খালেদার আস্থাহীনতায় বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ!

শেখ জামাল:
বিএনপির আইনজীবীদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। সে কারণেই ৩৬টি মামলা পরিচালনায় বেগম জিয়ার আইনজীবীদের প্যানেলকে সহযোগিতা দিতে ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে বিদেশি এই আইনজীবী নিয়োগের পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন আইনজ্ঞরা। তারা বলছেন, এর আগেও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বিদেশি আইনজীবীদের দিয়ে মামলা পরিচালনায় জামায়াত ইসলামী দলটি চেষ্টা করেও পারেনি। কারণ এ দেশের নাগরিক ছাড়া মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না। আলবদর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর না করার দাবিতে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের কাছে চিঠিও লিখেছিলেন ব্রিটিশ এই আইনজীবী কারলাইল। ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনে উদ্যোগ নিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অনুরোধ করেছিলেন লর্ড কারলাইল।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক শ. ম. রেজাউল করিম বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। সে জন্যই বিএনপি এখন বিদেশ নির্ভর হয়ে পড়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমাদের সঙ্গে ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কারলাইল থাকবেন। সরকারের হস্তক্ষেপে বিএনপির চেয়রপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিচার বিভাগের ওপর সরকার সরাসরি হস্তেক্ষেপ করছে। বিচারক সাহস করে রায় দিতে পারছেন না।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হওয়া বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরো চারটিসহ মোট ৩৬টি মামলার তথ্য রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিচার শেষ পর্যায়ে আছে। বাকি মামলার মধ্যে এর মধ্যে কুমিল্লায় বাসে পেট্রলবোমা হামলায় আটজনকে হত্যার ঘটনায় একটি মামলায় গ্রেফতারও দেখানো হয়েছে। আরো তিনটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।
এদিকে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মামলায় তার আইনজীবীদের প্যানেলকে সহযোগিতা দিতে ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে গতকাল বিএনপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জ ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার মামলাগুলোতে আইনি লড়াইয়ের জন্য দেশের আইনজীবীদের সহযোগিতা করা জন্য, পরামর্শ দেয়ার জন্য ব্রিটিশ আইনজীবী ব্যারিস্টার লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। লর্ড কারলাইল তার অফিস থেকে উনি (লর্ড কারলাইল) একটা চিঠি পাঠিয়েছেনÑ হি একসেপটেড, এটা উনি একসেপ্ট করেছেন। উনি এখন থেকে সহযোগিতা প্রদান করবেন, পরামর্শ দেবেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি যতটুকু করা প্রয়োজন তার পক্ষে সম্ভব সেটা তিনি করবেন। খালেদা জিয়ার ৩৬টি মামলায় লর্ড কারলাইল আইনি পরামর্শ দেবেন বলে জানান ফখরুল।
এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শ. ম. রেজাউল করিম মানবকণ্ঠকে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা সবাই বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রতিভাত হয় যে, তিনি দলের নেতাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। তা ছাড়া মামলায় যে দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণ এসেছে তাতে দেশ-বিদেশের যত আইনজীবী আনুক মামলার ফলাফল পাল্টানোরর সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। সামগ্রিক বিবেচনায় বিএনপি এখন বিদেশ নির্ভর হয়ে পড়েছে মনে হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বেগম খালেদা জিয়া বিদেশ থেকে যত বড় আইনজীবী আনুক না কেন তারা মামলায় লড়তে পারবেন না। খালেদার পক্ষে লড়তে গেলে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে আইনে তা বলা আছে। এর আগেও জামায়াত ইসলামের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী এনে ছিলেন। তারা এদেশে মামলা পরিচালনা চেষ্টা করে ছিলেন, কিন্তু তা তারা করতে পারেননি।
এ বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমরা বিএনপির চেয়ারপার্সনের মামলা পরিচালনা করব। আমাদের সঙ্গে ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কারলাইল থাকবেন। বিএনপির চেয়ারপার্সনসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে লাখ লাখ মামলা রয়েছে। সরকারের হস্তক্ষেপে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। আওয়মী লীগ সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে বেগম খালেদা জিয়া আজ জেলে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। বিচার বিভাগের ওপর সরকার সরাসরি হস্তেক্ষেপ করছে। বিচারক সাহস করে রায় দিতে পারছেন না।
জানা গেছে, পোল্যান্ড থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসিত ইহুদি আইনজীবী লর্ড কারলাইল বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কঠোর সমালোচক। তিনি এই বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে নানা সভা, সেমিনার এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দূতিয়ালির চেষ্টা করেছেন। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ‘নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার’ জন্য আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি জানান লর্ড কারলাইল। জেনেভাস্থ ইউনাইটেড নেশনস হাইকমিশন ফর হিউম্যান রাইটস-এর হাইকমিশনার নাভী পিল্লাই বরাবর লিখিত এক চিঠিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপও চেয়েছিলেন লর্ড কারলাইল।