গণশুনানি সফল করতে মরিয়া ঐক্যফ্রন্ট

গণশুনানি সফল করতে মরিয়া ঐক্যফ্রন্ট

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি ও কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বয়কট করেছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ভোটের পর পর পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি দিয়েছিল নির্বাচনকে সামনে রেখে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি, গণফোরামসহ সমমনা কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত এ জোটটি। কিন্তু কোনো কর্মসূচিই সাধারণ জনগণসহ রাজনীতির মাঠে কোনো সাড়া তুলতে পারেনি। ফলে হতাশ দলের শীর্ষ থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতারা। তাই আজকের গণশুনানিকে সফল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জোটটি। এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকও করেছেন দলের শীর্ষ নেতারা। আজ শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে ১০টা থেকে শুরু হবে এ গণশুনানি। গণশুনানিতে একাদশ নির্বাচনে কী ঘটেছিল, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রার্থীরা তুলে ধরবেন। এতে প্রার্থীসহ রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, চিকিত্সক, লেখক, সাহিত্যিক, এনজিও প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ও জেএসডির সভাপতি আ স ম রব মানবকণ্ঠকে বলেন, গণশুনানিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ঐক্যফ্রন্টের সব প্রার্থী, বামজোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, স্বতন্ত্রসহ সমমনা দলের প্রার্থীদের অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ করা হয়েছে। গণশুনানি সফল করার জন্য ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সরকার গণশুনানিটি বানচাল করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। আমরা গণশুনানি করব বলে সরকার আগে থেকে মাসব্যাপী সব হল বুকিং দিয়ে রেখেছে। আমাদের কোনো হল দেয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকারের পক্ষ থেকে যত বাধা-বিপত্তি আসুক আমরা গণশুনানি সফল করব।

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঐক্যফ্রন্ট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ক্ষমতাসীনদের হামলা ও মামলার কারণে তারা ভোটের মাঠে প্রচারণায় নামতে পারেননি। এমনকি ভোটের দিনও কেন্দ্রে যেতে পারেননি তাদের প্রার্থী ও ভোটাররা। নজিরবিহীন কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮ আসনে জয়লাভ করেছে। এদিকে ভোটের পরেও হামলা ও মামলার ভয়ে মাঠে নামতে চায়নি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তারা আন্দোলনে নিয়েছে ভিন্ন কৌশল। ঐক্যফ্রন্ট চাচ্ছে শান্তিপূর্ণ বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে কারচুপির ভোটের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা।

ভোটের পরপরই প্রথমে ৬ ফেব্রুয়ারি পরবর্তীতে তা পরিবর্তন করে ২৪ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের নিয়ে গণশুনানি কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল দলটি। এ লক্ষ্যে অনেক প্রস্তুতিও নিয়েছিল। গণশুনানির জন্য রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন, কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন, গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চ অথবা জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনকে স্থান হিসেবে বিবেচনা করেছিল ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু গণশুনানির স্থান নিয়ে দেখা দেয় নানা নাটকীয়তা। ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের দাবি, তারা এসব বিভিন্ন স্থান ভাড়া করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনোটাই বরাদ্দ পাননি। সরকারের পক্ষ থেকে সবগুলো স্থানই পুরো ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য বুকিং দিয়ে রাখা হয়েছে। যার ফলে বাধ্য হয়ে দু’দিন এগিয়ে আজ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এ গণশুনানি কর্মসূচীর স্থান চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ঐক্যফ্রন্ট নেতারা জানান, ‘মানুষ ৩০ নভেম্বর ভোটের নামে প্রহসন দেখেছে। মধ্যরাতে ভোটের বাক্স ভরে রাখা হয়েছে। দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় এসব খবর উঠে এসেছে। এই ভোট ডাকাতি এবং প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একটু সময় প্রয়োজন। আমরা সেই সময়টা নিচ্ছি। আজকের গণশুনানিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। তারা সবাই কথা বলবেন, মতামত দেবেন। সবার মতামত নিয়ে আমরা আমাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। এদিকে শুনানিতে ধানের শীষের প্রার্থীদের বাইরেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে যারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দফতর প্রধান জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু মানবকণ্ঠকে বলেন, ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাইরেও যেসব দল গত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সেসব দলকে গণশুনানিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তিনি জানান, ১৮টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের গণশুনানির জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনিসহ (মিন্টু) জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দফতরের অপর দুই সদস্য আজমেরী বেগম ছন্দা ও জাহাঙ্গীর আলম প্রধান মিলে ১৮টি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে গিয়ে চিঠি বিতরণ করেছেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত ওই আমন্ত্রণপত্রে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশিদ ফিরোজ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক মবিনুল হায়দার চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সদস্য শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন নান্নু, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক, চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।

গণশুনানিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব দল থেকে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা অংশ নিবেন বলে নিশ্চিত করেছে ঐক্যফ্রন্টের একাধিক সূত্র। তবে জামায়াতের যে ২৫ জন ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছেন তাদের বিষয়ে কিছু বলছেন না এই জোটের নেতারা। এ প্রসঙ্গে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য আব্দুল হালিম বলেন, আমাদের প্রার্থীরা থাকবেন কি না সেটা এখনই বলতে পারছি না। যদি সেখানে আমাদের প্রার্থীরা উপস্থিত হন সেটাতো দেখতেই পারবেন। তা প্রার্থীরা তুলে ধরবেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস