গণমাধ্যমে নেতৃত্ব ও অভিভাবকত্ব

রনি রেজা:
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নেতা ও নেতৃত্ব শব্দযুগল বহুল পরিচিত। সবার ওপরে একটি বিষয়ে বাঙালিদের আগ্রহ লক্ষ্যণীয়। আর তা হলো ‘রাজনীতি’। বাঙালি রাজনৈতিক প্রাণী। পেটে ভাত বা পকেটে কড়ি না থাকলেও চলে। কিন্তু রাজনীতি ছাড়া বাঙালি জীবন অচল। বলা যায় জন্মগতভাবেই বাঙালি রাজনৈতিক প্রাণী। চায়ের দোকানে, বাসে বা ট্রেনে, আড্ডায় বা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে অনায়াসেই উঠে আসে রাজনৈতিক আলোচনা। এটা শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিটি গোষ্ঠীই কোনো না কোনোভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রীয় উচু পর্যায় থেকে শুরু করে পাড়া মহল্লা এমনকি গ্রাম গঞ্জে প্রতিটি জায়গায়ই দেখা মেলে নানা ধরণের সংগঠনের। ব্যবসায়ী, খেলোয়ার, শিল্পী, উকিল, ডাক্তার থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালারা পর্যন্ত সাংগঠনিকভাবে সম্পৃক্ত। সবাই নানা নামে নানা ভাগে গোষ্ঠীবদ্ধ। এর পেছনেও থাকে সু-নির্দিষ্ট নেতৃত্ব। থাকেন নেতা। তা নিয়েও চলে নানা রাজনীতি। নেতা হন অনেকে সেবা করতে। অনেকে নিজ স্বার্থ উসুল করতে।
বর্তমানে বলা যায়, সাধারণদের ওপর ভর করে তর তর করে উঠে যাওয়ার নামই রাজনীতি। যে নেতা যত চতুরতার সঙ্গে নিজেকে এগিয়ে নিতে পারেন বলা হয় তিনি তত ভালো রাজনীতিবিদ। তিনি তত ভালো রাজনীতি বোঝেন। প্রতারিত হয়ে অনেক সময় সেই নেতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সাধারণরা। তুলে আনেন নতুন কাউকে। আবার শুরু হয় স্বপ্ন দেখা। বাঙালি স্বপ্নবাজ জাতি। আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। একসময় আমরা স্বপ্ন দেখলাম, মুসলমানের আলাদা দেশ হলে আমরা ভালো থাকব, সুখে থাকব। আমরা ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ হুংকার দিয়ে ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্র তৈরি করলাম। কিন্তু মোহভঙ্গ হতে দেরি হয়নি। ভাষার প্রশ্নে আমরা উপলব্ধি করলাম, আমরা ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়েছি। পঞ্চাশ আর ষাটের দশকজুড়ে আমরা স্বপ্ন দেখেছি একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাওয়ার। সে জন্য লড়াই-সংগ্রাম হয়েছে। অগুনতি মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে একটি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন এক দেশ পেলাম-বাংলাদেশ। কিন্তু শুরুতেই আমরা হোঁচট খেলাম। গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হলো। বৈষম্য বাড়তেই লাগল। আজও সে ধারাবাহিকতা চলমান। ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ গাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গণমাধ্যমের নেতৃত্ব নিয়ে কিছু বলার প্রয়াস। অন্যান্য সব গোষ্ঠীর মতো সাংবাদিকদেরও সংগঠন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বলা যায়, একটু বেশিই রয়েছে। দিনে দিনে যে হারে বাড়ছে সাংবাদিকের সংখ্যা সমান হারে বাড়ছে সাংবাদিক সংগঠনের সংখ্যা। বাড়ছে নেতার সংখ্যা। নেতার ব্যাখ্যায় একটি শব্দই ব্যবহার করা যায়। তা হলো ‘অভিভাবক’। কিন্তু বর্তমান সময়ের কতজন নেতার মধ্যে এই অভিভাবকত্ব রয়েছে? আমরা নেতা পাচ্ছি গ্লায় গ্লায় কিন্তু অভিভাবক কি পাচ্ছি সেভাবে? এখানেও দেখা মেলে সুবিধা সন্ধানী নেতাদের। আবার সাধারণদের অধিকার আদায়ের নেতাও রয়েছেন। যদিও তা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এত সংগঠন, এত নেতা থাকা সত্ত্বেও গণমাধ্যমকর্মীদের সমস্যার সমাধান সেভাবে হচ্ছে না। বরং বাড়ছে অনেকটা। তবুও আমরা আশ্রয় খুঁজি। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আসে। নেতৃত্বে আসে নতুন মুখ। পুরাতনরা যারা অভিভাবক্তসুলভ আচরণ করতে পেরেছেন বা সাধারণ সাংবাদিকদের পাশে থেকেছেন তাদের বারবার অভিভাবকের আসনে রাখা হয়। তাদের কাছে প্রত্যাশাও থাকে বেশি। থাকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব নিকাশ। সাংবাদিকদের বলা হয় রাষ্ট্রের পাহারাদার। গণতন্ত্রের পাহারাদার। আর সেই সাংবাদিকদের পাহারাদার হচ্ছে সাংবাদিক সংগঠনগুলো। ঢাকায় অনেকগুলো সাংবাদিক সংগঠন রয়েছে। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগঠন হিসেবেই পরিচিত এগুলো। দিনে দিনে এর সংখ্যাও বাড়ছে। তবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) প্রতি নির্ভরতা একটু বেশিই থাকে। কারণও স্পষ্ট। এরমধ্যে আবার ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) গুরুত্ব ভিন্ন। ঢাকার সাংবাদিকরা নানাভাবে নির্যাতিত হন বেশি। এ সময়ে যে সংগঠনগুলোকে পাশে পাওয়া যায় তার মধ্যে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন অন্যতম। তাই এ ইউনিয়নকে ঘিরে ঢাকার সাংবাদিকদের মধ্যে উৎসাহ উদ্দিপনা সব সময়ই বেশি লক্ষ্য করা যায়। যদিও রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিত্বে সংগঠনটি এখন দ্বিখণ্ডিত ১৯৯৩ সালে সাংবাদিক ইউনিয়নসমূহ দ্বিখন্ডিত হয়। তবে এরপরও উভয় গ্রুপের শীর্ষ নেতারা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে বেশ ভালোই আছেন। শুধু বিভাজন জনে জনে। এমনকি দ্বিখন্ডিত ইউনিয়নের নেতারা এক হয়ে ‘সাউথ এশিয়ান জার্নালিস্ট ফোরাম’ গঠন করে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করলেও তাদের মধ্যে ভিন্ন মতের প্রকাশ ঘটেনি। সাংবাদিকদের রুটি রুজির সংগঠন সাংবাদিক ইউনিয়নকে এক করতে বলা হলে দলীয় চেতনা জাগ্রত হয় উভয় গ্রুপের নেতাদের মধ্যে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগ থেকেই গণমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। এরপর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনষাটের গণঅভূত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলনেই সাংবাদিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এখন পর্যন্ত দেশের যে কোনো আন্দোলন বা অধিকার আদায়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে দেশীয় গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমনকর্মীরা। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায় এ গণমাধ্যমকর্মীদের অধিকার কি বাস্তবায়ন হচ্ছে? ঢাকা শহরে এত এত সংগঠন থাকতেও অনেক সাংবাদিক বেতন না পেয়ে প্রতিনিয়ত ভুগছেন। অসহায়ভাবে ঘুরে বেরাচ্ছেন। মালিকপক্ষ ঠিকই দাপটের সঙ্গে অস্বীকার করছে শ্রমিকের পাওনা। গত বছরেই দেখেছি দৈনিক ইনকিলাব ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল যমুনা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাংবাদিকদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাওনা আদায়ের আন্দোলন করতে দেখা গেছে। এ সময়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোও পাশে ছিল। শ্রমিকদের সঙ্গে লড়েছেন। ফল যেটাই হোক দুর্দিনে অভিভাবকদের পাশে পেলে সাহস, শক্তি অনেকগুণে বেড়ে যায়। দিন শেষে খালি হাতে বাসায় ফিরলেও সঙ্গে থাকে আত্মতৃপ্তি। পাশে দাঁড়ানো নেতাদের প্রতি থাকে কৃতজ্ঞতা। মনে মনে যপতে থাকি মহান সেই নেতাদের নাম। দল-মত নির্বিশেষে সেই সাংবাদিক থাকেন সব কিছুর উর্ধে। উদাহরণ হিসেবে সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদের নাম বলাই যায়। বর্তমানে এমন অনেক সাংবাদিকই নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বিপদে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। আবার যারা একবার নির্বাচিত হয়ে শ্রমিকদের পাশে না দাঁড়িয়ে আরাম চেয়ারের স্বাদ নিতে ব্যস্ত থাকেন তারা হারিয়েও যাচ্ছেন অগোচরে। প্রতি দুই বছর পর পর নির্বাচন করা হয় সাংবাদিকদের অভিভাবক। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের অভিভাবক নির্বাচনে আশাকরি যোগ্যদেরই বেছে নেয়া হবে। যার প্রতি ভরসা থাকে, বিশ্বাস থাকে, আস্থা থাকে তাকেই বসানো যায় অভিভাবকের আসনে। এবার যারা অভিভাবকত্বেও আসনে বসবেন তাদের প্রতিও আমাদের আস্থা আছে। আছে কিছু প্রত্যাশাও। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান কৌশল হিসেবে নিয়োগ পত্র না দিয়েই সাংবাদিক নিয়োগ দেন। যেন পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়ে আইনি সহায়তা না পায়। সাংবাদিকরাও নিরুপায় হয়ে চাকরি হারানোর ভয়ে মেনে নেন।
এরকম অসংখ্য ফাঁক ফোঁকর নিত্য তৈরি করে সাংবাদিক ঠকানোয় লিপ্ত রয়েছে নতুন নতুন কিছু প্রতিষ্ঠান। আশাকরি নতুন নেতৃত্ব এসকল বিষয়ে কাজ করবেন। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে মালিকপক্ষের বিপক্ষে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে কার্পণ্য করবেন না। সাংবাদিকদের ভালো থাকার ব্যবস্থা হবে। আমার বিশ্বাস সাংবাদিকরা ভালো থাকলে ভালো থাকবে দেশ। ভালো থাকবে সমাজ। সাংবাদিকদের কাজ অধিকার আদায়ে রাজপথে নামা নয়। সাংবাদিকদের কাজ দেশের স্বার্থ নিয়ে ভাবার। দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা। এ সকল বিষয়ে আমাদের নতুন অভিভাবকরাও কাজ করবেন। নির্বাচনে জয়ী হলে নেতা হয়ত হওয়া যায় কিন্তু অভিভাবকের জায়গাটা দখল করে নিতে হয়ে মমতা দিয়ে। পাশে থেকে। সেটার জন্য নির্বাচনে জয়ী হওয়া জরুরি নয়। আমরা অভিভাবক চাই। নেতা নয়।