গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক

গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রযুক্তির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। গণমাধ্যম তখনই গণমাধ্যম হয়ে ওঠে যখন তাতে প্রযুক্তির ব্যবহার থাকে। প্রযুক্তির মাধ্যমে বার্তাকে গণমানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হয়। প্রযুক্তির তীব্র স্রোতে বর্তমানে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, আধুনিক প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের নতুন সংজ্ঞায়ন দরকার। বর্তমানে ইন্টারনেটকে বিভিন্ন ফর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ইন্টারনেটকে কি আমরা গণমাধ্যম হিসেবে গণ্য করব- তা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। বর্তমানে গণমাধ্যম ব্যবস্থাকে যেমন সহজতর করেছে ইন্টারনেট, তেমনি ইন্টারনেট সংবাদপত্র অঙ্গনকে ছুড়ে দিয়েছে চ্যালেঞ্জ। যদিও সংবাদপত্র সেই চ্যালেঞ্জকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আজ অবধি টিকে আছে, কিন্তু তা আর কতদিন টিকবে? ইন্টারনেট নানাভাবে আমাদের সংবাদপত্র অঙ্গনকে প্রভাবিত করছে। মোবাইল ফোন চালু করলেই ভেসে উঠছে সংবাদপত্রের অনলাইন ভার্সন। ইচ্ছামতো কোনো বিষয়কে ছোট বড় করে দেখার অপশন রয়েছে। সংরক্ষণ করা যাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় তথ্যাদি। সেখানে পাঠক কেন সংবাদপত্র রাখবে। কেনই বা মাস শেষে হকারকে টাকা দেবে।
তাছাড়া ইলেকট্রনিক মাধ্যম যেমন টেলিভিশন, রেডিওতে আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদ পাচ্ছি। বর্তমানে এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া কষ্ট হবে যেখানে কোনো টিভি নেই। স্যাটেলাইটের কল্যাণে টিভি পৌঁছে গেছে সর্বত্র। নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন ঘরেও ডিশ সংযোগসহ একটি টেলিভিশন সেট আছে। এদিকে হারানো দিনের বেতারের কদর ফেরাচ্ছে এফএম রেডিও। যে কোনো অবস্থায় মোবাইলে হেডফোন লাগিয়ে শোনা যাচ্ছে এফএম রেডিও। আর তাতে দিতে হচ্ছে না কোনো ফি। এছাড়া রয়েছে অনলাইন টিভি এবং রেডিও। মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই সংযুক্ত হওয়া যাচ্ছে অনলাইন টিভি এবং রেডিওর সঙ্গে। তাহলে একজন ব্যক্তি কেন সংবাদের জন্য সকাল কিংবা দিনের শেষে সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করবে। যদিও আমাদের দেশে সকালেই অধিকাংশ সংবাদপত্র বের হয়, কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে দিনের শেষেও সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়।
একটি ছবি হাজারো কথা বলে। যেখানে টিভি চ্যানেল প্রতিনিয়ত লাইভ সংবাদ, ব্রেকিং নিউজসহ সব সময়ই তথ্য প্রদান করছে, সেখানে সংবাদপত্রের দরকার কী? সংবাদপত্র হাতে পাওয়ার আগেই একজন ব্যক্তি দিনের সংবাদযোগ্য ঘটনাবলি সম্পর্কে অবগত হচ্ছেন, তাহলে সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা কিংবা প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে সংবাদপত্রের প্রতি মানুষ আগ্রহ হারাবে এবং প্রযুক্তির কল্যাণে অন্যান্য সংবাদনির্ভর মাধ্যমগুলো মানুষকে আকর্ষণ করবে- এটাই যুক্তিসঙ্গত। আর মানুষ যেখানে বেশি সুফল পাবে সেদিকেই ঝুঁকে পড়বে, এমনটাই বাস্তব। অন্যদিকে ইলেকট্রনিক মাধ্যমগুলো এত জনপ্রিয়তা অর্জন করার নেপথ্যেই রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি। কাজেই বলা চলে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো প্রিন্ট ভার্সন তথা সংবাদপত্রকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও সংবাদপত্র ইলেকট্রনিক ডিভাইসেরই একটি প্রোডাক্ট।
এবার ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, ব্লগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন সংবাদপত্র, আইফোন, ট্যাব, মোবাইল ফোনের মতো হাজারো প্রযুক্তির দিকে চোখ ফেরানো যাক। এসব ডিভাইসের লড়াই অনেক বড় এবং বেশিদিনের জন্য। এসব প্রযুক্তির কাছে আমাদের সংবাদপত্র অসহায়। সংবাদপত্রের প্রচার ঠেকাতে ই-সংবাদপত্রই যথেষ্ট। ই-সংবাদপত্রের সুবাদে বিশ্বব্যাপী পত্রিকার পাঠক বেড়ে চলেছে। তবে তা প্রিন্ট ভার্সনের জন্য শুভকর নয় বরং ক্ষতিকর। অনলাইন সংবাদপত্রের সুবাদে তথ্য এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। হুবহু সংবাদপত্রের আদলে খবর অনলাইন পত্রিকায় তুলে ধরা হচ্ছে। প্রিন্ট ভার্সন পত্রিকার অনেক সীমাবদ্ধতা দূর করছে অনলাইন সংবাদপত্র। সেখানে রয়েছে প্রচুর