‘গণপরিবহন’ যখন ‘গণভোগান্তি পরিবহন’

লীনা পারভীনহাজারো সমস্যাবহুল একটি দেশের সমস্যাবহুল একটি শহরের নাম ঢাকা যেখানে বর্তমানে বাস করে প্রায় ২ কোটি লোক। বিশাল জনসংখ্যা বহুল একটি শহর চলছে অপরিকল্পিত নিয়মে। অন্তহীন সমস্যার তালিকায় একটি বড় সমস্যা হচ্ছে পরিবহন সমস্যা যেখানে এখনো পর্যন্ত পরিকল্পনামাফিক নেয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ।

যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি নাই সেরকম মানুষের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে বাস বা টেম্পো; যার বেশিরভাগই আনফিট বা পরিবেশ অনুপযোগী। পাশাপাশি রয়েছে নানারকম অব্যবস্থাপনা যা পরিবহন খাতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে করে তুলেছে বেপরোয়া। পরিবহনের মালিকদের কাছে যেন আমরা সবাই জিম্মি। এসব দেখার মতো কেউ আছে বলেও মনে হয় না। ২ কোটি মানুষের বাস যে শহরে সে শহরে নেই পর্যাপ্ত গাড়ি। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তাই যেন নিত্যসঙ্গী। যাত্রীর তুলনায় গাড়ির সংখ্যা কম হওয়াতে গাড়িগুলো বাধ্য হয় ধারণ ক্ষমতার বাইরে লোক উঠাতে হয় যেখানে ঠাসাঠাসিতে পা ফেলাতো দূরের কথা শ্বাস নেয়াও কষ্টদায়ক হয়ে পড়ে। প্রতিদিনের এই লড়াই যেন রাজধানীবাসীর ভবিতব্য হিসাবেই লেখা হয়ে গেছে। তাও যদি সবাই ঠিকঠাক মতো যেতে পারত একটা কথা ছিল। প্রতিটি জায়গায় জায়গায় লম্বা লাইনে মানুষ চাতকের মতো অপেক্ষায় থাকে বাসের জন্য। একটা বাসের দেখা পেলে এমনভাবে দৌড়ায় যেন প্রচণ্ড খরায় এক পশলা বৃষ্টি পাওয়ার মতো অবস্থা। লাখ লাখ লোক রাস্তায় কাটায় জীবনের এক কঠিনতম সময়। এই যে উদ্বিগ্ন অবস্থা এই যে উৎকণ্ঠার জীবন এর বিনিময়ে তারা কী পায়? বাসগুলো যেখানে সেখানে থামছে, নেই কোনো নির্দিষ্ট পয়েন্ট। তাই যাত্রী উঠানোরও নেই কোন নিয়ম-কানুন। যেখানে যাত্রী পাচ্ছে সেখানেই উঠচ্ছে বা নামাচ্ছে। দেখার কেউ নেই।
আর যাত্রীদের মাঝে নারীদের অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। বহুল প্রতীক্ষিত একটা বাসের দেখা যাও মিলে নারীদের জন্য সেটা যেন আরেক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে আসে। তারা না পারে পুরুষের মতো দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠতে না পারে ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে নিজের জায়গাটুকু করে নিতে। ভাগ্যবান কেউ যদি উঠেও যায় তার কপালে নেমে আসে আরো ভয়াবহ পরিণাম। প্রথম কথা নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের আইন করলেও কোনো বাসেই থাকে না তার ব্যবস্থা। যেগুলোতে থাকে সেখানে বসে থাকে পুরুষ যাত্রীরা। কোনো নারী এর প্রতিবাদ করলে তার জন্য উপহার হিসেবে ফিরে আসে তির্যক কথার বাণ এমনকি মাঝে মাঝে তাদেরকে অশ্রাব্য গালিও শুনতে হয়। সেসব গালি হজম করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকে না। প্রতিদিন সকালে প্রায় ৩০/৪০ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে যদিও বা বাসের দেখা পাওয়া যায় কপালে জুটে না কোনো সিট। নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন সম্পর্কিত সরকারের সদ্য পাস করা আইনের কথা বলতে গেলে অশ্রাব্য গালি শুনতে হয়। প্রতিবাদ করলে অপমান ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না বলে সবাই এখন মেনে নিয়েছেন। কেউ কী আছে মনিটর করার?

