খুব কি দরকার এত বৃদ্ধাশ্রমের?

পরম শ্রদ্ধা ও সম্মানের অধিকারী দেশের প্রবীণ ও বয়োজ্যেষ্ঠরা। কারণ অতীতে তারাই দিবানিশি শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে আমাদের গড়ে তুলেছেন। লেখাপড়া শিখিয়ে নির্বোধ থেকে বোধসম্পন্ন মানুষে পরিণত করেছেন। আজকের যুবককে কর্মক্ষম ও সচল করে তোলার জন্য প্রবীণ বা আমাদের বৃদ্ধ মা-বাবার অবদানই সব। কিন্তু প্রবীণ ব্যক্তিরা এখন দেশে বিভিন্ন স্থানে অনিরাপদ এবং নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। কয়েকদিন আগেই এক বৃদ্ধার জীবনের শেষ পরিণতি নিয়ে সারাদেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে। হাড় ক’খানা সম্বল করা সেই বৃদ্ধার তিন ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা ও এক মেয়ে শিক্ষিকা। তার শেষ পরিণতি অসহায় এবং করুণ। তার আগে এ রকমই এক বৃদ্ধ এবং এক বৃদ্ধার পরিণতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। যার দায়িত্ব জেলা প্রশাসক নিয়েছিল। এমন ঘটনা আজকাল হরহামেশাই ঘটছে। দেশে অনেক বৃদ্ধাশ্রম হয়েছে। যেখানে অনেক অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা উপায়হীন হয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন। খুব কি দরকার এত বৃদ্ধাশ্রমের? ওপার বাংলার বিখ্যাত গায়ক নচিকেতার সেই কালজয়ী গান-‘ছেলে আমার মস্তবড় মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার।’ একেবারে বাস্তব চিত্র। প্রতিবছর ১ অক্টোবর দেশে বিশ্ব প্রবীণ দিবস পালন করা হয়। প্রবীণ বা বয়স্করা হচ্ছেন সেই সব অভিজ্ঞ ব্যক্তি যারা আমাদের পথচলায় নির্দেশনা দেন, উপদেশ দেন। যারা হচ্ছেন একেকজন জীবনাদর্শে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং যারা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের উপকার করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে প্রবীণ ব্যক্তি বা সিনিয়র সিটিজেন হলেন আমাদের পথ প্রদর্শক। তারা সর্বদাই আমাদের মঙ্গল কামনা করেন। এ প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ীদের নির্বাচিত প্রবন্ধ গ্রন্থে রিগোবার্তা মেনচু বলেছেন, আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা শুধু যে প্রাজ্ঞতা, আশা এবং সাংস্কৃতিক সমার্থক তা-ই নন, তারা আমাদের ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিতও করেন এবং অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকারীও হন। বৃষ্টি এবং ধরিত্রী যে পুত্রের জš§ দিলেন সে শুরু করে দেয় একটা অভিজ্ঞতার তীর্থযাত্রা। বয়োজ্যেষ্ঠরা যে কোনো ব্যক্তির জীবনের প্রত্যেকটি পর্যায়কে, তার চরিত্রের সাধুতাকে শ্রদ্ধা করে চলেন। তারা যে কোনো ব্যক্তির ভুলভ্রান্তি, আচার-আচরণের ধরন ও তাৎপর্য এবং তার নিয়তির সূত্রকে শনাক্ত করে থাকেন যতদিন না ওই ব্যক্তি নিজেই বড় হয়ে ওঠে এবং বয়োজ্যেষ্ঠতে পরিণত হয়। আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠরাই হলেন আমাদের বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞতা, তারা হলেন আমাদের ইতিহাসগ্রন্থ আমাদের গ্রন্থাগার-যাদের কাছে আমরা পরামর্শ চাই, উপদেশ নিই এবং সর্বোপরি আমরা তাদের প্রতি গভীর আস্থা রাখি। বৃদ্ধ মানুষরা হলেন গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী এবং তারা আমাদের মর্যাদা সুনিশ্চিত করেন।
মানুষ জন্ম নেয়ার পর থেকে ক্রমেই বেড়ে ওঠে। সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সুখ-দুঃখের নানা পথ পাড়ি দিয়ে কিশোর ও যৌবন পাড়ি দিয়ে জীবনের ক্রান্তি লগ্নে পৌঁছে। একসময় শরীরে বার্ধক্য আসে। কমে আসে কর্মক্ষমতা। সুস্থ স্বাভাবিক প্রতিটি মানুষের জীবনেই এই চক্র আবর্তিত হয়। আজ আমাদের মা-বাবা প্রবীণ ব্যক্তি। আগামীকাল আমার জন্যও এই সময়টা অপেক্ষা করছে। তারপর আমার সন্তানরা। প্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাদের ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে বাইরের কাজে। সেই সঙ্গে দুপুরে বা রাতে মা-বাবা ছেলেমেয়েদের নিয়ে একসঙ্গে খাওয়ার সময়টুকুও আজ যেন অতীত হয়ে গেছে। আগেকার একান্নবর্তী পরিবারে দেখা যেত- পরিবারে যারা বয়োজ্যেষ্ঠ, তাদের নির্দেশক্রমে সিদ্ধান্ত নেয়া হতো এবং সবাই তা মেনে চলত। কিন্তু আজ সে একান্নবর্তী পরিবার নেই। নেই সেই পারিবারিক বন্ধন। মা-বাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে ছেলেমেয়ের। অনেক পরিবারেই তাদের বোঝা হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। কর্মক্ষমতা হারিয়ে একসময় পরিবারের কাছেই নিজেকে বড় অযাচিত মনে করেন তারা অথচ এই তারাই একসময় নিজেদের সবটুকু উজাড় করে আমাদের