জায়গা। আকাশের মতোই বিশাল অনলাইন সংবাদপত্র। কোনো ঘটনার সকল তথ্যের সন্নিবেশ করা সম্ভব। সংবাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ সকল বিষয় থাকছে অনলাইন পত্রিকায়। কিন্তু সংবাদপত্রের জায়গা নির্ধারিত। ২০ পৃষ্ঠার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ তার নেই। বলা হচ্ছে টিভি চ্যানেলে সংবাদের ব্যাপ্তি থাকে না। কিন্তু তা থাকছে অনলাইন পত্রিকায়। যেহেতু ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে যে কোনো স্থান এবং অবস্থান থেকে অনলাইন পত্রিকা পাঠ করা যাচ্ছে, সেখানে দৈনিক সংবাদপত্রের দরকার কী? পাঠক কেন অনলাইন পত্রিকা ছেড়ে দৈনিক সংবাদপত্র পড়বে। সামাজিক মিডিয়াও গণমাধ্যমের প্রতি নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, মেসেঞ্জারসহ নানা সামাজিক মাধ্যম সবার কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তথ্য আদান-প্রদান, পরস্পরের সঙ্গে সখ্য তথা মানুষের মনের ভাব স্বাধীনভাবে প্রকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে এসব মাধ্যম। এছাড়াও অন্যায়, অবিচার, সামাজিক বৈষম্য ও অপরাধসহ নানান অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানোর এক অভিনব প্ল্যাটফর্ম সামাজিক মিডিয়া। এসব মাধ্যমে কল্যাণ এবং অকল্যাণের অনেক কাজই সম্পাদন হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম যা করতে পারেনি, তা করে চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। গণমানুষ এখন কেবল গণমাধ্যমের দ্বারা প্রভাবিত নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই এজেন্ডা অনেক সময় গণমাধ্যমের এজেন্ডার চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী। গণমাধ্যম অনেক বিষয়ে তথ্য প্রকাশে অপারগ। মালিকানা, নীতিমালা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থসহ নানা কারণে গণমাধ্যম অনেক বিষয়েই তথ্য প্রকাশে সাবলীল নয়। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে নির্বিঘ্নে সেসব বিষয়ে তথ্য প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। সেখানে নেই কোনো গণমাধ্যমের মতো বিধি-নিষেধ। এতে অনেকটাই পাল্টে যাচ্ছে গণমাধ্যমের এজেন্ডা নির্ধারণের ধরন। গণমাধ্যমের বিকল্প এক ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেন্দ্র করে। কাজেই এখন প্রশ্ন উঠছে গণমাধ্যমের এজেন্ডা শক্তিশালী নাকি সামাজিক মাধ্যমের এজেন্ডা।
বাংলাদেশে দিকে তাকালে দেখা যাবে, এখানে সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে ইতোমধ্যে সংবাদপত্র একটি শিল্পে পরিণত হচ্ছে। নিত্যনতুন দৈনিক সংবাদপত্র যাত্রা শুরু করছে। এদিক থেকে সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ এতটা হতাশজনক নয়। এখন বাজারে ২ টাকা কিংবা ৫ টাকায় একটি দৈনিক পাওয়া যায়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে সংবাদপত্রসহ কোনো না কোনো মাধ্যমের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। যদিও সংবাদপত্রের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে, কিন্তু সংবাদপত্রের প্রচার এবং প্রসার থেমে নেই। প্রযুক্তির নানা আদলে এখনকার সংবাদপত্র দিন দিন সমৃদ্ধি অর্জন করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সংবাদপত্রের প্রিন্ট ভার্সন থাকবে না, এমন আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। যদিও প্রযুক্তি আমাদের সমাজের সেই অর্থে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। বাংলাদেশ দিন দিন প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু ইউরোপ এবং আমেরিকার মতো পর্যায়ে পৌঁছতে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশে এখনো সবার হাতে প্রযুক্তি পৌঁছায়নি। আর প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার বিষয়টি জড়িত। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাঠকের একটি বড় অংশ শিক্ষিত। কিন্তু তারা প্রযুক্তি ব্যবহারে অদক্ষ এবং অনাগ্রহ দেখানোর ফলে এখানে সংবাদপত্রের প্রিন্ট ভার্সনের কদর বরাবরই থাকছে। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো আমাদের তরুণ পাঠকরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এত কিছুর পরও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংবাদপত্র কখনো তার অস্তিত্ব হারাবে না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা সংবাদপত্র তার অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে। – মো. মিঠুন মিয়া