গণমাধ্যমে নারীর অবস্থান

গণমাধ্যমে নারীর অবস্থান

মানব সমাজ সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে আমাদের গণমাধ্যম। আধুনিক বিজ্ঞানের কৃপায় গণমাধ্যম হিসেবে একে একে আবির্ভূত হয় সংবাদপত্র, বেতার, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, অনলাইন, সিডি টেপরেকর্ডার ইত্যাদি। ইলেকট্রিক মিডিয়া বিনোদনের খোরাক আর তাজা খবরের জন্য জনপ্রিয় হলেও সংবাদপত্র আনন্দ বিনোদনের তুলনায় অধিক বার্তা পরিবেশক ও জ্ঞান প্রদায়ক হিসেবে পরিচিতি পায়। দেশ-বিদেশের হরেক রকম খবরের ডালি নিয়ে সংবাদপত্র মানুষের মনের দ্বারে দ্বারে হাজির হয়। মেটায় পাঠকের জ্ঞানপিপাসা।

গণতন্ত্রের সদাজাগ্রত প্রহরী গণমাধ্যমের একটি বিশেষ জায়গা হলো সাংবাদিকতা। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৪৭ বছর। আর সাংবাদিকতায় নারীর পদচারণা শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার একমাস আগে বেগম পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়। এই সাময়িকীর সম্পাদক নূর জাহান বেগমের হাত ধরেই মূলত নারীরা সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ করেন। আর ৬০’-এর দশকে হাসিনা আশরাফ, নিশাত সাদানী, (শহীদ সাংবাদিক) সেলিনা পারভীন তা এগিয়ে নিতে চেয়েছেন।

আমরা বুঝতেই পারি স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই আমাদের নারীরা সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। এত বছর পর কোনো অবস্থানে আছে আমাদের সাংবাদিকতার নারীরা আর তাদের অবস্থান, তাই একটু দেখা। দেশে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও গণমাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষের জেন্ডার সেন্সিটিভিটি না থাকাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের না থাকার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে নারীর পারিবারিক আর সামাজিক চাপও তাকে পিছিয়ে রাখছে বলে মন্তব্য তাদের। তবে অতীতের তুলনায় বর্তমানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ধীরে ধীরে দেশের গণমাধ্যমে নারীর সংখ্যা বাড়ছে এটাও তারা বলছেন বিভিন্ন সেমিনারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে কতজন নারী সাংবাদিক কর্মরত আছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই। তবে, এ পেশায় নারীর অংশগ্রহণ এখন চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় নারীদের অংশগ্রহণ ও তাদের সফল পদচারণা রিপোর্টিং থেকে শুরু করে নিউজরুম সর্বত্র বিরাজমান। অন্যদিকে নারী সাংবাদিক বৃদ্ধির পাশাপাশি সাংবাদিক নেতৃত্বেও নারীদের অংশগ্রহণ দারুণভাবে দৃশ্যমান।

সাংবাদিকতায় নারীর অংশগ্রহণ বা অবস্থান নিয়ে লিখতে বসলে বা কথা বলতে গেলেই মনে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের কথা। ১৯৬৯ সালে শিলালিপি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। বিভিন্ন কাগজে লিখতেন তিনি। সাংবাদিকতায় তার নিরলস কাজ আর পাক বাহিনীর বিভিন্ন অসামাজিক কাজের চিত্র তুলে ধরেছেন শিলালিপি পত্রিকায়। সেই অপরাধে ১৯৭১-এর ৩ ডিসেম্বর নিজ বাসভবন (বর্তমান সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক) মালিবাগের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রায়ের বাজারে তার লাশ পাওয়া যায়। পরনের পোশাক পায়ের মোজা আর সেন্ডেল দেখেই শনাক্ত করা হয় তাকে। এই বীর নারীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ভালোবাসা চিরস্মণ।

চ্যালেঞ্জিং পেশার নাম সাংবাদিকতা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা নারী-পুরুষ সবার পেশা, কিন্তু দেখা যায় সাংবাদিকতা পেশায় পুরুষের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণ নিতান্তই কম।

তবে দেড় যুগ আগের তুলনায় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকতায় নারীদের হার এগিয়েছে অনেক দূর। মাড়িয়েছে এসেছে তারা অনেকটা পথ। বিপুল সংখ্যক নারীরা সাংবাদিকতায় আসছেন। সংবাদপত্র, রেডিও-টিভি, অনলাইন প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারী সাংবাদিকদের দীপ্ত পদচারণা লক্ষণীয়। এখন অজপাড়ায় গাঁ থেকে রাজধানীর অলিগলির অনেক অজানা খবরও পুরুষের পাশাপাশি নারী সাংবাদিকরা নিপুন দক্ষতার সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন ১৯৯৮ সালে তাদের ‘উইমেন ইন জার্নালিজম’ কর্মসূচির আওতায় ঢাকার ২০টি দৈনিক ৩টি ম্যাগাজিনে এবং ৫টি সংবাদ সংস্থার ৬৯ জন নারী সাংবাদিকদের মধ্যে একটি জরিপ পরিচালনা করে।

