গণমাধ্যমের মতাদর্শ

গণমাধ্যম যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখে তার সঙ্গে সমাজের সাধারণ বোধ-বিশ্বাস, চেতনা ও জীবনযাপনের তেমন কোনো সংযোগ থাকে না। ফলে গণমাধ্যম যে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের কালচার প্রমোট করে তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব সংঘাত দেখা দেয় প্রান্তিক ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর কালচার ও বিশ্বাসের। গণমাধ্যমের এই শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি শেষপর্যন্ত গণবিরোধী হয়ে উঠে। যা গণমানুষের ওপর সমাজের এলিট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের বৈধতা দেয়। চমস্কি এই গণতন্ত্রকে ‘দর্শকের গণতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন। যেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব কৌশলে অস্বীকার করে তাদের দর্শকের ভূমিকায় ঠেলে দেয়া হয়। এই গণতন্ত্রের ধারণা অনুসারে সমাজের এলিটবর্গই রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসনিক কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে। আর সাধারণ মানুষের কাজ হচ্ছে শুধু দর্শক হয়ে রাষ্ট্রের সমস্ত কাজে সম্মতি জ্ঞাপন করা- অংশ নেয়া নয়। তবে এই শাসন পদ্ধতিকে যেহেতু একনায়কতান্ত্রিক বলতে লজ্জা পান তারা, তাই সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচনে ভোট দানের কাজে অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়া হয় যেন তারা বেছে নিতে পারে তাদের শাসকবর্গ। সাধারণ জনগণের গণতন্ত্রে অংশগ্রহণ এই একবারই। তারপর আবার পুরো শাসনকালব্যাপী শাসনকর্ম থেকে শুরু করে জনগণের সঙ্গে জড়িত সমস্ত সিদ্ধান্ত, অর্থনীতি, রাজনীতি এমনকি তাদের কালচার সবই তৈরি করে দিতে চায় শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুগত মিডিয়া। ফলে এই গণতন্ত্রে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণকে সুকৌশলে নাকচ করে দেয়ার জন্য শাসকগোষ্ঠীর কার্যকলাপকে ন্যায্য ও বৈধ করে নিতে হয়। সাধারণ জনগণকে বশে আনার জন্য সম্মিলিত যে বোধ-বিশ্বাস-চেতনা ও সংস্কৃতি তাকে নিষ্ক্রিয় করে তাদের মতাদর্শ এমনভাবে নির্মাণ করতে হয় যেন এই মতাদর্শ রাষ্ট্রীয় শাসকবর্গ ও গ্লোবাল পাওয়ারের শাসন প্রণালির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
গণমাধ্যম বাংলাদেশে কালচারাল ফ্যাসিজমের জন্য সরাসরি দায়ী। কালচারাল ফ্যাসিজমের লক্ষ্যই হচ্ছে ভিন্ন এথিক্যাল সংস্কৃতির ধারক-বাহকদের প্রতি এক ধরনের কালচারাল ঘৃণা পুনরুৎপাদন করা। গত দুই দশক ধরে আধুনিকতার নামে বাংলাদেশে পশ্চিমা ভোগবাদী ও বস্তুবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসন যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা সুস্পষ্টভাবে আমাদের আবহমান সংস্কৃতিরও পরিপন্থী। যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন তারা এখনো স্বতন্ত্র কোনো সাংস্কৃতিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারেননি। মনে হয়, তারা এই পশ্চিমা সংস্কৃতিকেই মনে প্রাণে লালন করেছেন অথবা তার প্রতিরোধে বক্তব্য বিবৃতি দিলেও কাউন্টার কালচারের অভাবে অসহায়ভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সমাজের মুখপাত্র দাবি করলেও প্রচলিত গণমাধ্যম যে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে তা গণবিরোধী। নিয়ন্ত্রিত এই গণমাধ্যমের বিপরীতে দরকার গণমুখপত্র যারা জনগণের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করার তাগিদ অনুভব করবে এবং পুঁজিতান্ত্রিক এককেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কাউন্টার কালচারের প্রকাশকে অর্থবহ করে তুলবে। গণমাধ্যম ডেস্ক