বড় করেছেন। পারিবারিক বন্ধন যত আলগা হচ্ছে বৃদ্ধ হওয়ার এই সময়টা বর্তমান সমাজে ক্রমেই একাকিত্ব ও একঘেয়েমিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাদের অনেকেই অবাঞ্ছিত ও অবহেলিত চোখে দেখে। সাময়িক যৌবনের অহংকারে তাদের প্রতি অবহেলাপূর্ণ আচরণ করতে থাকা মানে এক অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করা। আমরা মেনে নিতে পারি না একসময় আমাদের এই সময় আসবে। হয়তো বা যৌবনের অহংকার আমাদের সাময়িক অন্ধ করে দেয়। আমরা অস্বীকার করি যে, তারাও জ্ঞান ও বিজ্ঞানের এক শ্রেষ্ঠ সমন্বয়। শুধু টাকা দিয়েই তাদের মূল্যায়ন করা যায় না। তাদের সারাজীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা আমাদের আগামী জীবনের পথ প্রদর্শক।
আজকাল আধুনিক সমাজে আমরা যতটা এগিয়েছি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনের প্রসন্ন দরজাগুলো মনে হয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বৃদ্ধাশ্রম নামক শব্দটি এখন আমাদের কাছে অপরিচিত নয়। আমরা জানি, সেখানে বৃদ্ধদের (অসহায়) রেখে আসা হয়। কিন্তু যাদের ছেলেমেয়ে বর্তমান আছে তাদেরও কি আমরা অসহায় বলতে পারি? আমরা যখন শিশু ছিলাম তখন তো তারা অর্থাৎ বাবা-মায়েরা আমাদের শিশু নিবাসে রেখে আসেননি। তারা তো আমাদের বোঝা মনে করেননি। কিন্তু আজ আমরাই সেই কাজটি করছি। আমাদের দেশে আজ অনেক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে। জনপ্রিয় গায়ক নচিকেতার বৃদ্ধাশ্রমবিষয়ক সেই গানটি আমাদের মনে দাগ কেটে যায়। গানটি হতভাগ্য প্রবীণদের নিয়েই লেখা। যারা তাদের সারাটি জীবন নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাইয়ে বড় করেছেন, অফিসার করে আলিশান বাড়ি নির্মাণ ও দামি গাড়িতে চড়ার উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন, তাদেরই শেষ জীবনের ঠিকানা হয় এই বৃদ্ধাশ্রমে। অনেক সন্তান তাদের বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য বছরে একবার কি দুবার পোশাক বা খাবার পাঠিয়ে অথবা একটু দেখা করেই দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে। ধিক্ এসব সন্তানকে। জানি না শেষ জীবনে এদের ভাগ্যে কী ঘটবে। এসব নির্বোধ সন্তান হয়তো এটাও জানে না যে, মা-বাবাকে বৃদ্ধ বয়সে বোঝা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে একাকী ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে, সেই মা-বাবাই দিন-রাত ওই বদ্ধঘরে বসে তার সন্তানের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছে যেন তার সন্তানকে শেষ জীবনে এই রকম পরিণতি বরণ না করতে হয়।
প্রবীণ ব্যক্তিরা সর্বদা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ব্যক্তি। সর্বদা বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করাই আমাদের কাজ। আমাদের উচিত তাদের নিকট থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা। যাতে সেই শিক্ষা নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করে নিজেদের ভালো করতে পারি। বয়স হলেও তার আর করার কিছুই নেই-এ কথা ভেবে তাকে ছোট করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয় বরং তার শেষ জীবনটা আনন্দের করে তুলতে পারাই আমাদের কাজ হওয়া উচিত অথচ আমাদের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে তাদের প্রতি দায়িত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। আগে দেখেছি রাস্তাঘাটে বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ দেখলে তাদের দেখে ছোটরা সম্মান জানাত। প্রবীণরা যেখানে থাকত সেখানে অল্প বয়সীরা থাকত না। আজকাল আর সেসব খুব একটা দেখা যায় না। পরিবার থেকেই ছোটবেলায় এসব শিক্ষা দিতে হয়। আমরা যারা ছোট ছিলাম তখন অনেকেই এমন শিক্ষা পেয়েছি। কিন্তু আজকাল তেমনটি দেখা যায় না। এসব ভুলতে বসেছি বলেই আমাদের আজ এই অবস্থা। আমাদের সর্বদা মাথায় রাখতে হবে আজ আমরা যে আচরণ শেখাব ভবিষ্যতে আমরা বৃদ্ধ হলে সেই আচরণ ফেরত পাব।
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ। পরিবারের একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু সেই অবস্থা থেকে আমরা অনেকটা বের হয়ে এসেছি। এসব বয়স্ক মানুষের নিরাপত্তা তাই রাষ্ট্রকে নিতে হবে। যদিও দেশে বয়স্কভাতা চালু রয়েছে। তবে তা অপর্যাপ্ত। রাষ্ট্র যদি এই বয়সে মৌলিক চাহিদার নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে এই ধরনের কাহিনী আমরা পড়তেই থাকব। কারণ পরিবারে একে অপরের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। বাড়ছে অবিশ্বাস আর দ্বন্দ্ব। সেই সঙ্গে বাড়ছে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও।
আবীর হাসান