এ জরিপে দেখা যায় সমগ্র সংবাদ মাধ্যমে ৭ শতাংশ সংবাদকর্মী নারী। তাদের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ প্রতিবেদক। তবে আশার কথা হলো নারীরা এখন আর শতকরা ২ শতাংশে আটকে নেই। কারণ নারী প্রতিবেদকদের অধিকাংশেরই সাংবাদিকতা জগতে প্রবেশ ১০ বছর হয়নি এবং তাদের বয়সও ত্রিশের গণ্ডি পার হয়নি।

সাংবাদিকতার একটি অংশ রিপোর্টিং যেখানে নারীদের এই ব্যাপক অংশগ্রহণ। সেখানে সাংবাদিকতার সকল অংশ মিলে নারী সাংবাদিকদের শতকরা হার ১০-১২ শতাংশের নিচে নেই। নবীনদের আগমনে সাংবাদিকতায় নারীদের অবস্থানগত পরিবর্তন আজ বাস্তবতা। ২০১৩ সালের ১৪-১৬ মে পিআইবি ও নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী ৭০ জন নারী সাংবাদিক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নেন। তারা নারী সাংবাদিক নয় শুধুমাত্র সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

গণমাধ্যমে নারী উপস্থিতির একটি পরিসংখ্যানে বলা হয়, বর্তমানে জাতীয় প্রেসক্লাবে স্থায়ী সদস্য ১২৫২ জন। এর মধ্যে নারী মাত্র ৭২ জন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ছয় হাজার সদস্যের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৫০ জন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির দেড় হাজার সদস্যের মধ্যে নারী মাত্র ১০৪ জন। গতবছর নারী দিবসে গণমাধ্যমে নারী ও পুরুষ কর্মীদের বৈষম্য দূর করার তাগিদ দিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু প্রতিটি গণমাধ্যমে নিজস্ব নীতিমালা প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে ৩০ ভাগ নারীকর্মী নিয়োগ, আলাদা রেস্টরুম, দিবা শিশু যতœ কেন্দ্র, আলাদা টয়লেট, যৌন হয়রানি বন্ধে প্রতিরোধ কমিটি গঠনসহ নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মনিটরিং সেল গঠনে মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

গণমাধ্যমে নারীর বঞ্চনা, বাণিজ্যিক উপস্থাপন ইত্যাদি নানা বিষয় রয়েছে বিতর্ক। কর্মক্ষেত্রের বিরূপ পরিবেশ, সম্পাদকীয় বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির চাপে নারীর অসহায়ত্বও বর্তমান। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার অনলাইন সংবাদমাধ্যম, অনুমোদিত প্রিন্ট পত্রিকা রয়েছে প্রায় তিন হাজার, আর ইলেকট্রিক মিডিয়ার টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে প্রায় ৩০টি। শুনতে পাচ্ছি প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ১১টি। এই সবের পাশাপাশি এফএম রেডিও-কমিউনিটি রেডিও, অনলাইন রেডিও-টেলিভিশ তো আছেই। পূর্ব ইউরোপের ৮৫টি গণমাধ্যমে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। অন্যদিকে এশিয়া মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১০টি দেশে সাংবাদিকের মধ্যে নারীর প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে কম। সেই ১০টি দেশের মাঝে বাংলাদেশও একটি। বাংলাদেশে বর্তমানে দেখা যায়, সংবাদপত্রের সাংবাদিকতার চেয়ে টেলিভিশনে নারীর সংখ্যা বেশি। আর সংবাদপত্রে মাঠপর্যায় এবং অফিসিয়াল দুই ক্ষেত্রেই কম। উপস্থাপনা ও সংবাদ পাঠে নারীর সুন্দর মাধুর্য আচরণ, দর্শকনন্দিত হওয়ায় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নারীদের বেশি চোখে পড়ে।

যে সব কারণে সাংবাদিকতায় আশানুরূপ নারীদের দেখা যাচ্ছে না তার কয়েকটি দিক হলো-

কর্মপরিবেশ কতটা নারীবান্ধব
সাংবাদিকতায় মেয়েরা বেশিদিন টিকে থাকতে না পারার পেছনে বিশেষ কারণ কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ। একজন নারীর সঙ্গেই অতপ্রতভাবে জড়িয়ে আছে সংসার, নারীরা সে সংসারকে সামলিয়েই আসে কাজ করতে, কিন্তু সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে অনেক সময় তাদের অনেক কিছু ছাড় দিতে হয়। বাংলাদেশ শ্রম আইনের অষ্টম অধ্যায়ের ৯৪/(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সাধারণত: চল্লিশ বা ততোধিক মহিলা শ্রমিক নিয়োজিত আছেন এরূপ প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে তাহাদের ছয় বৎসরের কম বয়সী শিশু সন্তানগণের ব্যবহারের জন্য এক বা একাধিক উপযুক্ত কক্ষের ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।’