হাজারো নারী এখন বাইরে আসছেন। নানারকম কাজে তাদের ছুটতে হয় শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। আর এই ছুটে চলার একমাত্র সুবিধাজনক পরিবহন হচ্ছে গণপরিবহন। কিন্তু সেটাও তাদের মিলছে কই? সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কেবল আইন করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। তার মনিটর বা বাস্তবায়নের সঠিক ব্যবস্থা নেয়ার কোনো নামদিশা নাই। নারীদের প্রতি এই যে দৃষ্টিভঙ্গি তার পরিবর্তনে সরকারের ব্যবস্থা কী? আমাদের জানা নেই।
এই লেখাটি যখন লিখছিলাম তখনই জানতে পারলাম সিটিং সার্ভিস রাখা না রাখা নিয়ে যে নতুন ভোগান্তি যোগ হয়েছিল আপাতত তার সমাধান হয়েছে। কিন্তু তার আগে যা হয়রানি হওয়ার তা কোনো দিক থেকেই কম ছিল না। সিটিং সার্ভিস বন্ধের উসিলায় রাজধানীতে শুরু হয়েছিল এক অনির্ধারিত পরিবহন ধর্মঘট। বাসের সংখ্যা ছিল কম। একজন যাত্রী হিসেবে আমি বলতে পারি সিটিং সার্ভিস নামে থাকলেও বাস্তবে কয়টা গাড়ি সিটিং ব্যবস্থা ধরে রাখতে পারে সেটা একটা প্রশ্ন। অফিসের সময় সবারই তাড়া থাকে তাই অনেক সময় বাসওয়ালাদের ইচ্ছা না থাকলেও অধিক যাত্রী নিতে বাধ্য হয়। একই ভাড়ায় স্ট্যান্ডিং যাত্রী নিলেও অন্তত যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। বাস্তবে সমস্যা সিটিং বা স্ট্যান্ডিং নয়। সমস্যা আমাদের ব্যবস্থাপনায়। কর্তৃপক্ষ কী কখনও কোন রুটে কত ভাড়া নেয়া হবে কোন হিসাবে নেয়া হবে তার কোনো চার্ট সরবরাহ বা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন? করেননি। আর এর সুযোগেই ভাড়া নিয়েও চলছে অরাজকতা। মালিকদের মাস্তানির কাছে যেন আমরা সবাই অসহায়!

অল্পসংখ্যক বাসের কারণে এখন বাসে সিটতো দূরের কথা, উঠাটাই ভাগ্যের ব্যাপার। শত শত নারী এই কাঠফাটা রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে বাসের অপেক্ষায়। নেই কোনো যাত্রী ছাউনি। মাথায় চলতে থাকে কখন গিয়ে পৌঁছাবে গন্তব্যে? অফিস যাত্রীদের জন্য এই মানসিক চাপ যেন মুগুরের আঘাতের মতো। টাইমলি পৌঁছাতে পারব তো অফিসে? দেরিতে পৌঁছালে বসকে কী উত্তর দেব? উনি তো আর বাস সংকটের কথা শুনবেন না … ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর ঠিক করতে করতে চলতে থাকে বাসের জন্য অপেক্ষা। এই যে মানসিক যন্ত্রণা এর উপশম কী আছে সরকারের কাছে?
সড়কমন্ত্রী দুইদিন পরপর রাস্তায় নামেন, পেছনে বিশাল দলবল নিয়ে তিনি পর্যবেক্ষণে যান আর কিছু সুন্দর সুন্দর বাণী দিয়ে থাকেন। তারপর কী? তিনি কী যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে চাইছেন না বাড়াতে? পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থার বদলে দুইদিন পরপর পরিবহন নেতাদের হুমকি-ধমকির কাছে তিনি কতটা ক্ষমতাবান? কয়দিন আগেই দেখলাম একজন ড্রাইভারের বিরুদ্ধে আদালতের নেয়া শাস্তিমূলক রায়ের প্রতিবাদে তারা আইনি লড়াইয়ের পরিবর্তে জিম্মি করল সাধারণ যাত্রীদের। এই যে যাত্রীদের মানসিক ও শারীরিক ভোগান্তিতে ফেলা হয়েছে এর সমাধান কী দিয়ে করবেন? আপনি কী নিজে নিজের উপর আস্থাবান যে আমাদের একটি সুশৃঙ্খল পরিবহন সেক্টর উপহার দিতে পারবেন? জানি না। কখনো কী শুনার চেষ্টা করেছেন ঢাকা শহরের যাত্রীদের প্রকৃত সমস্যাটা কী? নারী যাত্রীদের জন্য কেমন করে আপনি একটি সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবেন? আপনার মন্ত্রণালয়কে বলেন একটি সার্ভের ব্যবস্থা করতে। আগে শুনুন নগরবাসী কী বলতে চায়? সমস্যার মূল খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। এলোপাথাড়ি হাতড়ালে কেবল ধিক্কারই পাবেন, প্রশংসা কপালে জুটবে না কখনো। দয়া করে এই ভোগান্তি থেকে রক্ষা করুন সাধারণ মানুষগুলোকে। আমরা কিছু চাই না আপনার কাছে, কেবল চাই সম্মানের সঙ্গে রাস্তায় চলতে। মানসিক যন্ত্রণা বিহীন হোক প্রতিটি যাত্রীর প্রতিটি যাত্রা।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা

মানবকণ্ঠ/আরএ