ভয়াবহতা সবেচেয়ে বড়। তাই বারবার এ নিয়ে কথা বলতে হবে। জানতে হবে জানাতে হবে যতদিন না পর্যন্ত গণহত্যা নামক ভয়াবহতা থেকে এ পৃথিবীর প্রতিটি জাতিকে প্রতিটি অনাগত শিশুকে নিরাপদ রাখা না যায়।

মানবকণ্ঠ/এআর