বাস্তবে আমাদের দেশে এমনটি খুবই কম আছে। ব্যবস্থাপনার অভিযোগ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীর সংখ্যা কম থাকায় শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র গুরুত্ব পায়নি। অন্যদিকে নারী সাংবাদিকদের অভিযোগ পরিবেশ নেই বলেই নারীরা টিকতে পারে না। সন্তান হওয়ার আগে ঠিক কাজ করতে পারে, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তারা চলে যেতে বাধ্য হয়। কর্মপরিবেশ নিয়ে একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিবেদক ফারজানা রুপা বলেন, ‘বার্তাকক্ষের চরিত্রটাই নারীবান্ধব নয়’ বার্তাকক্ষ মানে হলো ২৪ ঘণ্টা। আমি আজ সকাল ৮টায় অফিসে এসেছি, সারাদিন কাজ করেছি, আমি রাত দেড়টা-দুইটায় বাসায় যাব।’ এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের জন্য ‘ডে কেয়ার সেন্টার’, ‘ফ্রেশ হওয়ার জন্য রুম’, ‘ভালো টয়লেট এবং বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা থাকা নারী সাংবাদিকদের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এগুলোর কিছুই কোনো বার্তাকক্ষই নেই।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে এখনো সেভাবে মেনে নিতে পারে না। যেমন নারীকে তারা নিজেদের অধীন মনে করে থাকে। তারা ধরেই নেয়, নারী উল্লেখযোগ্য কিছু বা ভালো কিছু করতে পারবে না। এটা মনস্তাত্ত্বিক বাধা বলতে পারি। নারীর প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক নয়। এসব কারণে নারী উচ্চপদে আসতে চাইলে বিভিন্ন প্রতিকূলতা সৃষ্টি হয়।’

সাংবাদিকতায় নারী বিষয়ে নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নী বলেন, ‘পুরুষের চেয়ে নারীরা কর্মক্ষেত্রে এসেছেন দেরিতে। গণমাধ্যমেও পুরুষদের অনেক পরে নারী দৃশ্যমান হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই ওপরের পদগুলোতে আছেন পুরুষরা। এটাই বাস্তবতা। এরপরও যেসব নারী সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন, তাদের পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক প্রতিকূলতা। কারণ, কর্মক্ষেত্রে এখনো ওই অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের দেখতে অভ্যন্ত নয় কেউ। এই অনভ্যস্ততার কারণে বড় পদে যেতে নারীকে অনেক প্রতিযোগিতা করতে হয়। সেই প্রতিযোগিতা কখনো কখনো পক্ষপাতদুষ্টও হয়। তবে মাঝে মধ্যে তা নিরপেক্ষও হয়। কিন্তু আমার মনে হয়, কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকে যা পেরোনো যায় না। আমি নিজেকে দিয়ে বলতে পারি, ১৮-১৯ বছর পেরিয়ে একটা জায়গায় এসেছি। এটা একটা দীর্ঘপথের যাত্রা। এই পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে মনোবল ধরে রাখতে হয়।’

মাতৃত্ব ও পারিবারের দায়িত্ব
যখন-তখন নারী-কর্মীদের পাঠানো যাবে না বলেও প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের নিয়োগ দিতে অপরাগতা দেখায়। মেয়েরা রাত-বিরাতে ঘর থেকে বের হতে হবে বলেও অভিভাবকরা দিতে চায় না। এই দু’পক্ষের হীনমন্ন্যতার কারণে আজও গণমাধ্যমে নারীর সংখ্যা আশানুরূপ হচ্ছে না। দীর্ঘদিন একই স্থানে কাজ করার পর সন্তান হওয়ার সময় মাতৃত্বকালীন ছুটি চাওয়ায় চাকরি হারানো, বা মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে আসার পর আগের জায়গায় কাজ না পাওয়ার ঘটনা আমাদের গণমাধ্যমগুলোতে বহু আছে। যদিও সরকারিভাবেই ঘোষণা আছে একজন মা মাতৃত্বকালীন ছুটি হিসেবে দুইবার ছয়মাস করে ছুটি পাবেন।

সাংবাদিকতায় টিকে থাকার জন্য দক্ষতা বাড়ানো, পরিশ্রম করার সঙ্গে সঙ্গে অফিস ও পরিবারের সাপোর্টটাও মেয়েদের খুবই জরুরি। অন্য চাকরিতে যেমন ৯টা-৫টা অফিস, গণমাধ্যমে কিন্তু তা নয়। সাংবাদিকতা পেশাটা সরকারের অধীনে নয় এবং সুযোগ-সুবিধা কম বলে এই পেশা থেকে নারীদের ঝরে পড়ার হার বেশি।

সন্তান হওয়ার আগে একটা মেয়ের রুটিন থাকে এক, আর সন্তান হলে হয়ে যায় অন্য। পরিবার সহযোগিতা করলেও সন্তানের জন্য মাকে খুব প্রয়োজন বলে ডাক পড়লেও অনেক সময় নারী সাংবাদিকরা বের হতে পারে না, তখন তাকে পেশার চেয়ে নিজের মাতৃত্বকেই প্রাধান্য দিতে হয় বেশি।

মেয়েরা নিজেদের ঘাটতির জন্য কর্মস্থলে যেতে পারছে না, এটা একটা দিক। ঘাটতি কিন্তু সক্ষমতা বা যোগ্যতার ঘাটতি নয়, সমাজ ও সংসার তাকে টেনে ধরে। নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা বলেন, ‘একজন বিখ্যাত সাংবাদিকের মেয়ে, সে ম্যাটারনিটি লিভ চেয়েছে, তাকে অন্য কী বলে টার্মিনেট করে দিয়েছে। তারপর সে অন্য পেশায় চলে গেছে, এগুলো অনেক আছে।’

বলতেই হয় একজন বিখ্যাত সাংবাদিকের মেয়ের ক্ষেত্রে যখন এমন হয় তখন অন্যদের ক্ষেত্রে কি হয় তা অনুমান করার অপেক্ষা থাকে না। নেতৃত্ব স্থানে নারীদের এগিয়ে আসার খুবই প্রয়োজন। একজন নারী নেতা যেভাবে সাংবাদিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে কথা বলবেন, ততটা আন্তরিকভাবে একজন পুরুষ নেতা করবেন না। সন্তানের জন্য ‘ডে কেয়ার সেন্টারের’ অবশ্যকতা যতটা গুরুত্ব পাবে একজন নারী সাংবাদিকের কাছে, ততটা পুরুষ সাংবাদিক নেতার কাছে আশা করার মতো সময় এখনো আমাদের দেশে হয়নি।

বেতন বৃদ্ধি ও জরিপ
৭ এপ্রিল, ২০১৮ রোজ শনিবার বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট, জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিসিডিজেসি) আয়োজিত এক জরিপে বলা হয়-সাংবাদিকদের মধ্যে ১৭ জন মাসে এক লাখ টাকার বেশি বেতন পাচ্ছেন। ১৭ সাংবাদিকের মধ্যে দৈনিক প্রথম আলোতে রয়েছেন ৫ জন। এছাড়া ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার, ৭১ টেলিভিশন, নিউজ ২৪, ডিবিসি নিউজ, আমাদের অর্থনীতি, এটিএন নিউজ এবং চ্যানেল আইতে বাকি ১২ নারী সাংবাদিক শীর্ষ পদগুলোতে কাজ করছেন। ১৭ নারী সাংবাদিকদের মধ্যে ৫ জন ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন। এক লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ ৪৯ হাজার টাকার মধ্যে বেতন পাচ্ছেন অন্তত আরো ৫ জন নারী সাংবাদিক। আর ৯৯ হাজার থেকে এক লাখ ৪৯ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন আরো ৭ নারী সাংবাদিক। সাংবাদিকদের জন্য প্রচলিত ওয়েজ বোর্ডের মধ্যে উচ্চতর ধাপে এসব নারী সাংবাদিক বেতন পাচ্ছেন বলে জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তিনি বলেন-‘করুণা ভিক্ষা নয়, নারীদের নিজেদের যোগ্যতা বেশি করে প্রমাণ করতে হবে। দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগসহ অনেক ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। সাফল্য দেখাচ্ছে। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য এখনো দৃশ্যমান। দেশের সাংবাদিকতার নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাংবাদিকতায় নারীকে যোগ্যতা দিয়েই সফল হতে হবে। বাধা থাকবে। সেই বাধা ভেঙে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো মেয়েকে যেন বলতে না হয়, নারী হয়ে জš§ নেয়াটা অপরাধ।’

জরিপ উপস্থাপনের সময় আইসিএস-এর নির্বাহী পরিচালক নাঈমা নার্গিস জানান, দেশের সংবাদ মাধ্যমের ১৭ নারী সাংবাদিকের ওপর জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করা হলেও দেশের যেসব সংবাদ মাধ্যমে এসব নারী সাংবাদিক কাজ করেন সেই সংবাদ মাধ্যমগুলোর নাম জানানো হয়েছে। আলোচনায় বক্তরা বলেন, বর্তমানে টেলিভিশন চ্যানেলের কল্যাণে দেশে নারী সাংবাদিকদের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু এখনো সাংবাদিকতায় নারীর অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয়।

প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও অধিক রাতের ডিউটি
প্রতিষ্ঠান বন্ধের একটা বিশাল প্রভাব পড়ে নারীদের ওপর। প্রতিষ্ঠান বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পেশাও কিন্তু চলে যায়। ছেলেরা অন্যখানে খোঁজ নিয়ে বা লবিং করে যেতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা হতাশ হয়ে যায় বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তারা আর কোনো প্রতিষ্ঠানে যায় না। হয়তো তারা ওই রকম লবিং করতে পারে না। সিনিয়র হওয়ার পর কোনো কারণে চাকরি চলে গেলে বা কোনো কারণে চাকরিচ্যুত হলে তারা আর এগোয় না।

বেশি রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হবে কাজ করতে হবে এমন সিনিয়র পদ পেলেও অনেক সময় নারীদের সে পদ হারাতে হয়। কারণ কাজ সেরে অধিক রাতে বাসায় ফিরলে তাদের নানা গঞ্জনা শুনতে হয়। আবার পরিবারে ওর যে কাজ তা করতে পারে না বলে নিজেই নিষেধ করে দেয়। এখানে পরিবারে সমযোতার অভাব অনেকখানি।

অপশক্তির প্রভাব
গণমাধ্যম সত্য ও ন্যায়ের পথে নির্ভিক বিবেকবানদের হাতে পরিচালিত না হয়ে যদি স্বার্থন্বেষী অপশক্তির হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়; তবে তা সভ্যসমাজের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়। গণমাধ্যম যেমন একটি জাতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, তেমনি সুপ্রতিষ্ঠিত জাতিকে ধ্বংসও করতে পারে। যে কোনো দেশের সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা, পরিকল্পনা-পররাষ্ট্রনীতি, বিরোধী দলের ভূমিকা তাদের আন্দোলন-সংগ্রামের স্বরূপ প্রভৃতি বিষয়। জনগণকে সম্যক রূপে অবহিত করার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য। আমাদের দেশের সংবিধানে স্বাধীনভাবে অভিব্যক্তি প্রকাশের বিষয়টিকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সাংবাদিকরা নিজেরাও মনে করেন যে, বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় নীতিগত মান সন্তোষজনক নয়। তবে এর ব্যাখ্যা ও সুস্পষ্ট নয়। যেখানে গণমাধ্যমে প্রবেশের মূল লক্ষ্য থাকে সহমর্মিতা, আত্মবিশ্বাস, সত্য, স্বাধীনচেতনা, দলীয় মুক্তি, চিন্তা-চেতনা ইত্যাদিকে বেশি প্রাধান্য দেয়া।

যাতায়াত সমস্যা
টেলিভিশনে সংবাদ সংগ্রহের কাজ করেন যে সব নারীরা তারা পরিবহনের সুবিধা পেলেও অন্য কোনো নারী সাংবাদিকরা পরিবহন সুবিধা পান না। ফলে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে গণপরিবহন তাদের ভরসা।

আর বর্তমান গণপরিবহন নারীদের জন্য কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। নারী বান্ধব গণপরিবহন যে কয়েকটি আছে তা ঢাকা শহরের মেইন মেইন সড়কেই চলে সড়কগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় এগুলো খুবই কম। আর শহরের বাহিরের অবস্থাতো অনেক খারাপ।

সাংবাদিকদের ছুটতে হয় অলিতে গলিতে, যখন যেখানে প্রয়োজন হয়, সেসব জায়গায় পাবলিক গণপরিবহনের কোনো কাজ নেই। চ্যানেল আইতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন মিথিলা হাবিবা নাজনীন। তিনি বলেন, ‘একজন পুরুষ যখন সংবাদ সংগ্রহ করতে যান তখন একটা জটলার মধ্যে ভিড় ঠেলে প্রবেশ করাটা যতটা সহজ হয়, একজন নারীর জন্য ততটা হয় না। অনেক সময় ইচ্ছে করে আরো বেশি জটলা তৈরির চেষ্টা করে, একটু হয়রানি করার চেষ্টা করে, কিংবা অনেক সময় বাজে টোন শুনতে হয়।’

যৌন হয়রানি
আর্টিকেল নাইনটিনের একটি গবেষণায় বলা হয়, ৪০ শতাংশ নারী সংবাদকর্মী যৌন নিপীড়নের শিকার হন এবং তারা নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রতিবাদ করেননি একমাত্র চাকরি হারানোর ভয়ে। নারী সাংবাদিকদের অভিযোগ আমাদের অনেক বার্তাকক্ষ পুরুষরাই আধিপত্য বিস্তার করে, এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী পর্যায়ে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা খুব কম। এজন্য কোনোভাবে নির্যাতন হলে তারা অভিযোগ করার জায়গা পায় না। বার্তাকক্ষে যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে সব ধরনের বৈষম্যপূর্ণ ঘটনার শিকার হতে হয় বলে ব্যক্ত করেছেন ফারজানা রূপা। যৌন নিপীড়ন বন্ধে ২০০৯ সালের ১৫ মে হাইকোর্টের প্রণীত নীতিমালায় দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানির বিষয়ে বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট অভিযোগ কেন্দ্র গঠন করাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু কোনো সংবাদ মাধ্যমেই যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেল বা কমিটি নেই। প্রথম আলোর মানসুরা বলেন, ‘আমাদের অফিসে যৌন হয়রানি বন্ধের একটা কমিটি থাকলেও হাইকোর্টের রুল অনুযায়ী যেভাবে থাকার কথা সেভাবে নেই।’

বৈষম্যপূর্ণ কর্মক্ষেত্র
বিভিন্ন গণমাধ্যমে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী পর্যায় ও উচ্চপদে আছেন এমন নারীর সংখ্যা মাত্র ৩০ জন। বর্তমান সময়ে এই সংখ্যাটা আরো বেশি হওয়া প্রয়োজন ছিল। কর্মক্ষেত্রে নারী সাংবাদিকদের বিভিন্ন ধরনের ‘বৈষম্যমূলক’ আচরণের শিকার হতে হয় বলে সিনিয়ার পর্যায়ে যাওয়ার আগেই তারা চাকরি থেকে ঝরে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলে বিবেচনা করে নারী সাংবাদিকদের পাঠানো হয় না বললেও নারীদের বক্তব্য একই সঙ্গে কাজ করার পরেও বড় কিছু ঘটলে বা বড় ইভেন্ট থাকলে সেখানে পুরুষ সহকর্মীকে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করছেন তারা।

‘আর্টিকেল ১৯’-এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, নারী সাংবাদিকরা কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং সেন্সরশিপের শিকার হন। ৬৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রকাশে বাধার সম্মুখীন হন।

কর্মক্ষেত্র বৈষম্যপূর্ণ আচরণ নিয়ে সাংবাদিক নাসিমুন আরা হক বলেন, ‘মেয়েদের ভুলগুলো অনেক বড় করে দেখা হয় এবং অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা অনেকক্ষেত্রেই ছেলেদের সঙ্গে করা হয় না। অনেক সংবাদপত্রেই সরকারের নির্ধারিত বেতনকাঠামো (ওয়েজবোর্ড) অনুযায়ী বেতন দেয় না, তখন নারী সাংবাদিকরা বেশি বৈষম্যের শিকার হন।’

পরিসংখ্যান
নারী সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ১৯৮৭ সালের বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) এক জরিপ বলছে, ঢাকায় ২৪১টি পত্রিকায় কর্মরত পুরুষ সাংবাদিক ছিল ৯০০ জন। এর বিপরীতে নারী সাংবাদিক ছিল মাত্র ৩৪ জন। শতকরা হিসেবে ঢাকায় তখন নারী সাংবাদিকের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।

ঢাকা সাব এডিটরস কাউন্সিল ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির তালিকা অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ঢাকায় পুরুষ সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৩২ জনে (৮৭ শতাংশ); নারী সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে ৩১০ (১৩ শতাংশ) জনে উন্নীত হয়েছে। জাতীয় সংসদে দেয়া সরকারের তথ্য মতে তিন দশক পর ২০১৮ সালে সংবাদ মাধ্যমের সংখ্যা ৩ হাজার ২৬৩ টিতে দাঁড়িয়েছে।

সাংবাদিকতায় নারীর অবস্থা নিয়ে লিখতে এসে অভিনন্দন জানাই দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক তাসমিমা হোসেনকে। এ বছর জুলাই মাসের প্রথম সাপ্তাহে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খবরের কাগজ ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর সম্পাদক-এর দায়িত্ব লাভ করলেন তাসমিমা হোসেন। এই প্রথম আমাদের দেশের কোনো দৈনিকের সম্পাদকের আসনে একজন নারী। এর আগে ২০১৪ সাল থেকে তিনি দৈনিকটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাসমিমা হোসেন ১৯৮৮ সাল থেকে পাক্ষিক ম্যাগাজিন ‘অনন্যা’ প্রকাশ এবং এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার সুযোগ্য সম্পাদনায় ম্যাগাজিনটি জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এক সাক্ষাৎকারে নারী সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন- ‘আমি পারি না, পারব না এ অবস্থা থেকে বেড়িয়ে এসে মনবল সবল করে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে আমাদের নারীদের। নারীরা এখন অনেক অগ্রগামী। তারপরও পুরো সচেতন নয়। আমরা যাকে পুরুষতন্ত্র বলি তা কিন্তু অনেক নারীর মধ্যে তীব্রভাবে বিদ্যমান। নারীরাই নারীদের দমিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। কিসে আমাদের আসলেই সফলতা সেটা বুঝতে হবে। ১৯৮৮-তে অনন্যা যাত্রা শুরু করে। তখন নারীদের কাছে সাংবাদিকতা অচেনা একটা পেশা। সামাজিকভাবে এই পেশায় নারীদের নিরুসাহিত করা হতো। আমার জানা মতে, সে সময় কয়েকজন নারী সাংবাদিকতা করতেন। মানে প্রতিটি সংবাদপত্রে ২-৩ শতাংশ নারী সাংবাদিক ছিলেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার মনে হয় নারীদের সেই অর্থে সুযোগ দেয়া হয় না। আবার এও ঠিক, এই পেশায় সুযোগ নেয়ার মতো নারীদের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম। নারীর ক্ষমতায়ন সবদিক থেকে যেভাবে হচ্ছে, আশা করছি, খুব দ্রুত সাংবাদিকতায় অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। আমাদের মেয়েদের মেরিট এবং পোটেনশিয়ালিটি আছে। কিন্তু এক্সপোজার করবার ক্ষেত্র এবং ক্রমাগত প্রশিক্ষণের বড় অভাব। ইন জেনারেল, পুরুষ সম্পাদকরা যথেষ্ট সহযোগিতা করতে চান। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি দেখেছি পুরুষদের ইগো সমস্যার জন্য তারা সাধারণত নারীদের সহযোগিতা করার ভাব দেখান বটে, কিন্তু অনেক সময় তারা নারীদের উপেক্ষা করে চলেন। মানে তারা নারীদের দমিয়ে রাখতে চান। আমি মনে করি এটা ওদের সমস্যা, আমার নয়। আমি নিজের মতো ও দক্ষতা প্রকাশ করতে কখনো পিছিয়ে থাকার পক্ষপাতী নই।’

অন্য এক সাক্ষাৎকারে তাসমিমা হোসেন বলেন, ‘সাংবাদিকতা অন্য সব পেশা থেকে আলাদা। ভালো এবং দক্ষ সাংবাদিক হতে হলে একজনকে এ পেশার প্রতি অনেক বেশি চধংংরড়হধঃব হতে হবে। এটাকে শুধু পেশা হিসেবে দেখলে হবে না। নেশা হিসেবেও দেখতে হবে। দৃষ্টি রাখতে হবে সবসময় খোলা। একটি বিষয়কে নানা দিক থেকে দেখতে হবে। গভীর থেকে বিশ্লেষণ করতে হবে। এ বিষয়ে একটা আদর্শগত দর্শন থাকা প্রয়োজন। মোদ্দা কথা, ওঃ রং ধ াবৎু চধংংরড়হধঃব ্ ঈৎবধঃরাব চৎড়ভবংংরড়হ। তাই এটাকে সেভাবেই নিতে হবে। আর নারী হিসেবে চলার পথে কিছু জটিলতা আসবেই। সেগুলো কৌশল করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এই পেশায় ইদানীং প্রচুর মেয়ে আসছে। এখন তারা খুব বেশি সংখ্যালঘু সেটা আমি বলব না। এক সময় এ পেশায় নারীরাই আধিপত্য বিস্তার করবে বলে আমি আশাবাদ ব্যক্ত করছি।’

গণমাধ্যমে নারীদের সুরক্ষায় আলাদা নীতিমালা প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও মত দেন তিনি। বিশেষ করে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় নারীদের অংশগ্রহণ ও তাদের সফল পদচারণা রিপোর্টিং থেকে শুরু করে নিউজরুম সর্বত্র বিরাজমান। অন্যদিকে নারী সাংবাদিক বৃদ্ধির পাশাপাশি সাংবাদিক নেতৃত্বেও নারীদের অংশগ্রহণ দারুণভাবে দৃশ্যমান। আজ থেকে পাঁচ/ছয় বছর আগেও নারী সাংবাদিকরা নেতৃত্বের গুটিকয়েক পদে সীমাবদ্ধ ছিলেন।

নারীবিষয়ক সম্পাদক ও কার্যকরী সদস্য পদে নির্বাচন করতেন অথবা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতেন। এর বাইরে হাতে গোনা দুই একজন ছিলেন যারা গুরুত্বপূর্ণ পদে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে নির্বাচন করে জয়ী হতেন ও সফলভাবে দায়িত্ত্ব পালন করেছেন। উনাদেরই পদ অনুসরণ করে ও অনুপ্রেরণাতে আজ অনেক নারী সাংবাদিক ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচন করছেন। এ বছর ডিইউজে নির্বাচনে মোট ১৬ জন নারী সাংবাদিক অংশ নিয়েছেন। এই নেতারা শুধু নারী সাংবাদিকদের নেতা হবেন না, তারা নারী পুরুষ সকল সাংবাদিক সহকর্মীদের নেতা হবেন। যারা নতুনদের অনুপ্রেরণাসহ তাদের অধিকার আদায়ে ইতিবাচক অবদান রাখবেন। নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ আমাদের আশার আলো দেখায় কারণ এই পেশায় বিভিন্ন পেশাদার জটিলতার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক নানা ধরনের সমস্যা নারী সাংবাদিকদের মোকাবিলা করতে হয়।

অনেক ক্ষেত্রেই, নারীরা সেই সব সমস্যা মোকাবিলা না করতে পেরে পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হোন। এসব সমস্যা দলীয়ভাবে সমাধানের জন্য নারী নেতৃত্ব অনস্বীকার্য। এমআরডিআইয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জেন্ডার ইন জার্নালিজম: ইন পারসুইট অব কোয়ালিটি কনটেন্ট অ্যান্ড সেনসিটিভিটি’ শীর্ষক সেমিনারে তুলে ধরা হয় কিভাবে লিঙ্গ সংবেদনশীলতা বজায় রেখে সংবাদ উপস্থাপন করা যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাংবাদিকতায় নারীর দৃঢ় অবস্থান তৈরির তাগিদ দিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না সাংবাদিকতায় নারীর একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ডিবেট ও কাউন্সিলিং চালিয়ে যেতে হবে।

ওই সেমিনারে ইটিভির সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘বর্তমানে সারাদেশে মোট ১ হাজার ১৯১টি পত্রিকা রয়েছে। যেখানে ঢাকা থেকেই বের হয় ৪৭০টি পত্রিকা। পাশাপাশি ৪৫টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। সংবাদে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার বিষয়ে সাংবাদিকদের ভাবতে হবে। সংবাদে জেন্ডার সংবেদনশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিতে কাজ করতে হবে। বর্তমানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় গবেষণা কম হয়। সেই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণের ক্ষেত্রেও লিঙ্গ বৈষম্য পরিলক্ষিত। তিনি একটি গবেষণার বরাত দিয়ে বলেন, ‘৮২ দশমিক ৪ শতাংশ বিশেষজ্ঞরা হলেন পুরুষ। তার মানে বোঝায় আমাদের দেশে হয়তো- বা কোনো নারী এক্সপার্ট নেই! অবশ্যই আছে। সাংবাদিকদের এসব জায়গায় নজর রাখার আহ্বান জানান তিনি। অ্যাজনেতা সোডেরবার্গ জ্যাকবসন বলেন, ‘একটি মিডিয়া হাউসের বৈচিত্র্য পারে ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করতে। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চপর্যায়ে নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকারীর কোম্পানিগুলো নিম্ন পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণকারী কোম্পানিগুলোর চেয়ে বেশি লাভজনক। দেশে ৮ লাখ হিজড়া আছে উল্লেখ করে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, তারাও এই সমাজস্বীকৃত জনগোষ্ঠী। তাদের বিষয়ে উন্নয়নমূলক সংবাদ উপস্থাপন করা এবং তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর দায়িত্ব গণমাধ্যমের ওপর বর্তায়। সাংবাদিকতায় তাদের অবস্থানটা ও আমাদের পরিষ্কার করতে হবে। জেন্ডার মানে শুধু নারী নয় এ জায়গা থেকে উত্তরণের ওপর জোর দেন তিনি। তিনি নারী পুরুষের ভারসাম্য বজায় রাখার কথাও উল্লেখ করেন।

১৯ জুলাই ২০১৮ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ এবং নারী উন্নয়ন শক্তি যৌথ প্রোগ্রামে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেছেন, ‘সাংবাদিকতার মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন তারা।’

অতীতের তুলনায় ইদানীংকালে গণমাধ্যমের চাহিদা, প্রচার ও প্রসার পূর্বের তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেড়েছে। শহরের ইট পাথরের গলি পেরিয়ে মেঠো পথের মাটির ঘর অবধি পৌঁছে গেছে এই গণমাধ্যম। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের সার্বিক জীবন যাত্রার ওপর গণমাধ্যমের সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাংবাদিকতায় নারীদের অবস্থান এবং আগমনে নিজেদের ইচ্ছা শক্তি বৃদ্ধি পায় যদি কর্মপরিবেশ ভালো থাকে, নারী পুরুষ সম মর্যাদাপূর্ণ সম্মানজনক হয় এবং কর্মক্ষেত্র নিরাপদ থাকে। নিজের চেষ্টায় জ্ঞানে পড়াশোনায় ও পরিশ্রমে এগিয়ে যেতে হবে। নিজেকে নারী সাংবাদিক নয়, সাংবাদিক হতে হবে। এতে হবে কি; যারা এ পেশায় আছেন তারা সফল হবেন, তাদের দেখে অন্যরা উৎসাহী হবেন, তাদের জন্য একটা ভালো অবস্থান তৈরি হবে। নারী সাংবাদিককে ভালো ও নিরাপদ অবস্থানে থাকার জন্য যে বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে, তা হচ্ছে তাদের পুরুষের সাহায্য নেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পেশাগত দক্ষতার বিকল্প কিন্তু কিছুই নেই। মনে রাখতে হবে যে, সাংবাদিকতার মতো একটি চ্যালেঞ্জিং পেশায় আসতে হলে কিছু না কিছু ছাড় দিতেই হবে। এই পেশা অন্য অফিস জবের মতো নয়, এখানে কাজের প্রকৃতিটাই ভিন্ন। তাদের মানোসিকতার পাশাপাশি তাদের পরিবারকেও আরো উদারভাবে বিষয়টিকে দেখতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে।

গণমাধ্যমের নারীরা যে খুব সুগম পথ পুরোপুরি পেয়েছে তা বলব না। প্রতিপদে হয়রানির শিকার হতে হলেও সামনে আগানোর পথে তারা সব বাধাকে উপেক্ষা করতে সক্ষম করতে সফল হয়েছে। যার কারণে গত ১০ বছরেই বিশাল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এই গণমাধ্যমে। নারীরা তাদের সাহসী পদচারণাতেই এই জগৎকে সহজ করে তুলেছে সাধারণ মানুষের মাঝে। যার কারণেই আজ একটি মেয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে একজন সাংবাদিক হওয়ার বা গণমাধ্যমকর্মী হওয়ার। গণমাধ্যমে দাপটের সঙ্গে নারীর উপস্থিতি আর অংশগ্রহণ বেড়েছে সে কথা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু একথাও উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই যে, নারীর জন্য কাক্সিক্ষত অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি এখনো। এজন্য সমাজের অগ্রসরতা দরকার, দরকার প্রগতির। সেই প্রগতি সমাজে, রাষ্ট্রে সর্বত্র সমানভাবে হতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস